কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে শুক্রবারের ‘তেরঙা ওড়াও’ কর্মসূচির আগে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র উপর চাপ বাড়াল দিল্লি পুলিশ। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক পরিচালিত দিল্লি পুলিশের তরফে ককরোচ-কর্মসূচির জন্য অনুমতি দেওয়া হয়নি জানিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারা (চার বা তার বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ) জারি হয়েছে দিল্লির বিভিন্ন এলাকায়। সেই সঙ্গে আগামী দু’দিনের জন্য সেন্ট্রাল পার্ক বন্ধ করার কথা ঘোষণা করেছে ‘নিউ দিল্লি মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিল’। দিল্লি পুলিশের হুঁশিয়ারিতে না দমে ককরোচ-প্রতিষ্ঠাতা অভিজীত দিপকে এবং বাম ছাত্র সংগঠন আইসার নেত্রী নেহা বোরা বৃহস্পতিবার সাংবাদিক বৈঠকে জানিয়ে দিয়েছেন ‘তেরঙা ওড়াও’ (যার পোশাকি নাম, ‘লেহরা দো তেরঙ্গা’) কর্মসূচি পালনে তাঁরা বদ্ধপরিকর। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে শুক্রবারের কর্মসূচির আগে কংগ্রেস-সহ বিরোধী দলগুলিকে পাশে থাকার আবেদন জানিয়েছেন দিপকে। তাঁর কথায়, ‘‘রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে সব রাজনৈতিক দল, যুবসমাজের ঐক্যবদ্ধ হয়ে শুক্রবার ‘তেরঙা ওড়াও’ কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া উচিত। মুম্বই পুলিশ বলিউড তারকা আমির খানের ভাগ্নে তথা জনপ্রিয় অভিনেতা ইমরান খানকে ভারত ছাড়ার নোটিস পাঠিয়েছে। আর সেই নোটিসকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে পাল্টা বম্বে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন ইমরান। ভারতীয় নাগরিক না হয়েও ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভে যোগ দেওয়ায় অভিবাসন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় ইমরানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মুম্বই পুলিশ। সমাজমাধ্যমে দিপকে জানিয়েছেন, দিল্লিতে তাঁর আবাসন চারি দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে সাদা পোশাকের পুলিশবাহিনী। তিনি লিখেছেন, ‘‘আমার উপর ওরা সব সময় নজরদারি করছে। একটি সাদা স্করপিও সবসময় আমাকে অনুসরণ করছে।’’ কনট প্লেস লাগোয়া পালিকা বাজারের পোশাক ব্যবসায়ী অনিলকুমার গুপ্ত নবরাত্রি এবং দশেরা উৎসবের মরসুমে ব্যবসা বিঘ্নিত হওয়া এবং জীবিকার ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করে ‘তেরঙা ওড়াও’ বাতিলের দাবিতে দিল্লি হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার সেই আবেদনের শুনানির সময় দিল্লি পুলিশের তরফে ‘তেরঙা ওড়াও’ কর্মসূচির বিরুদ্ধে নির্দেশ জারির আর্জি জানানো হলেও তা পত্রপাঠ খারিজ করে দেয় দিল্লি হাই কোর্ট। পুলিশের বক্তব্য নথিভুক্ত করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিতিন ওয়াসুদেও সাম্ব্রে এবং বিচারপতি সঞ্জয় শর্মার বেঞ্চ জানিয়েছে, আবেদনের পরবর্তী শুনানি হবে ৩ নভেম্বর। অন্য দিকে, দিল্লি পুলিশের তরফে আবেদনের শুনানির সময় ‘আশ্বাস’ দেওয়া হয়, শুক্রবারের ককরোচ-কর্মসূচির আগে সম্ভাব্য সমস্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কনট প্লেসের মতো একটি অত্যন্ত ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় এই ধরনের অননুমোদিত জমায়েতের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়ে দিল্লি পুলিশের বার্তা— ‘১৬৩ ধারা অমান্য করে জমায়েত হলে কড়া পদক্ষেপ করা হবে’। যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ নিষিদ্ধ হওয়ার পরেও সেখানে ঢুকে জাতীয় পতাকা ওড়ানো এবং শান্তিভঙ্গের অভিযোগে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কাকে মঙ্গলবার গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। বুধবার তাঁদের পাঁচ দিনের জেল হেফাজতে পাঠানো হয়। আপাতত দু’জনই রয়েছেন তিহাড়ে। এই গ্রেফতারির বিরুদ্ধে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গাঁধী-সহ একাধিক বিরোধী নেতৃত্ব সরব হয়েছেন। পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। জাতীয় পতাকা ওড়ানো অপরাধ নয়— প্রমাণ করতে সিজেপি প্রধান দিপকে শুক্রবার ফের পথে নামার ডাক দিয়েছেন। কনট প্লেসের সামনে সেন্ট্রাল পার্কে ‘তেরঙা ওড়াও’ অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা তাঁর। ‘ভোটচুরি’, ‘বেআইনি ও স্বেচ্ছাচারী কার্যকলাপ’ এবং এসআইআর-অনিয়মে অভিযুক্ত জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে এত দিন সিজেপি এবং কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের প্রতিবাদ আন্দোলন সমান্তরালে চলছিল। বরং ককরোচদের সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখছিলেন রাহুলেরা। বুধবারের পর তা ঘুচতে শুরু করেছে, মত অনেকের। বস্তুত, রাহুল বুধবার তাঁর বাড়িতে চা চক্রে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ককরোচ নেতৃত্বকেও। সিজেপির শনিবারের কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ ‘ইন্ডিয়া’র বেশ কয়েক জন নেতানেত্রীই আটক হয়েছিলেন। আটক করা হয়েছিল দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীবাল, ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার এবং কেরলমের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নকে। তবে শনিবারের ওই বিক্ষোভ থেকে কংগ্রেস কিছুটা দূরে ছিল। একাংশের মতে, দেশের তরুণ প্রজন্ম সিজেপিকে সমর্থন করলে কংগ্রেসের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে কি না, তা নিয়ে শীর্ষ নেতৃত্ব সংশয়ে ছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাঁরা উপলব্ধি করেছেন, জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে জোরদার করতে হলে সিজেপির হাত আরও শক্ত করা ছাড়া উপায় নেই।
এই পরিস্থিতিতে বুধবার রাহুলের মন্তব্যেও তার ইঙ্গিত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘ব্যানার ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু লক্ষ্য একটাই। সব প্রতিবাদই আসলে এক দাবিতে— নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া।’’ বুধবার বিকেলে রাহুল তাঁর ৫, সুনেহরি বাগ রোডের সরকারি বাসভবনে আয়োজিত চা চক্রে দিপকেকে আমন্ত্রণও জানিয়েছিলেন। কিন্তু মহারাষ্ট্রে থাকায় যোগ দিতে পারেননি ককরোচ প্রধান। এর পর বৃহস্পতিবার রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে সব বিরোধী দলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বার্তা দিয়েছেন দিপকে। ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আর্জি জানিয়েছেন ছাত্র ও যুবসমাজের কাছেও। সিজেপি নেতা দিপকে এবং ‘অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্ট্স অ্যাসোসিয়েশন’ (আইসা)-এর সভানেত্রী নেহা বোরার যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে বিশৃঙ্খলা, চিৎকার-চেঁচামেচি দেখা গেল বৃহস্পতিবার। তাঁদের দেখে উঠল ‘দূর হটো’ স্লোগানও। সেই ঘটনার একটি ভিডিয়ো ইতিমধ্যে প্রকাশ্যে এসেছে। কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দিল্লির ‘প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়া’তে ওই সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। বক্তা ছিলেন, আইসার সভানেত্রী নেহা এবং সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা দিপকে। সে সময় হঠাৎই বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ব্যক্তিদের একাংশকে বলতে শোনা যায়, ‘‘বন্ধ করো তোমাদের সম্মেলন। দূর হটো।’’ নেহার চোখে-মুখে বিরক্তি ফুটে ওঠে। আসন ছেড়ে উঠে যান তিনি এবং দিপকে। এর মধ্যেই নেহা আয়োজকদের অনুরোধ করেন যেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বাইরে বার করে দেওয়া হয়। তার পরেও চিৎকার-চেঁচামেচি চলতে থাকে। সেই ভিডিয়োই প্রকাশ্যে এসেছে। ঘটনাচক্রে শুক্রবার দিল্লিতে সিজেপির পূর্বনির্ধারিত প্রতিবাদের ঠিক আগের দিনই এই ঘটনাটি ঘটল। ভিডিয়োটি সমাজমাধ্যমে পোস্ট করা হয়েছে সংবাদসংস্থা পিটিআইয়ের এক্স হ্যান্ডল থেকে। ইতিমধ্যেই বহু মানুষ দেখেছেন সেই ভিডিয়ো। মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নেটাগরিকেরা। উল্লেখ্য, শুক্রবার দিল্লিতে নতুন বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে দিপকে। ‘লেহরা দো তিরঙ্গা’ বা ‘তেরঙা ওড়াও’ অভিযানে দেশের জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে তরুণ প্রজন্মকে শামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষ এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির কর্মী-সমর্থকদেরও উদ্দেশেও বার্তা দিয়েছেন।




