RK NEWZ স্বাধীন দেশ হলে, একটা সঠিক পরিবেশ এবং পরিমণ্ডল তৈরি হবে। মানুষ নির্বিঘ্নে শ্বাস-প্রশ্বাস নেবে, হেসে কথা বলবে সকলের সঙ্গে, যেখান জাত-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতা এবং মনুষ্যত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। যেখানে সবাই একসঙ্গে উৎসবে মাতবে। স্বাধীনতা উৎসব পালন করা হত তখন। আমাদের এখানে একটা ক্লাব ছিল, জিমন্যাস্টিক ক্লাব। স্বাধীনতা উৎসবের দিন সাদা পোশাক পরে ক্লাবে যেতাম। ব্যান্ড বাজানো হত, বাঁশিতে বাজত দেশাত্মবোধক গানের সুর — ‘চল-চল-চল! ঊর্ধ্বগগনে বাজে মাদল, নিম্নে উতলা ধরণীতল…’। বড়রা ড্রাম বাজাতেন। গান হত। স্বাধীন ভারতের তেরঙা পতাকা তোলা হত। রংবেরঙের কাগজ দিয়ে সাজানো হত জায়গাটা। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ছবি খাকত, তাতে মালা দেওয়া হত, শ্রদ্ধা জানাতেন সকলে। লজেন্স, বিস্কুট দেওয়া হত। এ ছাড়া আর কোনও আড়ম্বর ছিল না। এটুকুই আনন্দ ছিল সেই সময়ে। কী যেন একটা হয়েছে দেশে, উৎসবে মেতেছে সবাই। এটাই ছিল শৈশবের অনুভূতি।
ধীরে ধীরে কৈশোরে পৌঁছোলাম। চেতনা হল। জানলাম কারা কারা স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। বাণিজ্য করতে এসে কী ভাবে ইংরেজরা শাসকের লাঠি হাতে তুলে নিল, কী ভাবে তারা আধিপত্য বিস্তার করল। কবিগুরুর ভাষায়, ‘বণিকের মানদণ্ড দেখা দিল, পোহালে শর্বরী রাজদণ্ডরূপে’। বড় হয়ে সে সব জেনে গায়ে কাঁটা দিত। স্বাধীনতার আরও কাহিনি জানলাম — চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের বিপ্লব — সবই জানতে পারলাম, তবে অনেক পরে। তখন বলিদানের কথা পড়ে মুগ্ধতা বেড়েছে। জাতির জনককে চিনলাম, তাঁর অবদান জানলাম, জানলাম তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। যত দিন গিয়েছে, পরিণত হয়েছি, এক-এক রকম উপলব্ধি হয়েছে। কোনটা সঠিক, কোনটা বেঠিক, তা জানতে মনটা ছটফট করত।
এখন মাঝেমধ্যে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি সত্যিই স্বাধীন? স্বাধীন হলে এগুলো কেন হচ্ছে? এখনও মনে হয়, যা দেখছি শুনছি চারিদিকে, স্বাধীনতার সবটা কি পেয়েছি? বাইরের জগতের ইতিহাস তো কিছুটা জানা যায়। একটা দেশ স্বাধীন হলে তাঁদের কী সুন্দর অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য, সাংস্কৃতিক স্বাচ্ছন্দ্য, মেলামেশা, খেলাধুলো — সবকিছু কত সুন্দর থাকার কথা। এত দিন হয়ে গেল স্বাধীনতার পর, কিন্তু এখনও মনে হয়, আমরা অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত। কৈশোরে এই ভাবনা আমায় পীড়িত করেনি। তখন সবে দানা বাঁধছে ভাবনা। সাম্রাজ্যবাদী পীড়ন, শোষণ, অনেক দেশেই হয়েছে। তার পর অনেকেই বিধ্বস্ত হয়েছে, দেশ ছেড়েছে। আমাদের মনে হয়, নিজের দেশেই আমরা পরাধীন হয়ে আছি। কেমন যেন মনে হয়, পিছিয়ে আছি। শৈশবের শান্তিপূর্ণ স্বাধীনতা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ার জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। স্বাধীনতার সুখ যে বয়সে বোঝার কথা, সেই বয়সে এসে মনে হল স্বাধীনতার আসল সুখটা পাইনি। সারাদেশে কোনও না কোনও অশান্তি তো চলছেই। মানুষ যা ভালবাসেন না, তা-ও চলছে। এমএলএ, এমপি হয়ে সকলেই ভাবেন, স্বাধীন ভাবে কাজ করবেন। মানুষ ঠিক করে দেন, কারা সমাজটা চালাবেন। কিন্তু যাঁরা নির্বাচিত হন, তাঁরা ভেবেই নেন, সারাজীবন তিনিই রাজা থাকবেন, তাঁর প্রজাদের নিয়ে চলবেন, জীবনযাপন করবেন। চলে লোভ, মিথ্যাচার। একটা সময় সহ্যের সীমা ছাড়ায়, কোথাও কোথাও তো তা-ই হয়। তবু এখনও মনে হয়, একটু অপেক্ষা করি। দেখা যাক কী হয়। আমাদের গণতন্ত্র রয়েছে, সংবিধান রয়েছে। ক্ষমতায় এসে দেশের দায়িত্ব নিয়ে তাঁরা যদি ভাবেন, তিনি যা বলবেন তা-ই হবে, নিয়মকানুন মানবেন না, মানুষ তখন সমালোচনা করবেনই। আর তা ছাড়া ইতিহাস পড়লেই তো বোঝা যায়, শেষপর্যন্ত তাঁদের পরিণতি কী হবে। সাধারণ মানুষের অনেকেই আবার সামলে চলেন, সমালোচনা করেন না, ভাবেন যদি সমস্যায় পড়েন। এটাও তো এক ধরনের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া।
স্বাধীনতা এমন সময় ৮০-তে পা রাখল যখন দেশজুড়ে ‘জেন জি’-‘জেন আলফা’ সম্প্রদায়ের মধ্যে এক তুমুল জাগরণ শুরু হয়েছে। কখনও কখনও মনে হচ্ছে যে, বেকারত্ব, দুর্নীতি, আর্থিক বৈষম্য ইত্যাদির বিরুদ্ধে এক প্রবল ক্ষোভ বিস্ফোরণের দ্বারপ্রান্তে যেন এসে দাঁড়িয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলিতেও অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক একই ধরনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখা গিয়েছে। প্রতিটি গণবিক্ষোভেই সংশ্লিষ্ট দেশের ‘জেন জি’ প্রজন্ম থেকেছে বড় ভূমিকায়। দিল্লির যন্তর মন্তর ও সদ্য ঝাড়খণ্ডের ‘জেন জি’ বিক্ষোভের পর ভারতে কিছুটা আলোড়ন তৈরি হয়েছে। ৮০ বছরে দাঁড়িয়ে থাকা গণতন্ত্র অবশ্যই অনেক পরিণত। ‘জেন জি’ বিক্ষোভে আমাদের প্রতিবেশী যে দেশগুলির রাষ্ট্রক্ষমতায় বড়সড় পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে তাদের কারও ক্ষেত্রেই গণতন্ত্র ৮০-তে পৌঁছয়নি। ফলে ‘জেন জি’ বিক্ষোভযদি ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ে তা হলেও ভারতের হাল প্রতিবেশী গণতন্ত্রগুলির মতো হবে না বলেই ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু ‘জেন জি’-র দাবিদাওয়া কোনওভাবে উপেক্ষা করার ঝুঁকি যে রাষ্ট্র নিতে রাজি নয় তা সম্প্রতি প্রত্যক্ষ করা গিয়েছে। সে-কারণেই শিক্ষামন্ত্রীকে দ্রুত পদত্যাগ করতে হয়েছে। স্বাধীনতার এত বছর পর বেকারত্বের প্রতিবাদে বা স্বচ্ছ পরীক্ষা ব্যবস্থার দাবিতে ‘জেন জি’-কে কেন পথে নামতে হবে, সেই প্রশ্ন ওঠাও অনিবার্য। উঠছেও। শুধু পরিণত গণতন্ত্র নিয়ে বড়াই করে লাভ নেই। এত কালের স্বাধীনতা কাঙিক্ষত ফল দিতে পারল কি না, তা দেখাও জরুরি।
স্থিতিশীল গণতন্ত্র ছাড়াও ৮০ বছরে যে দেশ সবক্ষেত্রে এগিয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক করার অবকাশ নেই। তবুও এ-বছর প্রত্যাশা অনেক বেশি। দেশে বেকারত্ব এক ভয়াবহ জায়গায়। আর্থিক উন্নতি অনেকটা তৈলাক্ত বাঁশে বাঁদরের মতো। কখনও দ্রুত আর্থিক প্রগতি ঘটছে, আবার কখনও সবকিছু ঝিমিয়ে পড়ছে। বেশ কয়েক বছর ধরে আর্থিক বৈষম্য ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলেছে। শিক্ষাব্যবস্থা ভয়ানক চ্যালেঞ্জের মুখে। এ বছরের স্বাধীনতা এসব চ্যালেঞ্জকে কীভাবে মোকাবিলা করবে, প্রশ্ন সেই জায়গায়।
সরকারি স্লোগান: স্বাধীনতার শতবর্ষে দেশ ‘বিকশিত’ হবে। উন্নয়নে দেশ প্রথম বিশ্বের সমকক্ষ হবে। দেশ দারিদ্রমুক্ত হবে। দেশের সমস্ত নাগরিকের হাতে কাজ থাকবে। প্রত্যেকের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুনিশ্চিত হবে। কিন্তু শুধু স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। সবার জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, পাকা বাড়ি, বিশুদ্ধ পানীয় জল ইত্যাদি কোনও কিছুই এত বছরে সুনিশ্চিত করা যায়নি।
মাত্র ২০ বছর দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ‘বিকশিত ভারত’ এই লক্ষ্যগুলিকে যে অর্জন করা যাবে, সেই গ্যারান্টি কে দেবে? ৮০ বছরে দাঁড়িয়ে এর জবাব খুঁজে নেওয়াই দেশের নাগরিকদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। ‘জেন জি’ হয়তো সেই উত্তরই খুঁজছে।




