‘আপাদমস্তক মিথ্যাচারিতায় ভরপুর’ বলছে নেটিজন। বিলিমোরিয়া বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন করেন, আপনি নাকি প্রতি দিন ৬০ হাজার স্টেপ হাঁটেন? প্রশ্টা শুধরে দেওয়া যেত এভাবে, আচ্ছা প্রতিদিন ৬০হাজার স্টেপ কেউ হাঁটতে পারে? তা না করে মমতা জবাব দিতে গিয়ে প্রথমে বলেন, ‘‘আপনার মা-মাটি-মানুষই আমার প্রেরণা। আমার পদবি ব্যানার্জি, তাই এত এনার্জি।’’ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কেলগ কলেজে বক্তব্য রাখতে লন্ডন সফরে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী একেবারে ল্যাজেগোবরে। অসংখ্য ভুল ইংরেজী, প্রোনাউন্সিং সমস্যা, ট্রান্সলেশনে ভুলভাল বলে অভিযোগ। অক্সফোর্ডের কলেজে নিজেকে জাহির করতে গিয়ে মুখ পুড়ল বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর। বাংলার সংস্কৃতীর, প্রথমদিকে করতালির মধ্যে শুরু মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণ। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, বাংলা বিবেকনন্দর রাজ্য। ঐক্য ভীষণ কঠিন। বাংলায় কোনও বৈষম্য নেই। বাংলা মা-মাটি-মানুষের রাজ্য। গুজরাট ধনী রাজ্য। কিন্তু সেখানে লোকসংখ্যা বাংলার এক চতুর্থাংশ। ১১ কোটি মানুষের বাস বাংলায়। ৩৩ শতাংশ সংখ্যালঘু। তাঁদের মধ্যে মুসলিমের পাশাপাশি খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, জৈন আছে। বহু আদিবাসীও আছে। তফসিলি জনসংখ্যা ৩৩ শতাংশ। চাকরি থেকে শিক্ষা, ভিনরাজ্যের বহু মানুষ বাংলাকে তাঁদের বানিয়ে নিয়েছে। জানালেন মমতা। করোনার পর ধাক্কা খেয়েছে অর্থনীতি। গরিব ছাত্রদের পাশে থেকে স্কলারশিপের ব্যবস্থা করেছি। ন’বছরে বাবাকে হারিয়ে লড়াই শুরু। বিরোধী হয়ে প্রচুর লড়াই করেছি। রেল-কয়লা-নারী ও সমাজ কল্যাণ এবং ক্রীড়ামন্ত্রী ছিলাম। মমতা কর্মসংস্থান ও টাটা গোষ্ঠী প্রসঙ্গে বলেন, ‘সেটা হতে পারে আইবিএম, এটা হতে পারে টাটা, এটা হতে পারে ইনফোটেক, উইপ্রো, হতে পারে দেউচা পাচমি..। ওটা ভুল। টাটা কগনিজেন্ট আছে.. ওরা টাটা কনগনিজেন্ট শুরু করেছে।’ দর্শকাসন থেকে আবার আসে পাল্টা বক্তব্য, মমতা ধৈর্য ধরে রেখে বলেন,’আমি মিথ্যা কথা বলছি না। আমার ভাই আপনি শুনুন। এটা গণতন্ত্র। সকলের প্রশ্ন করার অধিকার আছে। আপনাদের বিরোধিতায় আমি উৎসাহ পাই।’ ১৯৯৩ সালে মহাকরণ অভিযানে গুরুতর চোট পাওয়া অবস্থায় মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা ছবি প্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “দয়া করে দেখুন এই ছবিটি। কীভাবে আপনাদের দল আমাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করে। এটা নাটক নয়। এরকম ব্যবহার করবেন না। দুর্ব্যবহার করবেন না। আপনারা আমাকে অসম্মান করবেন না। আপনাদের প্রতিষ্ঠানের অপমান করবেন না। আমি খুবই খুশি। এটা এদের অভ্যাস। যেখানেই যাই এসব করে। আমি সকলের জন্য। আমি হিন্দু-মুসলিম-শিখ সকলের জন্য। আমি একতার পক্ষে। আপনারা নন। আপনারা আমার ভাইবোন। এখানে এই আচরণ করবেন না। এটা ঠিক নয়। এখানে রাজনীতি করবেন না। আপনাদের কূট উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। তা সত্ত্বেও আপনাদের জন্য আমার শুভকামনা রইল। দয়া করে ভালো করে ঘুমোন। আমি সত্যিই খুব খুশি। আমি চেষ্টা করব প্রতি বছর দু’বার এখানে আসার। আপনাদের বিরোধিতা আমাকে উৎসাহিত করে। দিদি কাউকে পরোয়া করে না। দিদি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। তাই আপনারা সংযত হোন।” অনুষ্ঠানে চাঞ্চল্যে উদ্বিগ্ন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

