Monday, March 9, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

রাষ্ট্রপতি শাসনই বাংলার ভবিতব্য?‌ আনন্দ বোসের বিদায়বেলায় তৃণমূলের ‘হাওয়া বদল’!‌

বাংলায় রাষ্ট্রপতি শাসন মানে রাজ্য সরকারের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় সরকার তথা দিল্লির শাসন জারি। ‘ভ্যাম্পায়র’ থেকে ‘অভিমানী’। আনন্দের বিদায় যেন ‘নিরানন্দ’ তৈরি করে দিয়েছিল রাজ্যের শাসকশিবিরের অন্দরে। কিন্তু এত তিক্ততা, এত সংঘাত। বিদায়বেলায় কি তা হলে সবটাই ভুলে যেতে হয়? রাজ্যের শাসকশিবির হয়তো সেই ভুলে যাওয়ার ‘অনুশীলন’টাই করছে। পদই কি সংঘাতের সূত্রধর? পদ না থাকলে কমে দূরত্ব? কেরলে তাঁর ‘বিশেষ দায়িত্ব’ রয়েছে, এই বলে বাংলা পর্বে ইতি টেনেছিলেন সিভি আনন্দ বোস। যা দেখে ‘বিস্মিত’ হয়েছিলেন খোদ মমতাও। আনন্দের বিদায় যেন ‘নিরানন্দ’ তৈরি করে দিয়েছিল রাজ্যের শাসকশিবিরের অন্দরে। কিন্তু এত তিক্ততা, এত সংঘাত বিদায়বেলায় কি তা হলে সবটাই ভুলে যেতে হয়? রাজ্যের সাহায্যপ্রাপ্ত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসাবে মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়োগের যে বিল রাজ্য বিধানসভায় পাশ হয়ে লোকভবনে ঝুলেছিল। রাজ্যপাল হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পরই প্রথম বিতর্কও শুরু হয় সেই বিল দিয়েই। বিবৃতি দিয়ে বাংলার প্রাক্তন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস সাফ জানিয়ে ছিলেন, যেমন চলছে তেমনই চলবে। বাংলার শাসকশিবিরের সঙ্গে সরাসরি ও স্থায়ী সংঘাতের সূচনা যেন এই ঘটনাই। তবে এই পর্বে আরও একটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন আনন্দ বোস। যার জল গড়িয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। আচার্য হওয়ার বিলের ‘অপমৃত্যু’, সেই সূত্র ধরেই শুরু উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে জটিলতা। রাজ্যের ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থায়ী উপাচার্য নিয়োগ করেন প্রাক্তন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস। এরপরেই তাঁর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে দ্বারস্থ হয় রাজ্য। তাঁদের যুক্তি ছিল, শিক্ষামন্ত্রী বা শিক্ষা দফতরের সঙ্গে আলোচনা না করেই এই নিয়োগ করেছেন তিনি। এই বিতর্কে জল এত দূর পর্যন্ত গড়ায় যে রাজ্যপালকে ‘ভ্যাম্পায়র’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু। ঠিক কেন সেই মন্তব্য করেছিলেন তিনি? ২০২৩ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর সিভি আনন্দ বোসের কার্যকলাপ নিয়ে সমালোচনা করে তাঁকে মহম্মদ বিন তুঘলকের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন ব্রাত্য। এরপর দিন অর্থাৎ ৯ সেপ্টেম্বর বোস এক্স হ্যান্ডেলে লেখেন, “মধ্যরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।” এরপরেই সিভি আনন্দ বোসের ‘মধ্যরাতে অ্যাকশন’। রাত ১১টা ৪২ মিনিটে অধুনা রাজভবনের বর্তমান লোকভবন তরফে জানানো হয়, রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস একটি বার্তা পাঠিয়েছেন নবান্নে। সেই বার্তা গিয়েছে কেন্দ্র সরকারের কাছেও। তবে সেই ‘খামবন্দি’ চিঠি বরাবরই থেকেছে ‘মিস্ট্রি’। তবে উপাচার্য নিয়োগ নিয়েই যে ‘মিস্ট্রিয়াস চিঠি’ গিয়েছিল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তবে বিতর্কের ‘আগুনে ঘি ঢেলে’ সেই সময় সিভি আনন্দ বোসকে ‘ভ্যাম্পায়র’, ‘রাক্ষস প্রহর’ তকমা দিয়েছিলেন ব্রাত্য। সংঘাত চড়েছিল ‘পিস রুম’ নিয়েও। পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়ন জমাকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় ছড়িয়ে পড়ে হিংসা। উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ভাঙড়, ক্যানিং। চলে গুলি, পড়ে বোমা। সেই সময় প্রাক নির্বাচনী হিংসায় কঠোর অবস্থানের কথা জানান প্রাক্তন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস। অধুনা রাজভবন, বর্তমান লোকভবন থেকে বিবৃতি জারি করে ‘পিস রুম’ খোলেন তিনি। তারপরেই পড়ে যান শাসকের নিশানায়। ‘পিস রুম’-এর এক্তিয়ার নিয়ে প্রশ্ন করেন প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদ শান্তনু সেন। বলেন, “নির্বাচন কমিশনের আওতায় এখন সবকিছু। নির্বাচন আচরণ বিধির ঊর্ধ্বে কেউ নন, স্বয়ং রাজ্যপালও নন। সুতরাং এই সময় এটা কতটা করা যায় আমার জানা নেই।” সন্দেশখালিতে থেকে মুর্শিদাবাদের হিংসা! ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে প্রতিবার রাজ্যের শাসকশিবিরের নিশানার মুখে পড়েছিলেন সিভি আনন্দ বোস। কখনও প্রশ্ন তুলেছিলেন রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে। কখনও সওয়াল করেছেন রাষ্ট্রপতি শাসন জারির করার পক্ষে। যার পাল্টা প্রতিবারই তাঁকে ‘বিজেপির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ করেছে তৃণমূল। এই বিতর্কের আগুন দাবানলে পরিণত হয়েছিল একটি অভিযোগ ঘিরে। তা হল শ্লীলতাহানির। আর রাজ্যপাল বনাম রাজ্য সংঘাতের এটাই যেন সবচেয়ে তিক্ত পর্ব। সিভি আনন্দ বোসের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিলেন রাজভবনের এক অস্থায়ী মহিলা কর্মী। কলকাতার হেয়ার স্ট্রিট থানায় লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছিলেন তিনি। তারপরই সরগরম রাজ্য রাজনীতি। প্রাক্তন রাজ্যপালকে তুলোধনা করতে ছাড়েনি শাসকশিবির। কাঠগড়ায় তোলা হয়েছিল বিজেপিকেও। খোদ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হাতজোড় করে বলেছিলেন, “বাবা রে! আমাকে আর রাজভবনে ডাকলে আমি আর যাব না। রাজভবনে আমি আর যাচ্ছি না ভাই। আমাকে রাস্তায় ডাকলে যাব। কথা বলতে হলে আমাকে রাস্তায় ডাকবেন। কিন্তু, যা কীর্তি-কেলেঙ্কারি শুনছি তাতে আপনার পাশে বসাটাও পাপ।” এই সময় বাংলার চার বিধানসভায় উপনির্বাচন হয়েছিল। শ্লীলতাহানির অভিযোগকে সামনে রেখে রাজভবনে শপথবাক্য পাঠ করতে যেতে চাননি বিজয়ী প্রার্থীরাও। ‘নিরাপত্তাহীনতার’ কথা বলেছিলেন বরাহনগরে জয়ী সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। সিভি আনন্দ বোসকে সরাসরি আক্রমণ। রাজভবনে বন্দুক-বোমা রাখার অভিযোগ তুলেছিলেন খোদ শ্রীরামপুর লোকসভার তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপর দিন তিনেক রাজ্য রাজনীতির পারদ একেবারের চরমে। কল্যাণ বলেছিলেন, “রাজভবনে বসে ক্রিমিনালদের ডাকছেন। সবার হাতে একটা বন্দুক দিচ্ছেন, বোমা দিচ্ছেন।” তারপরই শুরু হয়েছিল চিঠি চালাচালি। সাধারণ মানুষের জন্য অধুনা রাজভবন, বর্তমান লোকভবন খুলে দিয়েছিলেন সিভি আনন্দ বোস।

রাষ্ট্রপতি শাসন মানে রাজ্য সরকারের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় সরকার তথা দিল্লির শাসন জারি। সাধারণভাবে রাজ্যপালের সুপারিশ ক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি ভবন রাষ্ট্রপতি শাসন কায়েমের বিজ্ঞপ্তি জারি করে থাকে। তবে জমানা নির্বিশেষে রাজ্যপালদের অন্ধকারে রেখে সরাসরি দিল্লির ইচ্ছায় রাষ্ট্রপতি শাসন জারির একাধিক দৃষ্টান্ত আছে। পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সম্ভাবনা নিয়ে বিগত কয়েক মাস যাবত তৃণমূল ও বিজেপির অন্দরে আলোচনা চলছে। সাধারণভাবে মনে হতে পারে, শুধু বিজেপিই রাষ্ট্রপতি শাসন প্রত্যাশা করে। রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসেরও রাষ্ট্রপতি শাসনের প্রত্যাশা অসম্ভব নয়। অতীতে একাধিক রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসনের সুবাদে শাসক দল ভোটের বাক্সে শহিদের মর্যাদার ষোলআনা লাভ তুলেছে। ধর্মতলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধর্ণা কর্মসূচি তেমন সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি বলা চলে। সত্যিই রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হলে তৃণমূলের গোটা রাজ্য অচল করে দেওয়া অসম্ভব নয়। রাষ্ট্রপতি শাসন মানে রাজ্য সরকারের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় সরকার তথা দিল্লির শাসন জারি। সাধারণভাবে রাজ্যপালের সুপারিশ ক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি ভবন রাষ্ট্রপতি শাসন কায়েমের বিজ্ঞপ্তি জারি করে থাকে। তবে জমানা নির্বিশেষে রাজ্যপালদের অন্ধকারে রেখে সরাসরি দিল্লির ইচ্ছায় রাষ্ট্রপতি শাসন জারির একাধিক দৃষ্টান্ত আছে। পশ্চিমবঙ্গে যদি সত্যিই অদূর ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয় তবে সেক্ষেত্রে সরাসরি দিল্লির সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা দুটি কারণে কম।‌ এক. পশ্চিমবঙ্গে সিভি আনন্দ বোসের জায়গায় দিল্লি যাঁকে রাজ্যপাল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেই আরএন রবি রাজ্য সরকারের সঙ্গে অসহযোগিতার নজির করেছেন তামিলনাড়ুতে। ‌ এজন্য তিন তিনবার সুপ্রিম কোর্টের ভৎসর্নার মুখে পড়েছেন এই অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস। দক্ষিণের ওই রাজ্যটিতে তার একাধিক সিদ্ধান্ত ছিল ব্যতিক্রমী, বিতর্কিত এবং রাজ্যপাল পদের জন্য বেমানান। সেই তিনি বাংলার রাজ্যপাল হয়ে আসছেন শুনে অনেকের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি শাসনের শঙ্কা জেগেছে। ধরে নেওয়া যায় দায়িত্বভার নেওয়ার পর নতুন রাজ্যপাল প্রথমেই রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর অভিযোগ নিয়ে রাজ্য সরকারের জবাবদিহি চেয়ে সংঘাতের পথে অগ্রসর হতে পারেন। উত্তরবঙ্গ সফরে রাষ্ট্রপতির প্রতি রাজ্য প্রশাসনের ব্যবস্থাপনা প্রশাসনিক বিধিসম্মত তথা সঠিক ছিল না। রাষ্ট্রপতির অমর্যাদা হয়েছে এতে কোন সন্দেহ নেই। রাষ্ট্রপতির প্রতিক্রিয়া সাংবিধানিক পদমর্যাদার সঙ্গে মানানসই ও শিষ্টাচার সম্মত ছিল না। এই ব্যাপারে প্রশাসনিক স্তরেই রাষ্ট্রপতি ভবন রাজ্য সরকারকে রাষ্ট্রপতির অসন্তোষের কথা জানিয়ে দিতে পারত। রাষ্ট্রপতির মত পদাধিকারীর ক্ষেত্রে প্রোটোকল বা নিয়মবিধির সামান্য বিচ্যুতিও গ্রাহ্য করা হয় না। আমার মনে আছে শঙ্কর দয়াল শর্মা রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন কলকাতা সফর শেষে তিনি ফিরে যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে রাজ্য পুলিশের ডিজি উপস্থিত ছিলেন না। ডিজির অনুপস্থিতি নিয়ে রাষ্ট্রপতি ভবন পরদিনই রাজ্যের মুখ্য সচিবকে চিঠি দিয়ে নির্দেশ দিয়েছিল পুলিশ কর্তাকে যেন সতর্ক করা হয়। কিন্তু রাষ্ট্রপতি ভবন প্রকাশ্যে এ নিয়ে টুঁ শব্দটি করেনি। আমার মতে দ্রৌপদী মুর্মু সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হেঁটে রাষ্ট্রপতি পদকে বিতর্কে জড়িয়েছেন। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে যখন নির্বাচন আসন্ন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে রাজ্য সরকারের বিবাদ তুঙ্গে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতেই সাংবিধানিক প্রধানদের স্বকীয়তার পরিচয় দিতে হয়। দুই কক্ষের একটিরও সদস্য না হলেও ভারতের সংসদের শীর্ষে অবস্থান করেন রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতির পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর নতুন সংসদ ভবনের উদ্বোধন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্রৌপদী মুর্মু প্রশ্ন তুললে বরং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধানের মর্যাদা‌ আরও সমুন্নত হতো। কিন্তু সংসদ ভবনের শিলান্যাসে ডাক না পেয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দও প্রশ্ন তোলেননি। এগুলি ছিল গুরুতর সাংবিধানিক প্রশ্ন। যে প্রশ্নগুলি উত্থাপন করে রাষ্ট্রপতি পদের প্রতি যথার্থ মর্যাদা জ্ঞাপন হতে পারত।
