RK NEWZ নভেম্বরেই কলকাতা-হাওড়ার পুরভোট? সেই সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতির পারদ চড়তে শুরু করেছে। নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক দিনক্ষণ এখনও ঘোষণা না হলেও, বসে থাকতে নারাজ রাজ্য বিজেপি। ভোটে নামার আগে নিজেদের সংগঠনকে মজবুত করতে এবং নিখুঁত রণকৌশল সাজাতে আগাম প্রস্তুতি শুরু করে দিল পদ্ম শিবির। পুরভোটে প্রস্তুতির অঙ্গ হিসেবে বিধাননগরে বিজেপির রাজ্য দফতরে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক বসেছিল। ছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক পর্যবেক্ষক সুনীল বনসল। কলকাতার পুর নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করে দিল বিজেপি। দলের প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারকে কলকাতার পুরভোট সামলানোর দায়িত্ব দেওয়া হল। সুকান্তের সঙ্গে রাখা হয়েছে রাজ্যের এক মন্ত্রী এবং এক বিধায়ককে। কলকাতার পুরভোটকে বিজেপি কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, সুকান্তের মতো শীর্ষনেতাকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তেই তা স্পষ্ট। সূত্রের খবর, আগামী নভেম্বরেই হতে পারে কলকাতা পৌরসভার নির্বাচন এবং আগামী সাত ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন বোর্ড গঠন করার বিষয়ে একাধিকবার ইঙ্গিত দিয়েছে বর্তমান রাজ্য সরকার। এই সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে মঙ্গলবার সল্টলেকের পার্টি কার্যালয়ে রণকৌশল নির্ধারণে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক সারলেন রাজ্য ও কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতৃত্ব।
সল্টলেকের কার্যালয়ে উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার বিধায়কদের নিয়ে এই জরুরি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিজেপির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক তথা বাংলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সুনীল বনসল, কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ডঃ সুকান্ত মজুমদার এবং সংগঠনের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক অমিতাভ চক্রবর্তী। এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন স্বপন দাশগুপ্ত, সজল ঘোষ, রীতেশ তিওয়ারি, শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের মতো একাধিক পদ্ম বিধায়ক ও শীর্ষ নেতা। কলকাতার পুরভোট পরিচালনা কমিটির ইনচার্জ হয়েছেন সুকান্ত। কো-ইনচার্জ করা হয়েছে রাজ্য বিজেপির সহ-সভাপতি অনিন্দ্য(রাজু)বন্দ্যোপাধ্যায়কে। মানিকতলার বিধায়ক তথা রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় কমিটির আহ্বায়ক। সহ-আহ্বায়ক কাশীপুর-বেলগাছিয়ার বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারি। একই সঙ্গে হাওড়া পুরসভার নির্বাচন পরিচালনা কমিটিও নির্ধারিত হয়েছে মঙ্গলবার। আর এক প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি তথা রাজ্যসভার সাংসদ রাহুল সিংহকে ইনচার্জ করা হয়েছে। আহ্বায়ক করা হয়েছে বালির বিজেপি বিধায়ক সঞ্জয় সিংহকে।
হাওড়ায় পুরবোর্ড নেই গত ৮ বছর। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ভেঙে গিয়েছে কলকাতার পুরবোর্ড। রাজ্যে পালাবদলের পরে ইস্তফা দিয়েছেন মেয়র ফিরহাদ হাকিম। কারণ হিসেবে বলেছিলেন, পুরসভায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। ববি-বিদায়ের পরে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তৃণমূল নতুন মেয়রের নাম চূড়ান্ত করতে না-পারায় কলকাতা পুরসভায় প্রশাসক বসিয়ে দিয়েছে রাজ্য সরকার। পুর কমিশনার স্মিতা পাণ্ডে প্রশাসক হিসেবে কাজ সামলাচ্ছেন। পুরবোর্ড মেয়াদ পূর্ণ করলে এ বছরের ডিসেম্বর নাগাদ ভোট হত। বিজেপি সূত্রের খবর, পুজোর পরে অর্থাৎ নভেম্বর-ডিসেম্বর নাগাদ ভোট হবে ধরে নিয়ে দল প্রস্তুতি শুরু করেছে। বিধানগরে বিজেপির রাজ্য দফতরে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক বসেছিল। ছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক পর্যবেক্ষক সুনীল বনসল। রাজ্য নেতৃত্বের তরফে ছিলেন সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) অমিতাভ চক্রবর্তী, প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি তথা কোর কমিটি সদস্য সুকান্ত মজুমদার। কলকাতা পুর এলাকার বিজেপি বিধায়কদেরও বৈঠকে ডাকা হয়েছিল। সেই বৈঠকেই সুকান্তকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়েছে।
