Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

অদম্য নেহা বোরা!‌ ছাত্র আন্দোলনের নতুন মুখ

RK NEWZ নেহা উত্তরাখণ্ডের ভূমিকন্যা। বাবা সেনাবাহিনীতে কর্মরত। সেই সুবাদে কয়েক বছর বাংলার বাসিন্দা ছিলেন নেহা। মাধ্যমিক, একাদশ শ্রেণি এবং উচ্চ মাধ্যমিকের পড়াশোনা সারেন শিলিগুড়িতে। তাঁর বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার রসদ এসেছে বাংলার মাটি থেকেই। কলকাতায় এসে স্বয়ং নেহাই জানিয়েছিলেন বাংলার মাটির সঙ্গে তাঁর কতটা গভীর যোগ। বাংলার মাটিতে না এলে হয়তো তিনি চারু মজুমদারের নাম জানতে পারতেন না। পাবলো নেরুদার কবিতা পড়তে শিখতেন না। অরুন্ধতী রায়কে হয়তো জানতে পারতেন না। নেহা স্বীকার করে নিয়েছিলেন বাংলার মাটিই তাঁকে প্রথম দক্ষিণপন্থার থেকে দূরত্ব তৈরি করতে শিখিয়েছিল। রাজনীতির মঞ্চে নেহার পা রাখা নাটকের হাত ধরে। তাঁর কথায়, নাটকই তাঁকে রাজনীতিকে নতুন ভাবে চিনতে শিখিয়েছে। রাজনীতি যে শুধু নির্বাচন, রাজনৈতিক দল কিংবা ক্ষমতার লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে, সেই উপলব্ধি তৈরি হয়েছিল সেখান থেকেই। শিক্ষার সুযোগ পাবেন কারা, কে কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হবেন, কার মর্যাদা সুরক্ষিত থাকবে, আর কে ক্ষমতাবানদের প্রশ্ন করার অধিকার পাবেন—এই প্রতিটি বিষয়ের মধ্যেই রাজনীতির প্রভাব রয়েছে বলে মনে করেন নেহা। নাটকের মঞ্চ থেকে পাওয়া এই উপলব্ধিই ধীরে ধীরে তাঁকে টেনে আনে ছাত্ররাজনীতি ও প্রতিবাদের জগতে। ভারতের এই ছাত্রনেত্রীর উত্থান কেবল সমাজমাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠার গল্প নয়। তাঁর আন্দোলন ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে প্রশাসনিক জবাবদিহি, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং সেই অধিকাররক্ষায় তরুণ প্রজন্মের প্রতিবাদী ভূমিকার প্রশ্ন। শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তরুণদের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভকে আন্দোলনের রূপ দেওয়ার মধ্য দিয়েই পরিচিতি পেয়েছেন নেহা। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট বামপন্থী আদর্শ, আর আন্দোলনের মঞ্চে উঠে আসে ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির প্রশ্ন। আদর্শগত অবস্থান ও প্রতিবাদী ভূমিকার এই সমন্বয়েই নেহা ক্রমশ ছাত্ররাজনীতির পরিচিত মুখ হয়ে উঠছেন। তাঁর উত্থান একই সঙ্গে ভারতের গণতান্ত্রিক পরিসরে তরুণদের যোগদান, অসন্তোষ এবং প্রতিবাদের গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনার অবকাশ তৈরি করছে। পশ্চিমবঙ্গের পালাবদল নিয়ে কার্যত হতাশ নেহা। তৃণমূলকে সরিয়ে প্রথম বার এ রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বামপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের মতোই তিনিও এই রায়ে হতাশ বলে জানিয়েছিলেন নেহা। তাঁর মতে, ত়ৃণমূলের জমানায় মানুষের মধ্যে যে রাজনৈতিক হতাশা তৈরি হয়েছিল, তার ফলশ্রুতি বিজেপির ক্ষমতাদখল। ২০২০ সালের দিল্লির ঘটনায় সহিংসতায় উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন বা ইউএপিএ-র অধীনে আটক ব্যক্তিদের মুক্তির দাবিতেও সরব হয়েছেন নেহা। একটি জাতীয় সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তিনি এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (এআইএসএ) উমর খালিদের মুক্তিকে সমর্থন করেন। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ)-বিরোধী আন্দোলনের সময় হিংসায় উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে ইউএপিএ-র অধীনে আটক শারজিল ইমামের মুক্তির পক্ষেও তিনি বক্তব্য পেশ করেন। এই অবস্থানের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক বন্দিদের অধিকার, বিচারপ্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রয়োগের সীমা নিয়ে চলা বিতর্কেও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন এই ছাত্রনেত্রী।

বয়স এখনও ত্রিশ পেরোয়নি। ছাত্র আন্দোলন করতে গিয়ে আটক হয়েছেন, গায়ে ছোড়া হয়েছে কালি, এসেছে প্রাণনাশের হুমকিও। রাষ্ট্রের শাসন দমাতে পারেনি তাঁকে। প্রতিটি বাধা পেরিয়ে বার বার প্রতিবাদের ময়দানে ফিরেছেন নেহা বোরা। সংঘাত, হুমকি আর বাধার মুখেও থামতে নারাজ অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বা আইসার সভানেত্রী। ছাত্র আন্দোলনের মুখ হিসেবে উঠে এসেছেন বামপন্থী সংগঠনের নেত্রী নেহা। কখনও সরাসরি কেন্দ্রকে চ্যালেঞ্জ, কখনও আবার ভোটাধিকাররক্ষার দাবিতে পুলিশের ব্যারিকেডে উঠে তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। কখনও আবার প্রকাশ্যে উমর খালিদের মুক্তির পক্ষে সমর্থন জানাচ্ছেন। ছাত্র আন্দোলনের পুরোভাগে থাকা নেহা চক্ষুশূল হয়েছেন দিল্লির শাসকের। দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ চেয়ে, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) বাতিলের দাবিতে যন্তর মন্তরে সিজেপির ডাকা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে শনিবার ১০ অক্টোবর ফের একবার দিল্লির পথে নামেন নেহা। প্রতিবাদ মিছিল বার করেন তিনি ও তাঁর সহযোগীরা। এদিকে, দিল্লিতে অবতরণের পরই বিমানে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কারা আটক হন দিল্লি পুলিশের হাতে। তার পর বিক্ষোভ আন্দোলেনের রাশ নিজের হাতে তুলে নেন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্ট্‌স অ্যাসোসিয়েশনের নেত্রী নেহা। বেলা ১টার পর মিছিল নিয়ে বেরোন তাঁরা। যন্তর মন্তরে কঠোর পুলিশি নিরাপত্তার কারণে বদলে ফেলা হয় বিক্ষোভস্থল। দিল্লি হাটে বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেন নেহারা। মিছিলের মাঝপথেই তাঁকে আটক করে পুলিশ। নেহাকে আটক করে পুলিশ একটি বাসে তুলে দেয়। সেই বাস ঘিরে ধরে বিক্ষোভ দেখান তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনকারীরা। নিট ইউজি প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারিতে সরকারের দায় স্বীকার এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে গোটা জুলাই মাস সক্রিয় ছিলেন নেহা ও তাঁর সহযোগীরা। যন্তর মন্তরে আরশোলাদের (ককরোচ জনতা পার্টি) আন্দোলনে গোড়া থেকে তিনি জুড়ে ছিলেন। করেছিলেন অনশনও। ২০২৬ সালে দিল্লির যন্তর মন্তরে নিট প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ঘিরে বিক্ষোভে যোগ দিয়েই জাতীয় স্তরে পরিচিতি পান তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনে মুখ নেহা। আন্দোলনে পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি ওঠে। পাশাপাশি, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতেও সরব হন আন্দোলনকারীরা। এই বিক্ষোভের উল্লেখযোগ্য অধ্যায় ছিল নেহার ২৩ দিনের অনশন। সমাজসৈনিক সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে রাজধানীতে এই দীর্ঘ অনশনে ছিলেন তিনি। টানা অনশনের জেরে একসময় তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতিও ঘটে। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই পরীক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে তাঁর প্রতিবাদ জাতীয় স্তরে আলোচনায় উঠে আসে। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) গবেষক নেহা। তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হন। অম্বেডকর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেছেন। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অফ আর্টস অ্যান্ড এস্থেটিক্সে পিএইচডি করছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles