RK NEWZ বাংলায় নতুন বিজেপি সরকারের এটাই ক্যাচলাইন। নয়া রাজত্বকাল তিন মাস অতিক্রান্ত। প্রশ্ন, বাংলার খেলাধুলোয় কী সত্যি ‘ভরসা ইন’ হতে পেরেছে? মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দ্বারা অভিনন্দিত কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জয়ী ত্রিপুরার বাঙালি জুডোকা অস্মিতা দে। সাধু উদ্যোগ। প্রতিবেশী রাজ্যের বাঙালি কন্যার জন্য অভিনন্দন তো জানানোই যায়। যদিও অস্মিতার সঙ্গে বাংলার কোনও যোগাযোগই কার্যত নেই। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী কি জানেন, ত্রিপুরার মতো ছোট রাজ্য থেকে একজন প্রতিযোগী কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জয় করলেও আমাদের এত বড় রাজ্য বাংলা থেকে এ বার গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে কোনও প্রতিযোগী কোনও পদক জেতেননি। চলতি শতকে অর্থাৎ ২০০২ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ৬ টা কমনওয়েলথ গেমসে প্রতিবারই আমাদের বাংলার ঘরে এক বা একাধিক পদক এসেছে। এই প্রথমবার গেমসে মাত্র তিন বঙ্গসন্তান সুযোগ পান। আর তাঁরা পদক জিততে ব্যর্থ। ধরেই নিচ্ছি, বাংলা থেকে এ ভাবে প্রতিযোগী কমে যাওয়ার পুরো দায়ই বিগত সরকারের। দেখভালের অভাবেই বাংলার খেলা রসাতলে গিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন, আমাদের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীকে কি জানানো হয়েছে, এ রাজ্যেের প্রতিভাবান খেলায়াড়রা সরকার বদলের পরেও অন্য রাজ্যে চলে যাচ্ছেন। কিংবা অন্য রাজ্যে চলে যাওয়া বাঙালি ক্রীড়াবিদরা আর বাংলায় ফিরছেন না?বাংলার কর্মকর্তারা কোমরের জোর এতটাই কমে গিয়েছে, যে বাংলার ছেলেমেয়েরা জাতীয় টিমে ঢোকার ব্যাপারে অন্যায়ের শিকার হলেও কেউ পাশে দাঁড়াচ্ছেন না। ভরসা দিতে পারছেন না। এই কমনওয়েলথ গেমসেই জয়নগরের জিমন্যাস্ট সত্যজিৎ মন্ডল ভারতীয় টিম থেকে অন্যায়ভাবে বাদ পড়েছেন। কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রকের তালিকায় সত্যজিতের নাম থাকলেও গ্লাসগো যাওয়ার সপ্তাহ খানেক আগে তাঁকে বাদ দিয়ে হরিয়ানের এক জিমন্যাস্টকে টিমে ঢোকানো হয়েছে। এ নিয়ে বাংলা এতটাই নীরব থাকল যে সত্যজিৎ হতাশ হয়ে বাংলা ছেড়ে ভুবনেশ্বরে চলে গিয়েছেন। সেখানে প্র্যাক্টিসের পাশাপাশি ওডিশার হয়েই হয়তো জাতীয় মিটে প্রতিনিধিত্ব করবেন। যেমন করেন পিংলার মেয়ে প্রণতি নায়েক। এই মুহূর্তে দেশের অন্যতম সেরা জিমন্যাস্টকে ওডিশা বেশ কয়েক বছর আগেই নিয়ে চলে গিয়েছে। সরকার বদলের পরেই প্রণতিকে বাংলায় আনার কোনও চেষ্টা করা হয়নি।এটাও ঘটনা বাংলায় জিমন্যাস্টিক্সের পরিকাঠামো জ়িরো। ফলে প্রণতিদের বাংলায় ফেরাতে হলে এখানে আগে উন্নতমানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ত হবে। পরিকাঠামো না থাকায় বাংলার আর এক জিমন্যাস্ট প্রতিষ্ঠা সামন্ত ত্রিপুরায় চলে গিয়েছিলেন। তার পরে তিনি বাংলায় ফিরে এসেছেন রেলের চাকরি পেয়ে। কমনওয়েলথ গেমসে প্রতিষ্ঠা বাংলার প্রতিনিধিত্ব করেছেন। দেশের একমাত্র জিমন্যাস্ট হিসেবে ফাইনালেও উঠেছিলেন। কিন্তু ফাইনালে তিনি ব্যর্থ। কারণ বাংলায় জিমন্যাস্টের খারাপ মানের অনুশীলন কেন্দ্রে প্রশিক্ষণে হাঁটুতে চোট পেয়েছিলেন প্রতিষ্ঠা। সেই চোটটাই ফাইনালে তাঁকে পিছনে ফেলে দেয়। প্রতিষ্ঠা বাংলার মুখ রাখার চেষ্টা করলেও তার জন্য কোনও প্রশংসা আসেনি কোনও সরকারি পর্যায় থেকে। কমনওয়েলথ গেমস শেষ। এ বার সামনে এশিয়ান গেমস। সেই টিমেও অন্যায়ভাবে বাদ পড়েছেন বাংলা ইকোয়েস্ট্রিয়ান অনুশ আগরওয়ালা।গত এশিয়াডে সোনা সহ জোড়া পদক জয়ী কলকাতার অনুশ আন্তর্জাতিক সাফল্যের দিক থেকে ভারতের এক নম্বর খেলায়াড়। অথচ ভারতীয় টিমে তিনি বাদ। টেবল টেনিসে এই মুহূর্তে দেশের অন্যতম প্রতিভাবান ও সফল খেলোয়াড় অঙ্কুর ভট্টাচার্য। রাজারহাটের এই খেলোয়াড়কেও নীতিহীন ভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে ভারতীয় টিম থেকে। কেউ তাঁকে ভরসা না দেওয়ায় অঙ্কুর হরিয়ানায় চলে গিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী ব্যস্ত মানুষ। তাঁর পক্ষে খেলাধুলোর খুঁটিনাটি জানা সম্ভব নয়। ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ–ও খেলার মাঠের মানুষ নন। তাঁর খেলার মাঠ বুঝতে আরও অনেকটা সময় দরকার। কিন্তু যাঁরা ক্রীড়া দপ্তরে বছরের পর বছর বসে রয়েছেন। যে কর্তারা আগের সরকারের ক্রীড়ামন্ত্রীর অনুগ্রহ পেতেন, তাঁরা সত্যজিৎ, প্রতিষ্ঠা, অনুশ, অঙ্কুশদের ব্যাপারগুলো কেন সরকারের নজরে আনছেন না। যেভাবে তাঁরা ত্রিপুরার অস্মিতার পদক পাওয়ার ব্যাপারটা নজরে এনেছেন। সরকার যদি এখনই প্রতিষ্ঠা, অঙ্কুর, অনুশদের ভরসায় ইন হতে না পারে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলা কিন্তু খেলাধুলোয় তারকা শূন্য হয়ে যাবে। যেভাবে এ বার কমনওয়েলথ গেমসে বাংলার ভূমিকা শূন্যতে নেমে এসেছে।
অলিম্পিক্সের পদক আর বাংলার খেলোয়াড়দের মধ্যে দূরত্ব যেন কয়েক আলোকবর্ষের। কারণ বাংলার ঘরে ব্যক্তিগত পর্যায়ের অলিম্পিক পদক নেই। লিয়েন্ডার পেজের নাম বাদ দিলে। বাংলার ক্রীড়াবিদরা কিছুটা হলেও আলোর বৃত্তে আসছিলেন কমনওয়েলথ গেমসেই। ২৪ বছর পরে সেই আলোও নিভে অন্ধকারে ডুবল বাংলার খেলা। চলতি শতাব্দীর সাত নম্বর কমনওয়েলথ গেমসে পদক জিততে পারলেন না বাংলার কোনও ক্রীড়াবিদ। ২০০২ সাল থেকে ২০২২ পর্যন্ত ছ’টা গেমসেই বাংলার খেলোয়াড়রা এক বা একাধিক পদক জিতেছিলেন। বাংলা থেকে অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড়ের সংখ্যাও ৮-১০ জন থাকতেন। এ বার সেখানে গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে ১২৫ জনের ভারতীয় টিমে বাংলার মুখ ছিলেন ৩ জন। দুই জিমন্যাস্ট প্রণতি নায়েক, প্রতিষ্ঠা সামন্ত আর প্যারা সুইমার আলি ইমাম। ‘এস-১৩’ ক্যাটেগরির ৫০ মিটার ফ্রি স্টাইলের ফাইনালেই উঠতে পারেননি আলি। প্রণতিও জিমন্যাস্টিক্সের ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ। আশার আলো দেখিয়েছিলেন প্রতিষ্ঠা। ভল্টের ফাইনালে উঠেও শেষ করেন সাত নম্বরে। চার বছর আগে বার্মিংহ্যাম কমনওয়েলথ গেমসের ওয়েটলিফ্টিংয়ের ৭৩ কেজিতে সোনা জিতেছিলেন বাংলার অচিন্ত্য শিউলি। চেন্নাইয়ের বাসিন্দা সৌরভ ঘোষাল দুটো ব্রোঞ্জ পেয়েছিলেন স্কোয়াশে। তার আগে গোল্ড কোয়েস্ট গেমসে বাংলার ঘরে সোনা এনেছিলেন মৌমা দাস, সুতীর্থা মুখোপাধ্যায়রা টেবল টেনিসের টিম ইভেন্টে। রুপো এ বার বাংলার ঘরে শুধুই শূন্যতা। শুটার মেহুলি ঘোষ, স্কোয়াশের ডাবলসে সৌরভ ঘোষাল। ২০১৪ সালের গেমসে সোনা ও রুপো এনেছিলেন ওয়েটলিস্টার সুখেন দে আর মুম্বই প্রবাসী বাঙালি শুটার অয়নিকা পাল। ব্রোঞ্জ পেয়েছিলেন প্যারা পাওয়ারলিস্টার সাকিনা খাতুন। ২০১০ সালে নয়াদিল্লির গেমস ছিল বাংলার ভাই-বোন জুটি দোলা ও রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তিরন্দাজির টিমে দোলা সোনা ও ব্যক্তিগত রিকার্ডে সোনা পেয়েছিলেন রাহুল। ছেলেদের টিমের ব্রোঞ্জ জয়েও ছিল রাহুলের অবদান। এই গেমসে টিটির ডাবলসে ব্রোঞ্জ পান মৌমা দাস-পৌলমী ঘটক জুটি। ডাবলসে ব্রোঞ্জ ছিল লিয়েন্ডারেরও। ২০০৬ সালে মেলবোর্নে ছেলেদের সোনা জয়ী টিমে ছিলেন সৌম্যদীপ রায়, শুভজিৎ সাহা। মেয়েদের ব্রোঞ্জ জয়ী টিমের সদস্য ছিলেন মৌমা, পৌলমী ও নন্দিতা সাহা। শতাব্দীর প্রথম গেমস ম্যানচেস্টারেও বাংলার ঘরে ব্রোঞ্জ এনেছিলেন টিটির সৌম্যদীপ, শুভজিৎ ও সৌরভ চক্রবর্তীর ভারত।