কেন বেছে নেওয়া হল সুকান্তকে? বিজেপি সূত্রের ব্যাখ্যা, প্রথমত, সুকান্তের মতো ওজনদার নেতাকে দায়িত্ব দেওয়ার মধ্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত এই যে, কলকাতা দখলের লক্ষ্যে তেড়েফুঁড়ে ময়দানে নামবে বিজেপি। দ্বিতীয়ত, এ রাজ্যে দলের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক কাজে সুকান্তের প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিতও রয়েছে। রাজ্য সভাপতি পদ থেকে সুকান্তের প্রস্থান তথা সে পদে শমীক ভট্টাচার্যের আগমনের পরেও সুকান্তকে সসম্মানেই রাজ্য পার্টির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক মহলে রাখা হয়েছিল। আর এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর এখন আর রাজ্য কোর কমিটিতে না-থাকলেও, সুকান্তকে রেখে দেওয়া হয়েছিল। এ বার ছোট লালবাড়ি দখলের লড়াই দেখভালের দায়িত্বও সুকান্তের কাঁধে ফেরায় আরও স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, বিজেপির রাজ্য সংগঠনে বালুরঘাটের সাংসদকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাতেই দেখতে চাইছেন বনসলেরা।
২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে জয়ের হুঙ্কার ছেড়ে লড়তে নামা বিজেপির রথ ৭৭ আসনেই থেমে যায়। বিধানসভা ভোটে সেই পরাজয়ের কয়েক মাস পরেই দিলীপ ঘোষকে সরিয়ে সভাপতি করা হয় সুকান্তকে। বিজেপির একাধিক রাজ্য স্তরের নেতা মনে করেন, সে সময়ে সুকান্তের চেয়ে বেশি পরিচিতি সম্পন্ন একাধিক মুখ দলে ছিলেন। কিন্তু দল তখন প্রায় ছিন্নভিন্ন। জেলায় জেলায় বিজেপি কর্মীদের উপরে হামলা হচ্ছে, অজস্র কর্মী ঘরছাড়া, পিঠ বাঁচাতে অনেকেই দল বদলে ফেলছেন। ওই রকম কঠিন সময়ে রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব নিতে অনেকে রাজি হননি বলে বিজেপি সূত্রের দাবি। সুকান্ত দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তাঁর দায়িত্বপ্রাপ্তির কয়েক মাসের মধ্যে হওয়া পুর নির্বাচনে বিজেপি আরও শোচনীয় পরাজয়ের মুখ দেখেছিল। গোটা রাজ্যের শতাধিক পুরসভার নির্বাচনে বিজেপির ভোট ১৩ শতাংশে নেমে এসেছিল। আসন কিছুটা বেশি পেলেও শতাংশের বিচারে বামেদের সম্মিলিত ভোটের চেয়ে বিজেপি কম ভোট পেয়েছিল। অমিত শাহ নিউটাউনের এক প্রেক্ষাগৃহে দলীয় কর্মসূচিতে বলেছিলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে আমাদের আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হবে।’’ সুকান্তের সভাপতিত্বেই সেই ‘শূন্য থেকে শুরু করা’র কাজটা শুরু হয়। ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত ভোটে বিজেপির ভোট ১৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৩ শতাংশে পৌঁছোয়। পঞ্চায়েতের তিন স্তর মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার আসনে জয়ী হয় তারা। যা ছিল বামফ্রন্ট, কংগ্রেস, আইএসএফ-এর সম্মিলিত আসনসংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দেশের অধিকাংশ রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপির লোকসভা আসন কমে যায়। ১৮ থেকে কমে বিজেপি ১২ হয়। কিন্তু ভোটপ্রাপ্তির হার ফের ৩৯ শতাংশে পৌঁছে যায়। অর্থাৎ ২০২১ সালের ভোটপ্রাপ্তির চেয়ে এক শতাংশ বেশি।
সে নির্বাচনের পরেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় সুকান্তের অন্তর্ভুক্তি ঘটেছিল। তখনই বোঝা গিয়েছিল যে রাজ্য সভাপতি পদ ছাড়তে হবে তাঁকে। কারণ ‘এক ব্যক্তি, এক পদ’ বিজেপির ঘোষিত নীতি। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে সুকান্তের স্থলাভিষিক্ত হন শমীক। তার পর থেকে গত এক বছরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অনেক জল গড়িয়ে গিয়েছে। বিরোধী আসন থেকে বিজেপি শাসক হয়েছে। তবে সাংগঠনিক স্তরে যে এখনও অনেক কাজ বাকি, তা বিজেপি নেতারা জানেন। কলকাতা ও হাওড়ার পরে ২০২৭ সালে বাকি পুরসভাগুলিতে ভোট হবে। ২০২৮ সালে পঞ্চায়েত নির্বাচন। তার আগে দ্রুত সংগঠন গুছিয়ে নিতে বিজেপি যে ওজনদার নেতাদেরকেই কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা স্পষ্ট।
কী নিয়ে আলোচনা বৈঠকে?
বৈঠকে মূলত কলকাতা পুরসভার সম্ভাব্য নির্বাচনী পরিস্থিতি, ওয়ার্ডভিত্তিক সাংগঠনিক শক্তি, বুথস্তরের প্রস্তুতি এবং প্রার্থী বাছাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত দিকগুলি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিধায়কদের থেকে উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার বর্তমান রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পরিস্থিতির পুঙ্খানুপুঙ্খ রিপোর্ট ও ফিডব্যাক নেওয়া হয়। পাশাপাশি কীভাবে জেলাভিত্তিক সংগঠনকে আরও মজবুত ও ধারালো করা যায়, তা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা চলেছে।
গঠিত হল বিশেষ কমিটি, কারা দায়িত্বে?
ভোটের প্রচার, সংকল্পপত্র (ইশতেহার) তৈরি এবং প্রার্থী ঝাড়াই-বাছাইয়ের জন্য বিজেপির তরফ থেকে একটি বিশেষ কমিটি ও সাংগঠনিক পদের তালিকাও বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের নির্দেশে রাজ্য সাধারণ সম্পাদক শশী অগ্নিহোত্রী স্বাক্ষরিত এক অফিসিয়াল সার্কুলার প্রকাশ করা হয়।
পুরসভা নির্বাচন ২০২৬-কে সামনে রেখে কলকাতা ও হাওড়া পুরসভার জন্য নতুন ইন-চার্জ, কনভেনর ও কো-কনভেনর নিয়োগ করা হয়েছে।
কলকাতা পুরসভা (KMC)
ইন-চার্জ: ডঃ সুকান্ত মজুমদার (কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী, ভারত সরকার)
কো ইন-চার্জ: শ্রী অনিন্দ্য ব্যানার্জী (রাজু) (রাজ্য সহ-সভাপতি)
কনভেনর: শ্রী তাপস রায় (এমআইসি, পশ্চিমবঙ্গ সরকার)
কো-কনভেনর: শ্রী রীতেশ তিওয়ারি (কাশীপুর-বেলগাছিয়ার বিধায়ক)
হাওড়া পুরসভা (HMC)
ইন-চার্জ: শ্রী রাহুল সিনহা (রাজ্যসভার সাংসদ)
কনভেনর: শ্রী সংঞ্জয় কুমার সিংহ (বালির বিধায়ক)
এই নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে ইতিমধ্যেই রাজ্য বিধানসভায় দু’টি বিল পাশ করানো হয়েছে। মূলত হাওড়া পুরসভার ওয়ার্ড সংখ্যা ৫০ থেকে বাড়িয়ে ৬৮ ও কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। কলকাতা পুরসভা সূত্রের খবর আসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত খসড়া রিপোর্ট ইতিমধ্যেই পুরসভায় জমা পড়েছে। ফলে, কী হাওড়া, কী কলকাতা পুরসভা, এই দুই যমজ শহরের যমজ পুরসভার জন্য এক বিশাল সংখ্যক পৌর প্রতিনিধির খোঁজ করতে হচ্ছে বিজেপিকে। তবে, বিজেপি সূত্রে খবর রাজ্যে পালাবদল ঘটে শাসন ক্ষমতায় বিজেপি আসায়, দুটি পুরসভাতেই, নির্দিষ্ট আসনের কয়েকগুন বেশি টিকিট প্রত্যাশি রয়েছে। তাই, তাদের মধ্যে থেকে ঝাড়াই বাছাই করে তালিকা তৈরি করবে নেতৃত্ব।




