পশ্চিমবঙ্গ থেকে চতুর্থ ব্যক্তি রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব নিতে চলেছেন। কংগ্রেস জমানায় সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় গিয়েছিলেন পাঞ্জাবের রাজ্যপাল হয়ে। অটলবিহারী বাজপেয়ীর জমানায় রাজ্য বিজেপির আর এক প্রাক্তন সভাপতি বিষ্ণুকান্ত শাস্ত্রীকে উত্তরপ্রদেশের রাজ্যপাল করা হয়। নরেন্দ্র মোদীর আমলে প্রথমে ত্রিপুরা এবং পরে মেঘালয়ের রাজ্যপাল করা হয়েছিল তথাগত রায়কে। এককালে বঙ্গ বিজেপির সভাপতি ছিলেন। এ বার বঙ্গ বিজেপির আর এক প্রাক্তন সভাপতি রাজ্যপাল হচ্ছেন। অসীম ঘোষের নামই রাজ্যপাল হিসেবে ঘোষিত হল। হরিয়ানার রাজ্যপাল হিসাবে তাঁর নাম সোমবার ঘোষণা করল রাষ্ট্রপতি ভবন। রাজ্য বিজেপির শেষ নির্বাচিত সভাপতি অসীম শীঘ্রই চণ্ডীগড় পৌঁছে দায়িত্বভার বুঝে নেবেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক অসীম উত্তর কলকাতার শ্রীশচন্দ্র কলেজে পড়াতেন। বিজেপি সূত্রের দাবি, ১৯৯১ সালে প্রভাকর তিওয়ারির হাত ধরে তাঁর বিজেপিতে যোগদান। সে বছরই কাশীপুর বিধানসভা আসনে তিনি বিজেপির প্রার্থী হন। জিততে পারেননি। কিন্তু সেই থেকে সক্রিয় রাজনীতি শুরু। সুবক্তা হওয়ায় সাংগঠনিক কাঠামোতেও তরতর করে উন্নতি করেন। ১৯৯৬ সালে তিনি বিজেপির অন্যতম রাজ্য সম্পাদক হন। ১৯৯৮ সালে তাঁকে সহ-সভাপতি করা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হওয়ার পরে ‘এক ব্যক্তি, এক পদ’ নীতির কারণে ১৯৯৯ সালে রাজ্য বিজেপির সভাপতি পদ ছাড়তে হয় তপন শিকদারকে। সে সময়ে প্রথমে সাংগঠনিক নির্বাচন ছাড়াই সভাপতি হিসেবে নিয়োগ করা হয় অসীমকে। ২০০০ সালে সাংগঠনিক নির্বাচনে প্রবীণ বিজেপি নেতা সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়কে ৩৪ ভোটে হারিয়ে অসীম সভাপতি নির্বাচিত হন। অসীম বনাম সুকুমার লড়াই ঘিরে সে সময়ে আড়াআড়ি বিভাজন তৈরি হয়েছিল রাজ্য বিজেপিতে। দলের বর্তমান রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, রাহুল সিংহ, কর্নেল সব্যসাচী বাগচী, পরশ দত্তের মতো প্রভাবশালী নেতারা সে সময়ে সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে ছিলেন। অন্য দিকে অসীম ছিলেন তপন শিকদার সমর্থিত প্রার্থী। আরএসএসের সমর্থনে অসীম জয়ী হন। সাংগঠনিক নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরে শমীক, রাহুল, সুকুমার, সব্যসাচী, পরশদের প্রত্যেককে অসীম নিজের কমিটি থেকে সরিয়ে দেন। ২০০২ সাল পর্যন্ত অসীম দলের রাজ্য সভাপতি পদে ছিলেন। মেয়াদ শেষ হতেই রাজ্য বিজেপিতে আবার রাহুল-শমীকদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁদের পছন্দের তথাগত রায় সভাপতি পদে বসেন। অসীম ঘোষকে পরে কিছু সময়ের জন্য জাতীয় স্তরের কমিটিতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণের কারণে ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে অসীমের যোগ কমতে থাকে। দলীয় বৃত্ত থেকে একটা সময়ে প্রায় পুরোপুরিই হারিয়ে গিয়েছিলেন হাওড়া নিবাসী প্রাক্তন অধ্যাপক। রাহুলের সভাপতিত্ব কালে আবার দলের বৃত্তে অসীমের যাতায়াত শুরু। সম্প্রতি দলের নানা কর্মসূচিতে অসীমের সেই যাতায়াত আরও বেড়েছিল। নতুন রাজ্য সভাপতির মনোনয়ন পর্ব, নাম ঘোষণা এবং অভিনন্দন পর্বে অসীমকে সামনের সারিতে দেখা যাচ্ছিল। হরিয়ানার রাজ্যপাল হলেন হাওড়ার ছেলে! প্রাক্তন কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রী পি অশোক গজপতিকে গোয়ার রাজ্যপাল হিসেবে নিযুক্ত করা হল। সেইসঙ্গে সোমবার রাষ্ট্রপতি ভবনের তরফে বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানানো হয়েছে, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল লাদাখের লেফটেন্যান্ট গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করা হল জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন উপ-মুখ্যমন্ত্রী কাবিন্দর গুপ্তাকে। আর হরিয়ানার রাজ্যপাল হচ্ছেন অধ্যাপক অসীমকুমার ঘোষ। হরিয়ানার রাজ্যপালের পদে বসতে চলা অসীম পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির অন্যতম পুরনো নেতা ছিলেন। যে সময় পশ্চিমবঙ্গে মূলত বামেদের দাপট ছিল এবং বিজেপির কার্যত কোনও প্রভাব ছিল না, সেইসময় পদ্মশিবিরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সূত্রের খবর, ১৯৯১ সালে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। বঙ্গ বিজেপির যে রাজ্য বুদ্ধিজীবী সেল ছিল, তার সদস্যও ছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক। ১৯৯৬ সালে বঙ্গ বিজেপির রাজ্য সম্পাদক হয়েছিলেন অসীম। দু’বছর পরেই রাজ্যের সহ-সভাপতির পদ পেয়েছিলেন। আর পরের বছরই তাঁকে রাজ্য সভাপতি করেছিল বিজেপি। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত বঙ্গ বিজেপির রাজ্য সভাপতি ছিলেন। তাঁর পরে সেই পদে বসেছিলেন তথাগত রায়। শুধু তাই নয়, ত্রিপুরাতেও কাজ করেছিলেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, বঙ্গ বিজেপির প্রাক্তন সভাপতিকে হরিয়ানার রাজ্যপাল করে জোড়া বার্তা দিল নরেন্দ্র মোদী সরকার। প্রথমত, বিজেপি বাংলা বা বাঙালির বিরোধী নয়। যে বিষয়টি নিয়ে ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ভুগতে হয়েছিল বিজেপিকে। দ্বিতীয়ত, এই সিদ্ধান্তের ফলে বিজেপির পুরনো নেতা-কর্মীদের কাছে বার্তা যাবে যে এভাবেই তাঁদের পুরস্কার দেবে পদ্মশিবির। দুটি বিষয়ই আগামী বছরের বিধানসভা নির্বাচনের আগে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১ সালে বিজেপিকে বাংলা-বিরোধী এবং বহিরাগত তকমা লাগিয়ে প্রচার করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। অন্যদিকে ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে পুরনো এবং বসে যাওয়া কর্মীদের মনোবলও চাঙ্গা হয়ে যাবে। দিনকয়েক আগেই পুরনো নেতা দিলীপ ঘোষের গুরুত্ব বাড়ানো হয়েছে। এবার আরও এক পুরনো নেতাকে বড় পুরস্কার দেওয়া হল। সোমবার আনুষ্ঠানিক ভাবে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর তরফ থেকে সে কথা ঘোষণাও করে দেওয়া হল। হরিয়ানার রাজ্যপাল হিসেবে অসীমের নাম ঘোষণার পাশাপাশি গোয়ার রাজ্যপাল হিসেবে পিএ গজপতি রাজুর নামও ঘোষণা করা হয়েছে। কেন্দ্রশাসিত লাদাখের উপরাজ্যপাল হিসেবে ঘোষিত হয়েছে কবীন্দ্র গুপ্তের নাম।

১৮ জুলাই দুর্গাপুরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সভায় আমন্ত্রণ একসময়ের দাপুটে বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষকে। দুর্গাপুরের সভাতে দিলীপের থাকার আভাস আগেই দিয়েছিলেন রাজ্য বিজেপির নয়া সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। দিলীপের কাছে পৌঁছে গেল আমন্ত্রণপত্র। অর্থাৎ বঙ্গ বিজেপিতে শমীক যুগ শুরু হতেই দিলীপের সঙ্গে পদ্ম শিবিরের দূরত্ব কমছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। ১৭ তারিখ রাতেই দুর্গাপুরে পৌঁছে যাবেন দিলীপ। দিঘায় জগন্নাথ মন্দিরের উদ্বোধনে রাজ্য সরকারের আমন্ত্রণে সস্ত্রীক পৌঁছে গিয়েছিলেন বঙ্গ বিজেপির এই দাপুটে নেতা। সৌজন্যতা রক্ষা করতে গিয়ে রাজ্য নেতৃত্বের অনেকের চক্ষুশূলও হয়েছিলেন তিনি। এরই মধ্যে একের পর এক সভা-সমিতিতে দিলীপের অনুপস্থিতিতে মনে করা হচ্ছিল বিজেপির সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে বঙ্গ বিজেপির প্রাক্তন সভাপতির। তৃণমূলে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও কানাঘুঁসো। দিলীপ জল্পনা উসকে দিয়ে ‘জলও নেই, পোনাও নেই’ বলে বঙ্গ রাজনীতিতে ‘জল্পনা’র নয়া সংজ্ঞা দিয়েছিলেন।
পদ্ম শিবিরে সাংগঠনিক রদবদল হয়। সভাপতি পদে আসেন শমীক। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় গড়হাজির ছিলেন প্রাক্তন বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ। সংবর্ধনা সভাতেও ডাক পাননি। দিলীপের মুখে শমীকের প্রশংসা শোনা গিয়েছিল। তারপরেই বর্তমান সভাপতির সঙ্গে দেখা করতে সল্টলেকের অফিসে যান দিলীপ। সেই সাক্ষাতের পরই সস্ত্রীক দিলীপের দিল্লি সফর। ফের স্বমহিমায় একসময়ের দাবাং পদ্ম নেতা। দুর্গাপুরে মোদির সভায় দিলীপকে ডাক। দলের নির্দেশে শেষ মুহূর্তে ২০২৪-এর লোকসভায় বর্ধমান-দুর্গাপুর আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন দিলীপ। যদিও সে সময় তাঁকে পরাজয় শিকার করতে হয়। সেই দুর্গাপুরেই ‘২৬-এর বিধানসভা ভোটের আগে দিলীপের ডাক পাওয়া। এই সভার পর রাজনীতির ময়দানে দিলীপ ফের আগের ছন্দেই?

এদিকে শুভেন্দুর ‘কেউ কাশ্মীর যাবেন না, আগে নিজের প্রাণ বাঁচান’। আচমকা মন্তব্যে ‘অস্বস্তি’। বিজেপির ‘কৌশলী’ অবস্থান। কৌশল হিসাবে সামনে আসছে ‘বেঙ্গল লাইন’। শুভেন্দু অধিকারীর কাশ্মীর-মন্তব্যকে সমর্থন। কেন্দ্রীয় সরকারের ‘সব কা সাথ, সব কা বিকাশ’ নীতি। পশ্চিমবঙ্গের ‘সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষিত’ মাথায় রেখে শুভেন্দুর মন্তব্যের দায় এড়ানোর চেষ্টাও করছে না। দুই মেরুর মাঝে সেতু ‘বেঙ্গল লাইন’। পহেলগাঁও হামলার ভয়াবহতা ভুলে পর্যটকদের আবার কাশ্মীর যাওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে আচমকা তৈরি বিতর্ক। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, রাজ্য নেতৃত্ব, পরিষদীয় দলে বাংলার পরিস্থিতির দোহাই। বিজেপি দলে মতৈক্য রয়েছে। পহেলগাঁওয়ে সন্ত্রাসবাদী হামলার পরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, জম্মু-কাশ্মীরের অগ্রগতিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে পাকিস্তান ওই হামলা করিয়েছিল। পাকিস্তানের সেই উদ্দেশ্য সফল হতে না দেওয়ার আহ্বানও মোদীর মুখে একাধিক বার শোনা গিয়েছে। তাঁর ‘সব কা সাথ, সব কা বিকাশ, সব কা বিশ্বাস’ নীতি থেকে কাশ্মীর বাদ পড়েনি। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দুর সাম্প্রতিক মন্তব্য সে নীতি থেকে দূরে। জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠকের পরে আর্জি জানান, বাংলা থেকে পর্যটকেরা আবার যেন কাশ্মীর যান। তার প্রেক্ষিতেই শুভেন্দুর আহ্বান ছিল, কেউ কাশ্মীর যাবেন না, আগে নিজের প্রাণ বাঁচান। শুভেন্দুর ওই মন্তব্যে রাজ্য রাজনীতিতে আলোড়ন। তৃণমূল শুভেন্দুর মন্তব্যের নিন্দা করে। বঙ্গের বিরোধী দলনেতা কেন্দ্রীয় সরকারের ঘোষিত নীতির বিরোধিতা করছেন কি না, সে প্রশ্নও তোলা হয়। রাজ্য বিজেপির নতুন সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের অবস্থানও জানতে চায় তৃণমূল। বিজেপি প্রথমে ওই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দেয়নি। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তরফে যাঁরা বাংলার দায়িত্বে, তাঁরা নীরব ছিলেন। রাজ্য নেতারাও জবাব এড়াচ্ছিলেন। দিলীপ ঘোষ বলেছিলেন, ‘‘কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কী অবস্থান নেয় দেখুন।’’ রাজ্য সভাপতি শমীক বিরোধী দলনেতার মন্তব্যের প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘’শুভেন্দু অধিকারী নিজেই বলেছেন, এটা তাঁর ব্যক্তিগত মত। বিরোধী দলনেতা হিসাবে শুভেন্দুবাবুকে রাজ্যের নানা প্রান্তে ঘুরতে হয়, সাধারণ মানুষের মধ্যে যেতে হয়। তাঁদের আবেগ, অনুভূতি এবং মানসিকতার প্রতিফলন বিরোধী দলনেতার কণ্ঠস্বরে উঠে আসে।’’ রাজ্যের এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে শুভেন্দু অধিকারী ঠিকই বলেছেন। দল এ বিষয়ে একমত। পহেলগাঁও হামলায় পশ্চিমবঙ্গের কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা-ও ভাবতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের ক’জন বাসিন্দাকে ধর্ম জিজ্ঞাসা করে খুন করা হয়েছে, তা ভুলে গেলে চলবে না। বাংলাদেশে কী হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ দেখছেন। পশ্চিমবঙ্গে কাশ্মীরের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ খুব স্বাভাবিক। কাশ্মীরের পরিস্থিতি পশ্চিমবঙ্গের মানুষের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কাশ্মীরের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থাকাও স্বাভাবিক। আলোচনাটা ইতিবাচক।




