Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

ডাকের সাজের নেপথ্যে অন্য গল্প? ‘ডাক’ কি সত্যিই ডাক বিভাগ! নাকি সেই শিল্প?

RK NEWZ কৃষ্ণনগরের শিল্পীরা শোলা আর রাংতা দিয়ে ডাকের সাজের গয়না তৈরি করেছিলেন কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর জন্য। কিন্তু সে সাজের রাংতা কি সত্যিই ডাক মারফত জার্মানি থেকে এ দেশে এসেছিল? ‘ডাক’। শব্দটা আচমকা শুনলে মনে হয় কাউকে ডাকাডাকি করতে বলা হচ্ছে! অথচ বাংলা ভাষায় ‘ডাক’ শব্দের অর্থ বহু। কথ্যভাষায় তার বিবিধ প্রয়োগ রয়েছে। একটি যেমন মোটামুটি সবাই জানেন— চিঠি। যিনি চিঠি বয়ে নিয়ে যান, তিনি ‘ডাক হরকরা’, চিঠি পৌঁছে দেওয়ার পোস্ট অফিস ‘ডাকঘর’ ইত্যাদি। আবার ‘ডাক’ শব্দটি আকছার ব্যবহার হয় খ্যাতি-প্রতিপত্তি বোঝাতেও। কোনও বিখ্যাত মানুষ প্রসঙ্গে হয়তো বলা হয়, অমুকের খুব ‘নামডাক’ বা তমুককে এলাকায় সবাই ‘একডাকে’ চেনে। এ যুগীয় বাংলায় খুব ব্যবহার না হলেও এককালে হোমরাচোমরা প্রতিপত্তিবান মানুষকে বলা হত ‘ডাকসাইটে’। অবশ্য ডাকসাইটে জমিদার যেমন হতেন, তেমনি ডাকসাইটে সুন্দরীও হতেন। উচ্চগ্রামের চিৎকারকে বলা হয় ‘হাঁকডাক’। এ ছাড়া প্রাচীন বাংলায় আরও একটি শব্দের ব্যবহার ছিল— ‘ডাকসিদ্ধ’। লৌকিক বিশ্বাস অনুসারে, ‘ডাক’ শিবের এক শ্রেণির অনুচরের নাম, যাঁদের স্ত্রীলিঙ্গ ডাকিনী। ডাকসিদ্ধ তাঁদেরই বলা হত বলে বিশ্বাস, যাঁরা ওই ডাকদের ডেকে আনতে পারতেন। কিন্তু এই এত রকমের ‘ডাক’-এর মধ্যে দুর্গা প্রতিমার ‘ডাকের সাজ’-এর ‘ডাক’ কোনটি? প্রশ্ন শুনে কেউ কেউ হালকা বক্রহাসি হেসে বলতে পারেন— “এর জবাব তো সোজা! পোস্টাল সার্ভিসে অর্থাৎ ডাকযোগে দুর্গাপ্রতিমার সাজ আসত বলেই দুর্গার সাজের নাম ডাকের সাজ।” কিন্তু সত্যিই কি বিষয়টি তা-ই? গণবিশ্বাস বা যাকে বলে লোকমুখে প্রচলিত ব্যাখ্যায় ওই বক্তব্যটি সবচেয়ে বেশি চালু হলেও এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে বিস্তর। রয়েছে ডাকের সাজ নিয়ে কিছু ভ্রান্ত ধারণাও। প্রথম ‘ভুল’টি হল শোলার সাজকে ডাকের সাজ বলা। বিষয়টি আদতে তা নয়। শোলা গাছের আঁশ দিয়ে কারুকাজ করার যে শিল্প বঙ্গদেশে চালু আছে, তার বয়স বহু প্রাচীন। পুজোপাঠে শোলার মালা অথবা চাঁদমালার ব্যবহার হয়ে আসছে বহুকাল ধরে। তা-ও কত বছর? তার একটি আনুমানিক হিসাব মেলে ‘বৃহদ্ধর্ম পুরাণ’-এ। শোলাশিল্পী সম্প্রদায়কে বলা হত মালাকার। ত্রয়োদশ শতকে লেখা ‘বৃহদ্ধর্ম পুরাণ’-এ সেই মালাকারদের উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ আজ থেকে ৮০০ বছর আগেও শোলার নকশা তৈরি করা হত। যার সঙ্গে ডাকের সাজের সরাসরি সম্পর্ক ছিল না কোনও। ডাকের সাজ আদতে ছিল শোলার সাজের উপর রুপোলি রাংতার নকশা দিয়ে তৈরি প্রতিমার সাজ। এই সাজ কবে প্রথম তৈরি হল? সেই হিসাবে আবার দ্বিতীয় ভুলের সূত্রপাত। প্রচলিত কিছু কাহিনিতে দাবি করা হয়, কলকাতার শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণদেবের আমলে রাজবাড়ির দুর্গাপ্রতিমার জন্য কৃষ্ণনগরের শিল্পীরা শোলা আর রাংতা দিয়ে ডাকের সাজের গয়না তৈরি করেছিলেন। যে রাংতা কি না ডাক মারফত জার্মানি থেকে এ দেশে আসত। যে কারণে সাজের নাম ‘ডাকের সাজ’ বলে বিশ্বাস। কিন্তু সেই হিসাবও যে মিলছে না! ইতিহাস বলছে ভারতে ডাক ব্যবস্থা শুরু হয়েছিল ১৭৬৬ সালে। আর কলকাতায় প্রথম জেনারেল পোস্ট অফিস স্থাপিত হয় ১৭৭৪ সালের ১৭ মার্চ। অর্থাৎ ডাকযোগে যদি দুর্গাপুজোর ডাকের সাজ এসে থাকে তবে তা হওয়ার কথা ১৭৭৪ সালের পর। কিন্তু রাজা নবকৃষ্ণের আমলে দুর্গাপুজো শুরু হয়েছিল ১৭৫৭ সালে। ফলে ডাকযোগে এ দেশে রাংতা আসার অনেক আগেই দেখা যাচ্ছে, রাংতার সাজ উঠেছিল প্রতিমার অঙ্গে। ডাকের সাজ যে দেশে ডাক ব্যবস্থা চালু হওয়ার আগেই শুরু হয়েছিল, তার আর একটি প্রমাণ রামপ্রসাদী শ্যামাসঙ্গীত— ‘মন তোমার এই ভ্রম গেল না…’। যেখানে ভক্ত রামপ্রসাদ কালী প্রসঙ্গে বলছেন, ‘‘জগৎকে সাজাচ্ছেন যে মা, দিয়ে কত রত্ন সোনা/ ওরে, কোন লাজে সাজাতে চাস তায়, দিয়ে ছার ডাকের গহনা’’। উল্লেখ্য, রামপ্রসাদের জন্ম আনুমানিক ১৭২০ সালের আশপাশে। মৃত্যু ১৭৭৫ সালে। হিসাব করলে তাঁর মৃত্যুর সামান্য আগে বঙ্গে ডাক ব্যবস্থা চালু হয়। রাংতা যদি জার্মানি থেকে এসেও থাকে তবে তা আনতে নিশ্চিত ভাবে ক’টা দিন বাড়তি সময় লাগার কথা। গান লেখার মতো জনপ্রিয় হওয়ার কথা নয়।

অর্থাৎ এটুকু স্পষ্ট যে, ‘ডাকের সাজ’-এর নাম ডাক ব্যবস্থার সূত্রে নয়। তবে দুর্গার ‘ডাকের সাজ’-এর ‘ডাক’ কে বা কী? এখানে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকার সুকুমার সেনের মত প্রাসঙ্গিক। তিনি তাঁর বইয়ে যা লিখেছেন, তা ব্যাখ্যা করলে বোঝা যায় এই ‘ডাক’-এর সঙ্গে প্রাচীন বঙ্গদেশের ‘ডাকসিদ্ধ’ শব্দবন্ধটির সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে। কারণ সুকুমারবাবু লিখেছেন, সে কালে ‘ডাক’ বলা হত এক শ্রেণির গুণীনদের। তাঁরা বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে তথাকথিত অলৌকিক সব কেরামতি দেখিয়ে বেড়াতেন। আর মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সাজতেন রাংতার সাজে। সেই রাংতা সজ্জিত ডাকেদের সাজ যখন প্রতিমার অঙ্গে উঠল, তখনই তার নাম হল ‘ডাকের সাজ’। বাংলার ইতিহাস চর্চাকারী সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় আবার এ প্রসঙ্গে আর একটি যুক্তি দিচ্ছেন, যা শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণের দুর্গার ডাকের সাজ এবং রামপ্রসাদের গানের সময়কালের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। সন্দীপবাবু বলছেন, ‘‘শোলার কাজ, শোলা দিয়ে তৈরি চাঁদমালা— এ সব বহু বছর ধরেই রয়েছে। তবে প্রতিমার গায়ে ডাকের সাজ সম্ভবত জনপ্রিয় হয় বাঙালিদের বারোয়ারি পুজোর সংস্কৃতি শুরুর পরে।’’ তাঁর ব্যাখ্যা, সে কালে দুর্গাপুজো করতেন মূলত ধনী জমিদারেরাই। আর প্রত্যেক পরিবারে দুর্গা প্রতিমার জন্য দামি গয়নাগাটিই বানানো থাকতো। কোন পরিবারে কত দামি গয়না পরানো হল, তা নিয়ে আলোচনাও হত। সেই সব গয়নার বদলে দুর্গা প্রতিমাকে শোলা আর রাংতা দিয়ে তৈরি গয়না পরানো হবে, তা ঠিক যুক্তিযুক্ত ঠেকে না। অন্য দিকে, বারোয়ারি পুজো শুরু হয় ১৭৬১ সালে। সাধারণ পরিবারের ১২টি বাড়ির উদ্যোগে হওয়া পুজোপাঠে প্রতিমাকে দামি গয়না পরানো সম্ভব না হতেই পারে। সেই সব গয়নার নিরাপত্তা নিয়েও ঝুঁকি থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রতিমার সাজ জমকালো করতে যদি শোলা বা রাংতার সাজের শরণ নেওয়া হয়ে থাকে, তবে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।ই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles