Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

বাংলায় বিজেপি সরকারের ১০০ দিন! নির্বাচনী ‘সঙ্কল্পপত্রে’ বিজেপির প্রতিশ্রুতি মতোই কাজ?‌

RK NEWZ রাজ্যের নতুন সরকার ১০০ দিন পূর্ণ মঙ্গলে। প্রথম ১০০ দিনে কোন কোন উল্লেখযোগ্য কাজ হল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মন্ত্রিসভার কাজ সাধারণ জনপরিসরে বেশি চর্চিত। বিজেপি সরকারের যে দফতরের কাজ নিয়ে গোড়া থেকেই আলোচনা তুঙ্গে, সে দফতর মুখ্যমন্ত্রীর নিজের হাতেই। ভূমি ও ভূমিসংস্কার দফতর। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকা স্বাধীনতা তথা দেশভাগের এত বছর পরেও উন্মুক্ত পড়ে ছিল। কাঁটাতারের বেড়া ছিল না। ফলে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশ পশ্চিমবঙ্গে বড় সমস্যা হয়ে উঠেছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার সীমান্তে বেড়া দেওয়ার জন্য জমি বিএসএফ-কে দিচ্ছে না এবং তার ফলে রাজ্যের নানা প্রান্তে জনবিন্যাস ক্রমশ বদলে যাচ্ছে বলে বিজেপি লাগাতার অভিযোগ করছিল। উন্মুক্ত সীমান্ত দিয়ে জঙ্গি অনুপ্রবেশ জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে বলেও দাবি করা হচ্ছিল। নির্বাচনী ‘সঙ্কল্পপত্রে’ বিজেপির প্রতিশ্রুতি ছিল যে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গড়লেই সীমান্তে বিএসএফ-কে জমি হস্তান্তর করা হবে, যাতে দ্রুত কাঁটাতারের বেড়া লাগিয়ে সীমান্ত সুরক্ষিত করা যায়। এ ক্ষেত্রে যেমন কথা, প্রায় তেমনই কাজ হয়েছে। যে সব এলাকায় সীমান্ত বেড়াহীন ছিল, তার অধিকাংশেই বিএসএফ-কে রাজ্য সরকার জমি দিয়ে দিয়েছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনীও উল্লেখযোগ্য দ্রুততায় বেড়া লাগানোর কাজ শেষ করেছে বিরাট এলাকায়। ভূমি ও ভূমিরাজস্ব দফতরের দেওয়া হিসাব বলছে, রাজ্যের ন’টি সীমান্তবর্তী জেলায় ইতিমধ্যেই ৭৬৭ একরের বেশি জমি বিএসএফ-কে হস্তান্তর করা হয়েছে। আরও প্রায় ৩৬২ একর জমি হস্তান্তরে মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিয়েছে। ফলে বিএসএফ-কে দেওয়া জমির পরিমাণ ১১০০ একর ছাড়িয়ে গিয়েছে। এ ছাড়া সীমান্ত সুরক্ষার স্বার্থেই দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ার জেলায় ৪৪ একরের বেশি জমি দেওয়া হয়েছে সশস্ত্র সীমা বলকে (এসএসবি)। দার্জিলিঙে আইটিবিপি-র ব্যাটালিয়নের সদর দফতর তৈরির জন্য দেওয়া হয়েছে আরও ১১০ একর জমি।

ভূমি ও ভূমিসংস্কার দফতর উল্লেখযোগ্য কাজ করেছে পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও। সেবক-রংপো ব্রডগেজ রেল প্রকল্পের জন্য রেলকে ২০ একর জমি দিয়েছে রাজ্য সরকার। পশ্চিম মেদিনীপুরে ১০০ শয্যার ইএসআই হাসপাতাল তৈরির জন্য প্রায় ৬ একর জমি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কোথাও সরকারি গুদাম তৈরির জন্য, কোথাও বিদ্যুতের সাবস্টেশন তৈরির জন্য, কোথাও অন্যান্য পরিকাঠামোর জন্যও জমি জোগানোর কাজ দ্রুত সেরে ফেলা হয়েছে। চিংড়িঘাটা মোড়ের উপরে দু’বছর ধরে আটকে থাকা মেট্রো লাইনের কাজ। ১২০ ঘণ্টার জন্য ওই মোড়ে যান চলাচল বন্ধ রাখলেই চিংড়িঘাটা মোড়ের উপরের অংশ ভায়াডাক্ট বসানোর কাজ সেরে ফেলা যাবে বলে নির্মাতা সংস্থা রেল বিকাশ নিগম লিমিটেড (আরভিএনএল) জানিয়েছিল। আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও চিংড়িঘাটা মোড়ে কয়েক দিনের জন্য যান চলাচল বন্ধ করতে রাজি হননি মমতা। শুভেন্দু মুখ্যমন্ত্রী হয়েই রাজ্য প্রশাসনকে নির্দেশ দেন আরভিএনএল-এর সঙ্গে সহযোগিতার করার জন্য। মে মাসের দু’টি সপ্তাহান্তে চিংড়িঘাটা মোড়ে দু’ফায় যান চলাচল বন্ধ রেখেই ভায়াডাক্ট বসানোর কাজ সেরে ফেলা হয়। রাজ্য সরকারের বয়স তিনমাস পেরোনোর আগেই চিংড়িঘাটার দু’দিকের দুই স্টেশন বেলেঘাটা এবং গৌরকিশোর ঘোষের মাঝে রেলসংযোগের কাজ পুরোপুরি সেরেছে আরভিএনএল।

বিজেপি ক্ষমতায় আসতেই পর পর খুলে গিয়েছে বেশ কিছু বন্ধ চটকল। রাজ্যের শ্রমমন্ত্রী অর্জুন সিংহের ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে। শ্রম দফতরের দেওয়া হিসাব বলছে, গত ১০০ দিনে হুগলি নদীর দু’পারে ১৬টি বন্ধ চটকল ফের খোলা হয়েছে। ৩৫ হাজারেরও বেশি শ্রমিকের রুটিরুজি নিশ্চিত হয়েছে বলে সরকারি সূত্র দাবি করছে। অর্জুনের হাতে থাকা পরিবহণ দফতরও অনেকের প্রশংসা পেয়েছে। ‘সঙ্কল্পপত্রে’ দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, সরকারি বাসে মহিলাদের বিনামূল্যে যাতায়াত চালু হয়ে গিয়েছে। তৃণমূল জমানায় রাজ্যের রাস্তাঘাট থেকে সরকারি বাস যে ভাবে প্রায় উধাও হয়ে গিয়েছিল, সে পরিস্থিতি কাটাতেও অর্জুন তৎপর হয়েছেন। বেশ কিছু রুটে নতুন সরকারি বাস রাস্তায় নেমেছে। তবে সে সংখ্যা এখনও পর্যাপ্ত নয়। গণপরিবহণ ব্যবস্থার হাল ফেরাতে সরকারি বাস আরও অনেক বেশি সংখ্যায় রাস্তায় নামাতে হবে বলে রাজ্যের শাসকদলের নেতারাই বলছেন।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিমতো ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ও চালু করে দিয়েছে শুভেন্দুর সরকার। কথামতো মহিলারা সে প্রকল্পে এখন ৩০০০ টাকা করেই পাচ্ছেন। এই প্রকল্প নিয়ে ঈষৎ সমালোচনাও শুরু হয়েছে। তৃণমূল জমানায় ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পে মহিলারা মাসে ১৫০০ টাকা করে পেতেন। ভাতাপ্রাপকের সংখ্যা এখনকার চেয়ে বেশি ছিল। সে ভাতার জন্য আবেদনের প্রক্রিয়াও সরল ছিল। ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ পাওয়ার জন্য যে ১২-১৩ পাতার ফর্ম পূরণ করতে হয়েছে, তা নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। রাজ্য সরকারের যুক্তি ছিল, তৃণমূল জমানায় ভুয়ো পরিচয় দেখিয়ে অনেকেই অন্যায্য ভাবে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর সুবিধা নিতেন। সেই ভুয়ো এবং অন্যায্য প্রাপকদের চিহ্নিত করে তালিকা থেকে বাদ দিতেই অত বড় ফর্ম পূরণ করাতে হয়েছে। কিন্তু সেই ফর্ম পূরণের পরেও অনেক ন্যায্য দাবিদার ভাতা থেকে এখনও বঞ্চিত বলে কারও কারও অভিযোগ। রাজ্য সরকার এবং শাসকদলের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে, যাঁরা ন্যায্য দাবিদার হওয়া সত্ত্বেও এখনও ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ পাননি, তাঁদের এই প্রকল্পের সুবিধা পাইতে দিতে সরকার সচেষ্ট হয়েছে। অল্প সময়েই সমস্যা মিটে যাবে বলে সরকারের আশ্বাস। তবে ভাতা হাতে না-পাওয়া পর্যন্ত অনেকে সে আশ্বাসে ভরসা রাখতে নারাজ।

এ ছাড়া নিখরচায় চিকিৎসার জন্য আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প, কৃষকদের আর্থিক অনুদানের জন্য প্রধানমন্ত্রী কিসান সম্মান নিধি প্রকল্প, শিল্পী ও কারিগরদের জন্য প্রধানমন্ত্রী বিশ্বকর্মা যোজনা, বিদ্যুৎ বিলে সাশ্রয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী সূর্যঘর যোজনার আওতায় ঘরে ঘরে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল বসিয়ে দেওয়ার প্রকল্প নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে রাজ্যের নতুন মন্ত্রিসভা। কিসান সম্মান নিধি রাজ্যকে এড়িয়ে কেন্দ্রীয় সরকার আগেই চালু করেছিল। নতুন সরকার এসে আরও বেশি প্রাপককে সেই প্রকল্পেরও আওতায় এনেছে। অন্য প্রকল্পগুলি এ রাজ্যে এত দিন চালু হতে দেওয়া হয়নি। নতুন সরকার এসেই এই প্রকল্পগুলি রূপায়ণের জন্য কেন্দ্রের সঙ্গে দ্রুত ‘মউ’ স্বাক্ষর করেছে। ফলে সরকারের প্রথম ১০০ দিনেই রাজ্যে এত দিন চালু না-থাকা একের পর এক কেন্দ্রীয় প্রকল্প চালু হতে শুরু করেছে। আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের আওতায় শেষপর্যন্ত কত পরিবার ঠাঁই পায়, সূর্যঘর যোজনা শেষপর্যন্ত কত বাড়িতে পৌঁছোয়, তা দেখার। তবে কেন্দ্র ও রাজ্য যেহেতু এখন একই দলের সরকার, তাই এ সব প্রকল্পের দ্রুত প্রসারে খুব একটা সমস্যা হবে না বলে শাসকদলের আশা।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়টিও নানা মঞ্চ থেকে ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছেন। রাজ্যে আইনের শাসন বলবৎ হয়েছে বলে রবিবারও একটি সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন। কোথাও বিজেপিকর্মীদের বিরুদ্ধে যদি বেআইনি কার্যকলাপের অভিযোগ ওঠে, তা হলেও আইন নিজের পথেই চলবে বলে মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যেই সতর্কবার্তা শুনিয়ে রেখেছেন। বিরোধী দল তৃণমূলের কালীঘাটপন্থী অংশ বা বামেরা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলতে ইতিমধ্যেই উদ্যত। কিন্তু পুলিশ-প্রশাসন নিরপেক্ষতা জলাঞ্জলি দিয়ে দলদাসের মতো আচরণ করছে— এমন অভিযোগ গত ১০০ দিনে জনসাধারণের মুখে সে ভাবে শোনা যায়নি। ফলে বিরোধীদল যাই বলুক, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বড়সড় সমালোচনা শুরুর অবকাশ এখনও তৈরি হয়নি বলে অনেকেই মনে করছেন।

রাজ্যের নতুন সরকার যে বিনিয়োগবান্ধব, গত ১০০ দিনে সে কথাও প্রমাণিত হয়েছে বলে বিজেপি নেতাদের অনেকের দাবি। কারণ গত ১০০ দিনে বস্ত্রশিল্পে বড়সড় বিনিয়োগের শিলান্যাস দেখেছে রাজ্য। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দই কারখানা তৈরির লক্ষ্যে আমুলের প্রকল্পের শিলান্যাসও হয়েছে হাওড়ায়। ইস্পাত শিল্পে বিনিয়োগ এসেছে। মঙ্গলবার অর্থাৎ সরকারের ১০০ দিন পূর্ণ হওয়ার দিনে পুরুলিয়াতেও ইস্পাত ক্ষেত্রে বিনিয়োগের শিলান্যাস হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজেই সে কর্মসূচিতে যোগ দেবেন। যে রাজ্য থেকে ব্যবসা গুটিয়ে ভিন্‌রাজ্যে চলে যাওয়া শুরু করেছিল একের পর এক সংস্থা, সেখানে সরকার বদলের মাত্র ১০০ দিনে এতগুলি বিনিয়োগ আসতে পারে, তা অনেকের কল্পনাতেই ছিল না বলে মনে করছে রাজ্য বিজেপি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles