ভোটের আগে নতুন লড়াই! সম্মুখসমরে নরেন্দ্র মোদি ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়! রাষ্ট্রপতির সম্মান নিয়ে! দ্রৌপদীর ‘অসম্মান’ নিয়ে সরব প্রধানমন্ত্রী, মুর্মুকে নিশানা করে তোপ মমতার। এসআইআর এবং মানুষের ‘হেনস্থা’ থেকে আলোচনা ঘোরানোর জন্য নতুন বিষয়। উৎস, উত্তরবঙ্গে এসে রাষ্ট্রপতির তোলা কিছু অনুযোগ এবং রাজ্যে আদিবাসী উন্নয়ন নিয়ে তোলা তাঁর কিছু প্রশ্নকে কেন্দ্র করে মোদি-মমতা সম্মুখসমরে। এসআইআর নিয়ে ধর্মতলায় তৃণমূলের ধর্নামঞ্চে বক্তৃতা করতে গিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘‘এখানে এসে মাননীয়া রাষ্ট্রপতিও ‘জয় বাংলা’ বলে গিয়েছেন!’’ ২৪ ঘণ্টা পরে শনিবার সেই ধর্নামঞ্চ থেকেই রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর বক্তব্য নিয়ে চোখা চোখা বিশেষণ ব্যবহার করে মুখর হলেন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু তা-ই নয়। বলা ভাল রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে কেন্দ্র করে ভোটের লড়াই বেধে গেল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং মমতার মধ্যে। তাতে জুড়ে গেলেন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং তৃণমূলের সেনাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও।
আন্তর্জাতিক সাঁওতাল সম্মেলনে উত্তরবঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘‘প্রশাসনের মনে কী চলছিল জানি না। আমি তো সহজে এলাম। ওরা বলেছিল পর্যাপ্ত জায়গা (অনুষ্ঠান করার) নেই। এখানে তো ৫ লক্ষ লোক হয়ে যাওয়ার কথা! আমিও বাংলার মেয়ে। আমাকে বাংলায় আসতেই দেওয়া হয় না। মমতাদি আমার ছোটবোন। জানি না, আমার উপর কী রাগ। যাই হোক… কোনও অভিযোগ নেই। কোনও ক্ষোভ নেই। উনি ভাল থাকুন, আপনারাও ভাল থাকুন। আমার দেখে মনে হচ্ছে না, সাঁওতাল সমাজ বা আদিবাসী সমাজের মানুষ সরকারি কোনও সুযোগ সুবিধা পান। আদৌ সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা তাঁরা পান কি না, তা নিয়ে আমাদের সন্দেহ রয়েছে।’’ ধর্মতলার ধর্নামঞ্চ থেকে মমতা প্রতিক্রিয়া দেন ৫০ মিনিটের প্রায় সিংহভাগ সময়ই ব্যয় করে, ‘‘আই অ্যাম সরি ম্যাডাম। আই হ্যাভ গ্রেট রিগার্ড্স ফর ইউ। বাট ইউ আর ট্র্যাপ্ড বাই দ্য বিজেপি’স পলিসি (মাননীয়া আমি দুঃখিত। আপনার প্রতি আমার অনেক শ্রদ্ধা। কিন্তু আপনি বিজেপির নীতির ফাঁদে পড়েছেন)।বিজেপির পরামর্শে বিধানসভা ভোটের সময় রাজনীতি করবেন না। এসআইআর নিয়ে একটাও কথা বললেন না তো? কত আদিবাসীর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেই খবর রেখেছেন? খোঁজ নিয়ে নিন, আমরা আদিবাসীদের জন্য কী কী করেছি। অন্য রাজ্য কী করেছে।’’ এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করে মমতা জানান, রাষ্ট্রপতির কর্মসূচির আয়োজক ‘আন্তর্জাতিক সাঁওতাল কাউন্সিল’ একটি বেসকরকারি সংস্থা। তাঁর কর্মসূচির বিষয়েও রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের সঙ্গে জেলা প্রশাসন সমন্বয়ও রেখেছিল। গত বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতির সচিবালয়কে জানানো হয়, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই। তার পরেও কর্মসূচি অপরিবর্তিত রাখা হয়। শনিবার শিলিগুড়ির মেয়র, দার্জিলিংয়ের জেলাশাসক সকলেই রাষ্ট্রপতিকে অভ্যর্থনা জানাতে হাজির ছিলেন। সেখানে কোনও প্রোটোকল বিঘ্নিত হয়নি। শেষে তিনি লেখেন, ‘‘সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হল, বিজেপি নিজেদের দলীয় উদ্দেশ্য সাধিত করতে দেশের সর্বোচ্চ পদকেও ব্যবহার করছে।’’ সমাজমাধ্যমে সরব হন প্রধানমন্ত্রী মোদী। তিনি লেখেন, ‘‘এটি লজ্জাজনক এবং নজিরবিহীন। গণতন্ত্র এবং জনজাতি সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী মানুষজন সকলেই মর্মাহত। জনজাতি সম্প্রদায় থেকেই উঠে আসা রাষ্ট্রপতি মহোদয়ার প্রকাশিত বেদনা ও উদ্বেগ ভারতের মানুষের মনে গভীর দুঃখের সঞ্চার করেছে।’’ তিনি অভিযোগ করেন, পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকার সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করেছে এবং রাষ্ট্রপতির প্রতি এই ‘অসম্মানের’ জন্য রাজ্যের প্রশাসনই দায়ী। একই সঙ্গে তাঁর মত, সাঁওতাল সংস্কৃতির মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়কে পশ্চিমবঙ্গ সরকার অত্যন্ত হালকা ভাবে দেখছে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন, ‘‘রাষ্ট্রপতির পদ রাজনীতির ঊর্ধ্বে এবং এই পদের মর্যাদা সর্বদা রক্ষা করা উচিত। আশা করা যায়, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও তৃণমূল কংগ্রেসের শুভবুদ্ধির উদয় হবে।’’
রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধান রাজ্যপালকে ঘিরে বিতর্ক পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন নয়। সিভি আনন্দ বোসের ইস্তফা এবং পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজ্যপাল হিসাবে আরএন রবির নিয়োগ সেই পুরনো বিতর্ক নতুন করে উস্কে দিয়েছে। কিন্তু দেশের সাংবিধানিক প্রধান রাষ্ট্রপতিকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রীর লড়াই সাম্প্রতিক অতীতে নজিরবিহীন। আগামী শনিবারই ব্রিগেডে সভা করতে আসছেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানেও তিনি এই প্রসঙ্গ তুলবেন বলে নিশ্চিত অনেকেই। মোদীর সুরে শাহও শনিবার আক্রমণ শানিয়ে লিখেছেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকার নতুন একটি নিম্নমানের উদাহরণ তৈরি করেছে। যা সরাসরি রাষ্ট্রপতিকে অবজ্ঞা এবং অসম্মাম।’’ পাল্টা অভিষেক লিখেছেন, ‘‘বিজেপি, নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় এজেন্সি, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, রাজ্যপাল-সহ সমস্ত প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে বাংলার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন বাংলা আরও শক্তিশালী হয়।’’ তবে বিজেপি যে রাষ্ট্রপতি ইস্যুকে সামনে রেখে ঝাঁপাচ্ছে, তা স্পষ্ট একের পর এক পোস্ট থেকেই। মোদী, শাহ ছাড়াও শনিবার রাতে এ নিয়ে সমাজমাধ্যমে তৃণমূল সরকারকে বিঁধে পোস্ট করেছেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রাজনাথ সিংহ, নিতিন গডকড়ী, জ্যোতিরাদিত্য শিন্ডে, কিরেন রিজিজু। পোস্ট করেছেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। এবং উপরাষ্ট্রপতি সিপি রাধাক়ৃষ্ণণও। রাজ্যের বিজেপি নেতাদের মধ্যে শমীক ভট্টাচার্য, সুকান্ত মজুমদার, শুভেন্দু অধিকারী তো আছেনই। তৃণমূল মনে করছে, জনজাতি অংশের মধ্যে এই ঘটনা প্রভাব তৈরি করতে পারে। বিজেপি যে এই বিষয়ে আদিবাসী ভোটারদের মধ্যে প্রচার চালাবে তা-ও আঁচ করছে রাজ্যের শাসকদল। হতে পারে সে কারণেই শনিবার রাতে ঝাড়গ্রামে জরুরি সাংবাদিক বৈঠক করেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা আদিবাসী অংশ থেকে উঠে আসা নেত্রী বিরবাহা হাঁসদা। ধর্নামঞ্চ থেকে মমতা রাজ্যসভায় তৃণমূলের দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং লোকসভার প্রবীণ সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে দায়িত্ব দিয়েছেন, যাতে তাঁরা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চান। তার পর রাজ্যের জনজাতি অংশের জন্য রাজ্য সরকার কী কী করেছে, তার খতিয়ান পৌঁছে দিয়ে আসেন। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে জনজাতি অধ্যুষিত জঙ্গলমহলের সবক’টি আসন জিতেছিল বিজেপি। কিন্তু ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে সেই ক্ষত অনেকটাই মেরামত করে তৃণমূল। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে পশ্চিমাঞ্চলের তিনটি লোকসভা আসন বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম এবং মেদিনীপুর দখল করে নেয় তৃণমূল। রাজনৈতিক মহলের অনেকের অভিমত, রাষ্ট্রপতিকে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক এই অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি প্রভাব তৈরি করতে পারে। তবে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরেও এই বিতর্ক ছাপ ফেলবে বলে অভিমত অনেকের।
তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পরে নিউটাউন কলকাতা ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (এনকেডিএ)-এর চেয়ারম্যান পদ পেয়েছিলেন কলকাতার প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু কয়েক মাস কেটে গেলেও রাজনৈতিক পরিসরে প্রকাশ্যে সে ভাবে তাঁকে দেখা যায়নি। শনিবার ধর্নামঞ্চে ছিলেন তিনি। তবে আধঘণ্টার মতো। তার পর চলে যান। মমতা জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘‘এপ্রিলের ১ তারিখ নয়, আজই যুবসাথীর টাকা চলে যাবে অ্যাকাউন্টে।’’ বিকেলের মধ্যে তা বাস্তবায়িত হতেও শুরু করে। মঞ্চ থেকে যার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেন মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। মঞ্চের সামনে ব্যানার ঝোলানো হয়, তাতে লেখা ছিল, ‘‘যুবসাথীর ১৫০০ টাকা পেয়েছি। ধন্যবাদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।’’ ব্যানার দেখে তরুণদলকে পাল্টা ধন্যবাদ জানান মমতা। ধর্নামঞ্চে বক্তা হিসাবে জায়গা পেলেন সিপিএম থেকে তৃণমূলে যোগ দেওয়া তরুণ নেতা প্রতীক-উর রহমান। মিনিট ১৫-র বক্তৃতার পরে মুখ্যমন্ত্রীও প্রশংসা করলেন এসএফআইয়ের প্রাক্তন রাজ্য সভাপতির। মমতা বলেন, ‘‘প্রতীক-উর খুব ভাল বলেছ। এ বার একটু জল খাও।’’ তৃণমূলের প্রায় সবাই যখন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার, রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়ালকে নিশানা করছেন, তখন তরুণ নেতা সুদীপ রাহা আক্রমণ করলেন রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়ার বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্তকে। তাঁর কথায়, ‘‘এই সুব্রত গুপ্তকে দিয়ে সিপিএম সিঙ্গুরে জমি দখল করিয়েছিল। আর বিজেপি এসআইআর করে নাম বাদ দেওয়াচ্ছে। ওঁর মুখোশ খুলে দিতে হবে।’’ ধর্মতলায় লেনিনমূর্তির অদূরেই তৈরি হয়েছে ধর্নামঞ্চ। যে হেতু মুখ্যমন্ত্রী রাতে সেখানেই থাকছেন তাই নিরাপত্তা ব্যবস্থাও সাজাতে হয়েছে প্রশাসনকে। মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তার জন্য লেনিনমূর্তির পাদদেশেই তৈরি হয়েছে অস্থায়ী তাঁবু। মমতার ধর্নার দ্বিতীয় দিনের শেষ পর্বে রাষ্ট্রপতির বিষয়ই দুই যুযুধান পক্ষের সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়াল। এর প্রভাব রবিবার বা তার পরেও থাকবে তার ইঙ্গিত স্পষ্ট। রবিবার তৃতীয় দিনে পড়বে মমতার ধর্না। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে মূলত মহিলাদেরই জমায়েত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রবিবার গ্যাসের দামবৃদ্ধির প্রতিবাদে কর্মসূচি হবে ধর্মতলার ধর্নাতলায়।