‘জোকারিগিরি!’ অক্সফোর্ডে আরজিকর চাপে মমতা। মুখ খুললেন নির্যাতিতার মা-বাবা। নিস্তার নেই! অক্সফোর্ডে আরজি কর প্রশ্নের মুখে মমতা। নির্যাতিতার বাবা মা সরব। আরজিকরে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছিল এক তরুণী চিকিৎসককে। গোটা বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। অক্সফোর্ডে সেই ক্ষোভের আঁচে খোদ বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। সারা পৃথিবী জুড়ে প্রতিবাদ। সারা দেশজুড়ে চলছে। একটা কথা ওনাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, যতদিন না বিচার দেবেন ততদিন ওনার নিস্তার নেই। এই মৃত্যুর ঘটনা ওনাকে তাড়া করবে। তিনি যেখানে যাবেন সেখানেই…আমরা লড়াইটা করছি। আমরা যে লড়াইটা করছি সেটা জায়গা মতো পৌঁছে দিতে পারলে আরও প্রশ্নের উত্তর তাঁকে দিতে হবে। এই যে ওনাদের জোকারগিরি যে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্য়ায় শুনানির দিন কোর্টের মধ্যে বলেছেন, এগুলো বলা বন্ধ করতে হবে। মুখে বলছেন বিচার চাই, ১৫ দিনের মধ্যে সিবিআই বিচার করে দিন। জজ সাহেব কি ফের তদন্তের নির্দেশ দিতে পারেন যেখানে ট্রায়াল শেষ হয়ে গিয়েছে। এসমস্ত কথা চলবে না। মানুষ সব বুঝে গিয়েছে। বাঙালিরা বিক্ষোভ করেছেন। যাঁদের উনি বলেছিলেন দেশে পড়াশোনা করে বিদেশে গিয়ে দেশের বদনাম করছে, তারা সুযোগ পেয়েছেন দিয়ে দিয়েছেন। সারা দেশ জুড়ে, সারা পৃথিবীর লোক আমাদের সঙ্গে আছেন। অনেকে ভিডিয়ো কল করেন। ১৩৬টি দেশের প্রতিনিধি আমাদের সঙ্গে মিটিং করেছেন। সেখানে আমাদের বক্তব্য সকলে শোনেন। কীভাবে বড় হয়েছিল তা জানতে চান। ব্যান্ডেজের ছবি দেখানো প্রসঙ্গে নির্যাতিতার বাবা বলেন, উনি আগেই জানতেন সমস্যায় পড়ব সেকারণে ওটা ব্যবস্থা করে নিয়ে গিয়েছিলেন। জোকারগিরি করে মানুষকে আর ভুল বোঝানো যাবে না। নির্যাতিতার মা বলেন, ‘আমি সারা বিশ্বের মানুষের কাছে কৃতজ্ঞ। মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী যে অন্যায় করেছেন আমার মেয়ের যে মৃত্যু ঘটেছে তাঁরই হেফাজতে কারণ আমার মেয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানে ছিলেন, কাজের জায়গায় ছিলেন, এটা বিশ্বের কেউ মেনে নিতে পারেননি। এর উত্তর তাঁকে দিতেই হবে। যেখানে যাবেন সেখানেই প্রতিবাদের মুখে পড়তে হবে। বাংলা তাঁর নিজের মেয়ের বিচার চায় বিশ্ব তাঁর মেয়ের বিচার চায়। আমার মেয়ে বিশ্বের মেয়ে হয়ে গেছে। সে মারা গেছে। কিন্তু সে আজ বিশ্বের মেয়ে হয়ে গেছে। গোটা বিশ্ব তার মেয়ের বিচার চায়।’

বাসে চড়লেন মমতা। নির্ধারিত সময়ের আগেই অক্সফোর্ডে পৌঁছলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিশ্রাম র্যানডল্ফ হোটেলে। হোটেলে মুখ্যমন্ত্রীকে হলুদ ফুলের তোড়া দিয়ে অভ্যর্থনা জানান অক্সফোর্ডের গবেষক। গ্র্যান্ড পিয়ানোটি ১৮৮৭ সালের। হেরিটেজ পিয়ানো। হোটেলে মুখ্যমন্ত্রীকে হলুদ ফুলের তোড়ায় অভ্যর্থনা জানান অক্সফোর্ডের গবেষক এবং গত লোকসভা ভোটে মালদহ দক্ষিণের তৃণমূল প্রার্থী শাহনাওয়াজ আলি রায়হান। লবিতে গ্র্যান্ড পিয়ানো দেখতে পেয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা ভারতীয় গবেষককে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এটা বাজাতে পারি?’ গ্র্যান্ড পিয়ানো হেরিটেজ। সম্মতি না জানিয়ে উপায় নেই। মুখ্যমন্ত্রীর আঙুলের স্পর্শে বেজে উঠল ‘উই শ্যাল ওভারকাম’, ‘পুরানো সেই দিনের কথা’, ‘প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে’ গানের সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে দেখে ঐতিহাসিক বিষয় জানলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ সবটা ঘুরিয়ে দেখান। শেল্ডনিয়ান থিয়েটার, বডলিয়ান লাইব্রেরির মতো কয়েক শতাব্দী প্রাচীন ভবনও দেখেন। ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ায় এই গ্রন্থাগার তৈরি করেছিলেন ইংরেজ কূটনীতিক থমাস ব়ডলে। যে গ্রন্থাগারে এখন বইয়ের সংখ্যা এক কোটি ৩০ লক্ষ। ব্রিটিশ লাইব্রেরির পরে এটিই বিলেতের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রন্থাগার। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে নানা দ্রষ্টব্য স্থান ঘুরে দেখেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। হ্যারি পটারের শুটিং হলে মুখ্যমন্ত্রী। গ্রন্থাগারের সামনেই ডিভাইনিটি স্কুল। প্রকাণ্ড হলে হ্যারি পটারের তিনটি ছবির শুটিং হয়েছিল। ছাদে সুপ্রাচীন গথিক ভাস্কর্য। অক্সফোর্ড ক্যাম্পাসের কেট স্ট্রিটে মার্টিন স্কুল। বহুতলের গায়ে খোদাই করে লেখা ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট’। এখানেই একটা সময় পড়ানো হত আইসিএস ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস। স্বাধীনতার পরে অবশ্য ভারতে আইসিএস বদলে আইপিএস এবং আইএএস হয়েছে।

অক্সফোর্ডে মমতার সঙ্গী সৌরভ। বিলেতের ‘ইউনিভার্সিটি টাউনে’ মমতা হেঁটে যান কেবল কলেজের পাশ দিয়ে। এই কলেজে পড়তেন প্রাক্তন পাক প্রধানমন্ত্রী তথা প্রাক্তন ক্রিকেটার ইমরান খান। ঐতিহ্যশালী অক্সফোর্ড ক্রিকেট মাঠের পাশ দিয়েও হাঁটলেন মমতা। যে মাঠে খেলতেন ইমরান, মনসুর আলি খান পটৌডিরা। ইমরান এবং টাইগার পটৌডি দু’জনেই ‘অক্সফোর্ড ব্লু’। অক্সফোর্ডের উল্লেখযোগ্য ছাত্রদের তালিকায় প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন ও ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। অস্কার ওয়াইল্ড ও জাপানের বর্তমান সম্রাট নারুহিতোও। অক্সফোর্ড স্ট্রিটে হন্টন শেষে কেলগ কলেজে মমতা। সঙ্গে সৌরভ। সেখানেই আমন্ত্রিত বক্তা বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারত বিষয়ক ফ্যাকাল্টির ২৫ জন পড়ুয়া এবং গবেষকের সঙ্গে একান্ত বৈঠক বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামো দেখার সময়ে কয়েকজন পড়ুয়া একটু দূরে লুকিয়ে বলছেন, ‘দিস ইজ মমতা ব্যানার্জি। দ্য আয়রণ লেডি চিফ মিনিস্টার অফ ওয়েস্ট বেঙ্গল।’

বক্তা মমতা ব্যানার্জ্জীর গোটা বিশ্ব তাকিয়ে। লন্ডনে বিশ্বমঞ্চে বক্তব্য শুনতে দেশ ভারতবর্ষ এবং রাজ্য বাংলার আপামর জনগণ তাকিয়ে। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আমন্ত্রিত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কেলগ কলেজে। শিল্পী এবং লেখক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সঙ্গে নিয়ে গিয়েছেন নিজের আঁকা ছবি এবং নিজের লেখা বই। উপহার দেবেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আজ বক্তৃতার জন্য আলাদা করে পড়াশোনা করিনি। জীবনের পথচলা থেকেই তৈরি আমি।’অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে রওনা হওয়ার পথেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘আমি বক্তৃতা করতে পারি না। আমি রান্না, ছবি, গান ভালবাসি। মানুষের সমস্যা নিয়ে কথা বলতে পারি। মানুষকে ভালবাসি। সবার কাছ থেকে যা শিখেছি তাই তুলে ধরব।’