উত্তরবঙ্গ সফরে দ্রৌপদী মুর্মুর প্রকাশ্যে অসন্তোষ ব্যক্ত করার ঘটনা নিয়ে অনেককেই বলতে শুনেছি, এরপর রাষ্ট্রপতি শাসনই বাংলার ভবিতব্য। গত শতকের সত্তরের দশক পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি শাসন জারিতে প্রথম পাঁচটি রাজ্যের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের নাম থাকত। এরাজ্যে এখনও পর্যন্ত পাঁচ বার প্রেসিডেন্ট রুল জারি হয়েছে। শেষবার হয়েছিল সত্তরের দশকের শেষে। তারপর বিহার, উত্তরপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্নাটক, তামিলনাড়ু, জম্মু-কাশ্মীর এবং উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলি-সহ একাধিক রাজ্যে একাধিকবার রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার প্রথম পাঁচ বছর রাষ্ট্রপতি শাসন জারির আশঙ্কা প্রচার করেই নিরাপদে ক্ষমতায় টিকে গিয়েছিল। গনিখান চৌধুরীসহ কংগ্রেসের তৎকালীন নেতারা বামফ্রন্ট সরকারকে বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করার কথা বললেও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলায় রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে সিপিএমকে শহিদ হওয়ার সুযোগ দেননি। বিগত কয়েক বছর যাবত রাষ্ট্রপতি শাসন জারির ঘটনা এক প্রকার বিক্ষিপ্ত সিদ্ধান্ত। তবে তা কেন্দ্রের বদান্যতা নয়। একাধিক মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বলেছে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির মতো পদক্ষেপ হতে হবে নিতান্তই নিরুপায় পরিস্থিতিতে। নরেন্দ্র মোদী সরকারের সুপারিশ মেনে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মত সংবিধান ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞ রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত বিধি বহির্ভূতভাবে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির কারণে সর্বোচ্চ আদালতের সমালোচনার মুখে পড়েন। অতীতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছে মূলত রাজনৈতিক হিংসা সহ আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, শাসক দলে বিভাজন এবং দলবদলজনিত করে পরিস্থিতি মোকাবিলায়। পশ্চিমবঙ্গে এই মুহূর্তে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির মতো কেন্দ্রের হাতে এই জাতীয় কোন ধারালো অস্ত্র নেই। ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচন পরবর্তী হিংসাত্মক পরিস্থিতি তুলনায় এবার ভোটের ঠিক মুখে অবস্থা তুলনামূলকভাবে অনেকটা ভাল। তারপরও জোর দিয়ে বলার অবকাশ নেই যে পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হবে না। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বাংলায় যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। যে ষাট লাখ ভোটারের ভোটদান ঘিরে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে তারা আইনি পথে ভোটাধিকার আদায় করতে চাইলে আদালত রাজ্যে পুরো এসআইআর প্রক্রিয়া শেষ না করে ভোট স্থগিত রাখার নির্দেশ দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে, রাজ্য বিধানসভা এবং রাজ্য সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি শাসনই একমাত্র বিকল্প। ‌ এবং সেই সিদ্ধান্তকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া বলার অবকাশ তেমন একটা থাকবে না। বিজেপি তথা কেন্দ্রীয় সরকার এমন কৌশল নিয়ে এগোতে পারে এই আশঙ্কা তৃণমূলের মধ্যে আছে। সেই কারণেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অতীতের সিপিএম তথা বামফ্রন্টের মতন বাংলার বিরুদ্ধে দিল্লির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে সরব।

অতীতে অনেক রাজ্যেই এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির নজির আছে। এর মধ্যে দুটি রাজ্য বিহার এবং ত্রিপুরায় সরকার ও বিধানসভার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সময় সেখানে থাকার সুযোগ হয়েছিল আমার। বিহারে ১৯৯৫ এর বিধানসভা ভোটে তৎকালীন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার টিএন শেসন প্রথমে দু দফায় ভোট ঘোষণার পর শেষ পর্যন্ত নির্বাচন করিয়েছিলেন পাঁচ পর্বে। এক পর্যায়ে রাজ্য সরকার ও বিধানসভার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়। আমার বেশ মনে আছে মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদব কীভাবে নির্বাচন কমিশন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে লোক খেপিয়ে ছিলেন। যদিও ঘনিষ্ঠ মহলে তিনি শেসনের সিদ্ধান্তে সন্তোষ প্রকাশ করছিলেন। কারণ, লালু প্রসাদ বুঝেছিলেন, রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হলে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অপশাসনের সব অভিযোগ মুহূর্তে চাপা পড়ে যাবে। তিনি শহিদের মর্যাদা পেয়ে যাবেন। বাস্তবে তাই হয়েছিল। দুই তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে ফের মুখ্যমন্ত্রী হন তিনি। ত্রিপুরার ঘটনাটি খানিক পৃথক। ১৯৯৩-এ সেখানে কংগ্রেসের সমীর রঞ্জন বর্মনের সরকার। ভোটের আগে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি হওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকার আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েনের জন্য লম্বা সময় ধার্য করে। ফলে স্থগিত ভোট ফের করার আগে সরকার ও বিধানসভার মেয়াদ ফুরিয়ে যায়। ভোট হয় রাষ্ট্রপতি শাসনাধীনে। সমীর বর্মন অবশ্য সরকার টেকাতে পারেননি। ক্ষমতায় ফিরেছিল সিপিএম। বিহার ও ত্রিপুরার রাষ্ট্রপতি শাসনে বিধানসভা ভোটের পর বিগত তিন সাড়ে তিন দশকে পরিস্থিতির অনেক বদল ঘটে গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন পিছিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করলে তৃণমূল কংগ্রেস যেমন শহিদের মর্যাদা পেতে পারে, তেমনই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অন্তত মাস ছয়েক বিজেপি শাসিত কেন্দ্রীয় সরকার আয়ুষ্মান ভারত সহ দিল্লির জনমুখী কর্মসূচিগুলি পশ্চিমবঙ্গে মিশন মোডে বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে। ১০০ দিনের কাজ এবং আবাস ও সড়ক যোজনায় বিপুল অর্থ বরাদ্দ করে বাংলায় সরকার গড়ার আগেই রাজ্যবাসীকে খুশি করার সুযোগ তারা হাতছাড়া করবে না। কেন্দ্রের কাছে সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, বিধানসভা ও সরকারের মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হলে আদালতে সমস্যায় পড়ার সম্ভাবনা কম। কারণ রাষ্ট্রপতি শাসন জারি তখন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। ‌এই সবকিছুই নির্ভর করবে এসআইআর এবং সন্দেহভাজন ৬০ লক্ষ ভোটারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আদালত কী অবস্থান নেয় তার ওপর। আদালত গোটা প্রক্রিয়ার মীমাংসা শেষে নির্বাচনের রায় দিলে ভোট পিছতে বাধ্য। তৃণমূলের অন্দরে অনেকেই মনে করছেন এমন পরিস্থিতি আঁচ করেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘুঁটি সাজিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হলে তিনি কংগ্রেসসহ বিজেপি বিরোধী প্রায় সব দলকেই পাশে পেয়ে যাবেন হয়তো এই অঙ্ক বিবেচনায় রেখেই তৃণমূল কংগ্রেস লোকসভার স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles