RK NEWZ দলের ‘এক ব্যক্তি, এক পদ’ নীতির কারণে ইন্দ্রনীলকে যুব সভাপতি পদ থেকে সরাতে হলেও তাঁকেই কি এখনও প্রধান যুব-মুখ হিসাবে এ রাজ্যে সামনে রাখতে চায় বিজেপি? মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পরে এমন জল্পনা তৈরি হয়েছে। রামায়ণে ইন্দ্রজিৎ যুদ্ধ করতেন মেঘের আড়াল থেকে। আর রাম-পন্থী দলে ইন্দ্রনীল থাকছেন ‘আকাশ জুড়ে’! যুবমোর্চার ‘আকাশ’। রাজ্যের মন্ত্রী হয়েছেন। দলীয় নীতি অনুযায়ী সাংগঠনিক গুরুদায়িত্বে আর থাকতে পারবেন না। তাই পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির যুবমোর্চা সভাপতি পদ থেকে সরানো হয়েছে ইন্দ্রনীল খাঁকে। কিন্তু সরেও যেন সরলেন না। যুবমোর্চার নতুন সভাপতি তথা আমতার বিধায়ক অমিত সামন্ত আনুষ্ঠানিক ভাবে দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু দলের অন্যতম প্রধান ‘যুব-মুখ’ হিসেবে পেশায় ক্যানসার চিকিৎসক ইন্দ্রনীলকেই সামনে রাখছে বিজেপি। রাজনীতিতে উচ্চশিক্ষিতদের আনাগোনা ক্রমশ কমছে বলে আক্ষেপ এখন প্রায় সব দলেই। শুধুমাত্র সাংগঠনিক বাধ্যবাধকতার কারণে সেই আক্ষেপের পরিসরকে আরও বড় করে তুলতে বিজেপি নেতৃত্ব নারাজ। ২৫ সেপ্টেম্বর রাজ্য যুবমোর্চার সভাপতি হিসেবে ঘোষিত হয়েছে অমিত সামন্তের নাম। বিজেপির বিজ্ঞপ্তিতে লেখা ছিল যে, ঘোষণার মুহূর্ত থেকেই এই নিযুক্তি কার্যকর। অর্থাৎ ২৫ সেপ্টেম্বর দুপুর থেকেই অমিত রাজ্য যুবমোর্চার নতুন সভাপতি। কিন্তু তার পরে ২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বর বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীনের পশ্চিমবঙ্গ সফরে দলের যুব-মুখ হিসেবে সামনে রাইলেন ইন্দ্রনীলই। ২৮ সেপ্টেম্বর কলকাতায় নিতিন নবীন ‘যুব ভারত সংলাপ’ নামে যে কর্মসূচিতে অংশ নিলেন, ইন্দ্রনীলই তার মুখ্য আয়োজক। নিতিনের ২৮ তারিখের কর্মসূচিতে শেষ মুহূর্তে কিছু অদলবদল ঘটেছিল। সকালে গঙ্গাসাগরে যাওয়ার পরিকল্পনা আগে ছিল না। দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক বিজেপি নেতা নিতিনের সেই ইচ্ছা উস্কে দেন। ফলে নিতিনের অন্যান্য কর্মসূচি কিছুটা পিছিয়ে যায়। ‘যুব ভারত সংলাপ’-এ বেশ কিছুটা দেরিতে পৌঁছোন। সে দিনই তাঁর দিল্লিতে ফেরা নির্ধারিত ছিল। তাই যুব প্রতিনিধিদের সঙ্গে খুব বেশিক্ষণ কথাবার্তা তিনি বলতে পারেননি। তবে এ রকম বার্তালাপ শুভেন্দু অধিকারী আরও করবেন বলে ঘোষণা করেন নিতিন। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দেন যে, পরবর্তী ‘যুব ভারত সংলাপ’-এর আয়োজন ইন্দ্রনীল খাঁ-ই করবেন।
মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পরে বিজেপিতে জল্পনা, ‘এক ব্যক্তি, এক পদ’ নীতির কারণে যুব সভাপতি পদ থেকে সরাতে হলেও ইন্দ্রনীলকেই রাজ্যে প্রধান যুব-মুখ হিসেবে সামনে রাখতে চায় দল। বিজেপির একটি সূত্রের অবশ্য ব্যাখ্যা, এই আলাপচারিতার কর্মসূচি যুবমোর্চা করছে না। করছে রাজ্য সরকারের যুবকল্যাণ দফতর। ইন্দ্রনীল যার মন্ত্রী। তাই আয়োজক হিসেবে তাঁর নাম মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন। তবে বিজেপির অন্য একটি সূত্রের দাবি, ইন্দ্রনীলকে ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দফতর ভেবেচিন্তেই দেওয়া হয়েছে। গোড়ায় মনে করা হচ্ছিল যে, তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রী হচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্য দফতর যায় আর এক ক্যানসার চিকিৎসক শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের হাতে। দলের যুব-মুখ বলেই যুবকল্যাণ দফতর ইন্দ্রনীলের হাতে দেওয়া হয়, ব্যাখ্যা বিজেপির এই সূত্রটির। যুবমোর্চার সভাপতি বদলের পরে সদ্যপ্রাক্তন সভাপতিকে ঘিরে নেতাকর্মীদের হইচইয়ের ছবি সাম্প্রতিক অতীতে কেউ দেখেননি। দেবজিৎ সরকারের পরে যুবমোর্চার শীর্ষপদে এসেছিলেন সৌমিত্র খাঁ। সৌমিত্রের পরে ইন্দ্রনীল। দায়িত্ববদলের দিনে নতুন সভাপতির পাশাপাশি প্রাক্তনকেও ঘিরে উচ্ছ্বাস হয়েছিল বলে কেউ মনে করতে পারছেন না। ২৯শে ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। দলের যুব সংগঠনে ইন্দ্রনীলের গুরুত্ব বহাল থাকার চর্চা পুরোপুরি নস্যাৎ করতে পারছেন না যুবমোর্চার রাজ্য সহ-সভাপতি গোপাল গয়ালি। তবে তিনি বলছেন, ‘‘নতুন এবং পুরনোর মধ্যে সমন্বয় রেখে চলাই আমাদের দলের নীতি। অমিত সামন্ত আমাদের নতুন সভাপতি হিসাবে যে দিন আনুষ্ঠানিক ভাবে দায়িত্ব নিলেন, সে দিন আমরা শুধু ইন্দ্রনীলদাকে সম্মান জানিয়েছি, এমন নয়। তাঁর দুই পূর্বসূরি সৌমিত্র খাঁ এবং দেবজিৎ সরকারকেও ডাকা হয়েছিল।’’ গোপালের দেওয়া তথ্য ভুল নয়। কিন্তু যুবমোর্চায় এ বার সভাপতি বদলের পরে প্রাক্তন ও বর্তমানের মধ্যে যে মসৃণ সমীকরণ চোখে পড়েছে, আগের বদলগুলির সময়ে সে ছবি অমিল ছিল। ইন্দ্রনীল ঘনিষ্ঠেরা এখন অমিতের যে রকম ভূয়সী প্রশংসা করছেন, সে ছবিও নতুন।
বিজেপি সূত্র বলছে, অমিত সামন্ত বহু বছর ধরেই ইন্দ্রনীল খাঁয়ের ঘনিষ্ঠ। দু’জনেই একই সঙ্গে আরএসএসের ছাত্র সংগঠন এবিভিপি-তে ছিলেন। ইন্দ্রনীল যুবমোর্চার সভাপতি হওয়ার পরে অমিতকে সাধারণ সম্পাদক করেন। পরে করেন সহ-সভাপতি। ফলে ‘সিনিয়র’ ইন্দ্রনীলকে মানতে অমিতের সমস্যা নেই। অমিতকে যুব সভাপতি হিসাবে বাছার সময় সে সবও মাথায় রাখা হয়েছে বলে খবর। যুব সভাপতি হিসেবে ইন্দ্রনীলের ‘সাফল্য’ সম্পর্কে দলের একাংশেরই নানা প্রশ্ন আছে। যদিও তাঁর আমলে তরুণদের নিয়ে ‘বাজেট টক্’, ‘গ্রাম চলো’-র মতো যুবমোর্চার কর্মসূচি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নজর কেড়েছিল। অন্যান্য রাজ্যের যুবমোর্চাকেও সে সব কর্মসূচি অনুসরণ করতে বলা হয়েছিল। তা ছাড়া, তাঁর জমানাতেই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে যুবমোর্চা মণ্ডল স্তর পর্যন্ত কমিটি গড়তে সক্ষম হয়েছিল। ফলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে ইন্দ্রনীলের একটা গ্রহণযোগ্যতা আছে। পাশাপাশি, ইন্দ্রনীলের মতো শিক্ষিত, পরিশীলিত তরুণরা রাজনীতিতে আজকাল কমই আসেন। তাই নতুন প্রজন্মকে ‘স্বচ্ছতা’র বার্তা দেওয়ার সুযোগ নেতৃত্ব হাতছাড়া করতে চান না, বলছে বিজেপি সূত্র। অতএব, সরেও সরছেন না ইন্দ্রনীল খাঁ। যুবমোর্চার রাশ খাতায়-কলমে অমিত সামন্তের হাতে গেলেও আপাতত সংগঠনের আকাশ জুড়ে রাজ্যের যুবকল্যাণ মন্ত্রীই থাকবেন। ইঙ্গিত তেমনই।




