পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে ফের ভোটপ্রস্তুতি পর্যালোচনা বৈঠকে বসছে কমিশন। ভোট প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে জাতীয় নির্বাচনের ফুল বেঞ্চ আসার আগেই রাজ্যে আসছে জ্ঞানেশ ভারতীর নেতৃত্বে চার সদস্যর প্রতিনিধি দল। রবিবার কলকাতায় আসবে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা। পরদিন সোমবার শহরে আসার কথা ফুল বেঞ্চের। বৈঠক করবেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তর, পুলিশ ও প্রশাসনের কর্তাদের সঙ্গে। তবে ৬০ লক্ষের বেশি বিচারাধীন ভোটারদের নিয়ে কোনও আলোচনা হয় কিনা সেদিকে নজর ওয়াকিবহাল মহলের। আদালত সূত্রে খবর, বুধবার পর্যন্ত সাড়ে ৪ লক্ষ বিচারাধীনের ভবিষ্যৎ বিচারকরা সমাধান করেছেন। এদিকে একজনেরও ভোটাধিকার না কেড়ে সঠিক সময়ের মধ্যে আদৌ ভোট করান সম্ভব কি না ১০ তারিখ সুপ্রিম কোর্টে তার আভাস মিলতে পারে। কারণ ওই দিন দেশের সর্বোচ্চ আদালতে শুনানি রয়েছে। শুনানিতে অবধারিতভাবে বিচারাধীন ৬০ লক্ষের প্রসঙ্গ উঠবে। একগুচ্ছ প্রশ্ন রেখেই ভোটের সব প্রস্তুতি সেরে রাখতে তৎপর নির্বাচন কমিশন। ৯ ও ১০ মার্চ কমিশনের ফুল বেঞ্চ থাকবে রাজ্যে। রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক ছাড়াও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ভোট কর্মীদের প্রশিক্ষণ খতিয়ে দেখবে ফুল বেঞ্চ। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনী ছাড়াও রাজ্য এবং কলকাতা পুলিশের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন জাতীয় নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। কমিশনের কর্তারা ফিরে যাওয়ার পর ১৫ অথবা ১৬ তারিখ ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা। কারণ ১৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রী কলকাতায় থাকবেন। তার আগে ৮ রাজ্যে চলে আসবে কমিশনের চার সদস্য।
বৃহস্পতিবার সিইও দফতরে ভার্চুয়াল মাধ্যমে ওই বৈঠক হবে। বুধবার কমিশন সূত্রে যা খবর, তাতে ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ ভারতীর নেতৃত্বে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দু’দফায় বৈঠক হবে। আগামী সপ্তাহে ভোট পর্যালোচনা করতে নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চ রাজ্যে আসার কথা। তার আগে এই প্রস্তুতি বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ। কমিশনের একটি সূত্রের খবর, রাজ্য প্রশাসনিক কর্তাদের সঙ্গে কমিশনের সিনিয়র উপনির্বাচন কমিশনারের বৈঠকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সব ঠিক থাকলে আগামী ৯-১০ মার্চ রাজ্যে আসবেন দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার-সহ কমিশনের ফুল বেঞ্চ। তাঁরা জেলাশাসক, অতিরিক্ত জেলাশাসক, নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য আধিকারিক, রাজ্য পুলিশের ডিজি, এডিজি (আইনশৃঙ্খলা), কলকাতার পুলিশ কমিশনার এবং পুলিশের অন্যান্য কর্তার সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন। প্রথা অনুযায়ী, বৈঠকের পরে দিল্লি যাওয়ার দিনকয়েকের মধ্যেই ভোট ঘোষণা হতে পারে। উল্লেখ্য, এর আগে কমিশন জানিয়েছিল, শীর্ষ আদালতের নির্দেশ মেনে সম্পূর্ণ তালিকা প্রকাশের আগেই ভোট ঘোষণা হতে পারে রাজ্যে। যদিও তা শেষ পর্যন্ত হয়নি। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতর আসন্ন বিধানসভা ভোটের আগে নতুন করে বুথবিন্যাসের পরিকল্পনা বাতিল করার কথা জানায়। ৮০,৬৮১টি বুথই থাকছে রাজ্যে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এর কাজ শেষ না হওয়ায় বুথবিন্যাস করা হবে না বলে জানানো হয়েছে। বিধানসভা নির্বাচনের দিন ঘোষণা হওয়ার আগেই রাজ্যে এসে পৌঁছেছে আধাসেনা। অনেক জায়গায় তারা ইতিমধ্যে রুট মার্চও শুরু করে দিয়েছে। উল্লেখ্য, রাজ্যে মোট ৪৮০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনীর আসার কথা। প্রথম দফায় ২৪০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী এসে গিয়েছে। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে আরও ২৪০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনীর আসার কথা। লালবাজার সূত্রের খবর, প্রাথমিক ভাবে ঠিক হয়েছে, প্রথম দফায় ছত্তীসগঢ় থেকে ১২ কোম্পানি সিআরপিএফ কলকাতায় আসবে। তাদের পুরুলিয়া হয়ে শহরে আসার কথা। তাদের থাকার জন্য লালবাজারের তরফে ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ প্রস্তুত করা হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে ৬৩ লক্ষ নাম বাদ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তাঁদের কেউ মৃত, কেউ স্থানান্তরিত, কেউ গরহাজির, কারও অন্য জায়গায় নাম রয়েছে। আরও ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ নাম ‘অ্যাডজুডিকেশন’ বা ‘বিবেচনাধীন’। ওই বিবেচনাধীন ভোটারদের নথি খতিয়ে দেখছেন এসআইআর-এর কাজে নিযুক্ত বিচারকেরা। সূত্রের খবর, মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত মাত্র ৪ লক্ষ বিচারাধীন নামের নিষ্পত্তি সম্ভব হয়েছে। বাকি ৫৬ লক্ষ বিবেচনাধীন ভোটার নিষ্পত্তি হতে ঠিক কত দিন লাগতে পারে, তা নিয়ে ধন্দে কমিশনও। কমিশন অবশ্য আশাবাদী। কারণ, নিষ্পত্তির কাজের জন্য বিচারকের সংখ্যা আরও বাড়ানো হচ্ছে। বিহার, ঝাড়খণ্ডের মতো প্রতিবেশী রাজ্য থেকে প্রায় ২০০ জন বিচারক আনা হচ্ছে। তাঁরা কাজে যোগ দিলে বাছাই এবং নিষ্পত্তির গতি বেড়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু কাজ শেষ হতে ঠিক কত দিন লাগবে, এ নিয়ে নির্দিষ্ট আভাস মিলছে না। বা আদৌ সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকছেই। এই প্রেক্ষিতে সকলেই তাকিয়ে সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী শুনানির দিকে। ১০ মার্চ এসআইআর সংক্রান্ত মামলার পরবর্তী শুনানি রয়েছে শীর্ষ আদালতে। সেখানে ৬০ লক্ষ বিচারাধীনের বিষয়টি উঠবে বলে কমিশন সূত্রে খবর। বিচারপতিদের জানানো হবে, কত লক্ষ নামের নিষ্পত্তি হল, কত নামের নিষ্পত্তি বাকি এবং এই প্রক্রিয়ার সুবিধা-অসুবিধার কথা। এসআইআরের প্রথম দফার চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর দেখা যাচ্ছে, রাজ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ‘অ্যাডজুডিকেশন’ বা বিবেচনাধীন ভোটার রয়েছেন মুর্শিদাবাদ এবং মালদহ জেলায়। প্রকাশিত ভোটার তালিকায় মালদহে ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯ লক্ষ ৮৬ হাজার ২০৩। ওই জেলায় বিবেচনাধীন তালিকায় রয়েছে ৮ লক্ষ ২৮ হাজার ৮০ জন। ফলত এ পর্যন্ত যা কাজ এগিয়েছে, তার সঙ্গে শুধু মালদহের তুলনা করলে দেখা যাচ্ছে, একটি জেলার অর্ধেক বিবেচনাধীন ভোটারের নিষ্পত্তি সম্ভব হয়েছে।





