RK NEWZ সুপ্রিম কোর্টে রাজ্য জানায়, সুমিতের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রায় ১৫ কোটি টাকা জমা পড়েছে। শুধু জুন মাসেই জমা পড়েছে ৭১ লক্ষ টাকা। এই লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর এড়িয়ে গিয়েছেন। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্তসহায়ক (পিএ) সুমিত রায়ের রক্ষাকবচ বৃহস্পতিবার বাতিল করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। সেই সঙ্গে তাঁর আগাম জামিনের আবেদনটিও খারিজ করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশ প্রকাশ্যে আসার পরেই শালবনির জমি দুর্নীতি মামলায় সুমিতকে গ্রেফতার করে সিআইডি। কালীঘাটে অভিষেকের বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। শুক্রবার তাঁকে মেদিনীপুরের আদালতে হাজির করানো হতে পারে। অভিযোগ, সুমিত তদন্তে সহযোগিতা করেননি। জিজ্ঞাসাবাদের সময় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়েছেন বার বার। সেই কারণেই তাঁর রক্ষাকবচ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় শীর্ষ আদালত। রাজ্যের তরফে সুমিতের মামলায় সওয়াল করেছেন কেন্দ্রের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। বুধবারের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে রাজ্য জানায়, সুমিতের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রায় ১৫ কোটি টাকা জমা পড়েছে। শুধু জুন মাসেই জমা পড়েছে ৭১ লক্ষ টাকা! এই বিপুল লেনদেন নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলি তিনি বার বার এড়িয়ে গিয়েছেন। অনেক প্রশ্নের জবাবে সুমিত কেবল বলেছেন ‘আমি জানি না’ কিংবা ‘আমি মনে করতে পারছি না’। এই দুই উত্তরের মাধ্যমেই অধিকাংশ প্রশ্ন এড়িয়ে যান সুমিত। রাজ্যের আইনজীবীর আশঙ্কা, এখনও পর্যন্ত তদন্তে যা পাওয়া গিয়েছে, তা হিমশৈলের চূড়া মাত্র। তদন্তে অসহযোগিতার অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন সুমিত। তাঁর হয়ে আদালতে সওয়াল করেন আইনজীবী গোপালশঙ্কর নারায়ণ এবং অয়ন ভট্টাচার্য। তাঁদের বক্তব্য ছিল, অভিষেকের আপ্তসহায়ক হওয়ার কারণেই সুমিতের বিরুদ্ধে ১১টি এফআইআর করা হয়েছে। তাঁকে প্রায় ৮৮ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সিআইডি। কিন্তু তাঁর নিজের বা পরিবারের সদস্যদের অ্যাকাউন্টে লেনদেনের বিষয়ে যথাযথ নথি দেখিয়ে প্রশ্ন করা হয়নি। সুমিতকে কেবল প্রশ্ন করা হয়েছে তৃণমূলের অ্যাকাউন্টে জমা পড়া টাকার বিষয়ে, যা এই মামলার সঙ্গে সম্পর্কিতই নয় বলে দাবি আইনজীবীদের। সুমিত জানান, ব্যাঙ্কে তিনি নিজে সর্বোচ্চ জমা করেছেন মাত্র ৬০ হাজার টাকা। দলের অ্যাকাউন্টে জমা পড়া ৪২.১৭ কোটি টাকার বিষয়ে দলকে প্রশ্ন করা যেতে পারে। উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর বিচারপতিরা সুমিতের জিজ্ঞাসাবাদ প্রক্রিয়ার ভিডিয়োর লিখিত রেকর্ড দেখতে চান। বুধবারই আদালতে তা জমা দেওয়া হয়েছিল। সুমিতের তরফেও এই সংক্রান্ত লিখিত নথি জমা দেন তাঁর আইনজীবীরা। উভয় পক্ষের নথি খতিয়ে দেখে বিচারপতি কান্ত বলেন, ‘‘আমরা সময় এবং সুযোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু সুমিত তদন্তে সহযোগিতা করেননি।”
এ প্রসঙ্গে বিচারপতি বাগচীর পর্যবেক্ষণ, সুমিতের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে নগদ টাকা জমা না পড়লেও একই সময়ে দলের অ্যাকাউন্টে তা জমা পড়েছে। এখানেই বিষয়টি জটিল হচ্ছে। ব্যাঙ্কের নথিতে দেখা যাচ্ছে, কিছু টাকা এমন একটি অ্যাকাউন্টে জমা করা হয়েছে, যার সঙ্গে সুমিতের প্যান নম্বর যুক্ত। তা ছাড়া, যখন অভিযোগ উঠেছে কিছু ব্যক্তি বেআইনি ভাবে সুমিতের হাতে টাকা দিয়েছেন এবং সেই সময়েই দলের অ্যাকাউন্টে নগদ জমা পড়েছে, তখন বিষয়টি তদন্তের অংশ হতে পারে। এই ধরনের মামলায় অতিরিক্ত বিচারবিভাগীয় নজরদারি প্রয়োজন। প্রধান বিচারপতি কান্ত এর পরেই বলেন, ‘‘জিজ্ঞাসাবাদের সময় সুমিতের দেওয়া কিছু উত্তর এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে আদালতের এই পর্যায়ে তদন্তে হস্তক্ষেপ করা উচিত হবে না।’’
রাজ্যের আইনজীবী মেহতা জানান, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হয়েছিল। তার পর ওই অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ৩০ কোটি টাকা স্থানান্তরিত হয় ‘লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ডস্’ নামের একটি সংস্থার (যা অভিষেকের সংস্থা হিসেবে পরিচিত) অ্যাকাউন্টে। তদন্ত চলাকালীন এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত বা বিষয়টি সম্পর্কে জানেন, এমন কয়েক জনের বয়ান নিয়েছিল সিআইডি। তাঁরা জানান, লেনদেনের টাকা নির্দিষ্ট এক জনের কাছে যেত। তিনি ব্যাঙ্কে লক্ষ লক্ষ টাকা জমা করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে পদবির বানান নিয়ে প্রথমে বিভ্রান্তি তৈরি হলেও ব্যাঙ্কের নথি যাচাই করে দেখা গিয়েছে, টাকা জমা পড়েছে একই প্যান নম্বরের অধীনে, যা সুমিতের।
রাজ্যের এই সওয়ালের প্রেক্ষিতে সুমিতের আইনজীবীদের দাবি, তাঁদের মক্কেল এই মামলার খুব নগণ্য ব্যক্তি। তিনি তদন্তে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন। বার বার হাজিরা দিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নথিপত্র যাচাই করেই প্রমাণ করা সম্ভব। কিন্তু তাঁকে ব্যবহার করে আসলে দলের অন্য কোনও ব্যক্তির নাম প্রকাশ্যে আনার চেষ্টা চলছে। তদন্তের নামে একটি রাজনৈতিক দলের বিষয়ে অপ্রাসঙ্গিক ভাবে ‘ফিশিং অ্যান্ড রোভিং ইনকোয়ারি’ (এ দিক ও দিক করে তথ্য খোঁজার চেষ্টা) চলছে বলেও আদালতে মন্তব্য করেন সুমিতের আইনজীবীরা। কিন্তু আদালত তদন্তে সহযোগিতার শর্তেই সুমিতকে রক্ষাকবচ দিয়েছিল। এ নিয়ে আগের শুনানিতেও তাঁকে সতর্ক করেছিলেন বিচারপতি। বৃহস্পতিবার তাই তাঁর রক্ষাকবচ বাতিল করে দেওয়া হয়।
আদালতের নির্দেশের পরেই কালীঘাটে অভিষেকের বাড়িতে পৌঁছে যায় সিআইডি। সঙ্গে ছিল বিশাল পুলিশবাহিনী। অভিষেক নিজে বাড়িতে নেই। তিনি চোখের চিকিৎসার জন্য বিদেশে গিয়েছেন। কালীঘাটের বাড়ির সামনে নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তি হয়েছিল কিছুক্ষণ। শেষপর্যন্ত সিআইডি আধিকারিকেরা বাড়িতে ঢোকেন। দরজা খুলতেই সুমিত বেরিয়ে আসেন এবং তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ভবানী ভবনে প্রথমে সুমিতকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে স্বাস্থ্যপরীক্ষার জন্য নেওয়া হয় এসএসকেএম হাসপাতালে। তাঁর গ্রেফতারি প্রসঙ্গে বিধানসভা থেকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘‘প্রসিদ্ধ তোলাবাজ সুমিত রায় গ্রেফতার হয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টে রক্ষাকবচ বাতিল হওয়ায় কালীঘাটে তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যালয় থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ১২১, কালীঘাট রোড থেকে তাঁকে রাজ্য পুলিশের সিআইডি গ্রেফতার করেছে।” শালবনির জমি দুর্নীতি মামলায় এর আগে প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সুজয় হাজরাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সিআইডি ইতিমধ্যে যে ১৪ পাতার চার্জশিট দিয়েছে, তাতে সুজয়ের নাম রয়েছে। কিন্তু সুমিতের নাম নেই। অতিরিক্ত চার্জশিটে তাঁর নাম যোগ করা হতে পারে।




