RK NEWZ হানিট্র্যাপ করে হামিম-অর্পিতারা টাকা আদায় ও ব্ল্যাকমেল করার ছক কষছিল। পাকিস্তানের শেহজাদ ভাট্টি জঙ্গি সংগঠনের ধৃত সদস্য হামিম মণ্ডল ও তার ঝাড়খণ্ডের বান্ধবী অর্পিতা সরকারের সম্পর্ক নিয়েই উঠেছে প্রশ্ন। তবে দু’জন যে ঘনিষ্ঠ ছিল ও তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, সেই ব্যাপারে নিশ্চিত রাজ্য পুলিশের এসটিএফের গোয়েন্দারা। অর্পিতার সাহায্যে হানিট্র্যাপ করে হামিম তথা আইএসআই বা পাকিস্তানের শেহজাদ ভাট্টি জঙ্গিরা অপহরণ ও তোলাবাজিরও ছক কষেছিল। সেই সূত্রে প্রায় চার মাস ধরে হাওড়ার ওই মন্ত্রীর ছেলের সঙ্গে সোশাল মিডিয়ায় যোগাযোগ করে তাঁকে হানিট্র্যাপে ফেলে অর্পিতা। তাঁর ও বাবা মন্ত্রীর কাছ থেকে মোটা টাকা তোলাবাজি শুরু করে। মন্ত্রীর ছেলেকে টোপ দিয়ে একটি জায়গায় ডেকে হামিমদের দিয়ে অপহরণেরও ছক কষে অর্পিতা। তাঁকে পণবন্দি করেও মোটা টাকা আদায়ের ছক কষা হয়। এসটিএফের গোয়েন্দাদের ধারণা, শুধু ওই মন্ত্রীর ছেলেই নয়, আরও কয়েকজনকে হানিট্র্যাপ করে হামিম-অর্পিতারা টাকা আদায় ও ব্ল্যাকমেল করার ছক কষছিল। সেই ক্ষেত্রে হামিম মণ্ডলের মতো আরও কতজন জঙ্গি সদস্য রাজ্যে রয়েছে, গোয়েন্দারা তার সন্ধান চালাচ্ছেন। পাক হ্যান্ডলারদের ছক ছিল, হামিম ও অর্পিতাকে দিয়ে নেটওয়ার্ক তৈরি করা, কিছু টার্গেট শনাক্ত করা, সেই টার্গেটদের গতিবিধির উপর নজর রাখা। ঝাড়খণ্ডের সাহেবগঞ্জের বারহারোয়ায় থাকত অর্পিতা সরকার। সেখানে সে যাঁর সঙ্গে থাকত, তিনি অর্পিতার বন্ধু বলেই সে জানিয়েছে। মুর্শিদবাদের ফারাক্কা ব্লকের থেকে কিছুটা দূরে ফিডার ক্যানেলের পশ্চিমপাড়ে ঝাড়খণ্ডেই তার আসল বাড়ি। সেখানেই পড়াশোনা ও সে কলেজ থেকে স্নাতক হয় বলেও তার দাবি। ছোট থেকে মডেলিংয়ের শখ অর্পিতার। এলাকায় অত্যন্ত ‘স্মার্ট’ বলে পরিচিত অর্পিতার শখ ছিল বাইকেরও। বাইক চালিয়ে তাকে এলাকার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে দেখা যেত। অর্পিতারা দুই বোন। সে ছোট। তার দিদির বিয়ে হয়েছে। মা ছিলেন আইসিডিএস কর্মী। বাবা কৃষক। অর্পিতা সোশাল মিডিয়ায় খুবই সক্রিয়। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে রিল করত। সেই সূত্রেই বছর চারেক আগে ইনস্টাগ্রামে তার পরিচয় হয় হামিম মণ্ডলের সঙ্গে। হামিম নিজেকে হাওড়ার ব্যবসায়ী বলে পরিচয় দিত। ক্রমে তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। মোবাইল নম্বরের আদানপ্রদান হওয়ার পর হোয়াটস অ্যাপে চ্যাট। মুর্শিদাবাদে অর্পিতা এসে হামিমকে ডেকে নেয়। এরপর তারা দেখাও করে। ঘনিষ্ঠতা বাড়ে দু’জনের। প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। পুলিশ জেনেছে, ততদিনে হামিমের মগজধোলাই হয়েছে। ঘনিষ্ঠতার সময় সে অর্পিতাকে টাকার লোভ দেখিয়ে তারও মগজধোলাই করে। অর্পিতার কথা হামিম পাকিস্তানে তার হ্যান্ডলার রানা, হমার, আবিদদের হ্যান্ডেলেও জানায়। আইএসআই শেহজাদ ভাট্টি জঙ্গি সংগঠনের মাধ্যমে অর্পিতারও মগজধোলাই করা হয়, যাতে সে হানিট্র্যাপের কাজ করে। হানিট্র্যাপের কাজে তারা আরও কতজনকে কাজে লাগিয়েছে, তা জানার চেষ্টা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পহেলগাঁওয়ে হামলার পরে পাকিস্তানের চরদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিলেন হরিয়ানার নেটপ্রভাবী জ্যোতি মলহোত্র। পুলিশ সূত্রে খবর, সেই জ্যোতির মতো অর্পিতা সরকারকে দিয়েও চরচক্র তৈরির চিন্তাভাবনা ছিল পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের। হরিয়ানার নেটপ্রভাবীর মতো তিনিও এ রাজ্যের পুলিশ অফিসার, নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন বলে তদন্তকারীদের সূত্রে খবর। জঙ্গি-যোগে ধৃত হামিম মণ্ডলের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হলেও অর্পিতাকে আলাদা ভাবে কাজে লাগাতে চেয়েছিল পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা, দাবি তদন্তকারীদের। সেই মতো পরবর্তী কালে অর্পিতার সঙ্গে পাকিস্তানি গ্যাংস্টার শাহজ়াদ ভট্টি গোষ্ঠীর হ্যান্ডলারেরা, বিশেষ করে আবিদ জাট নিজেই যোগাযোগ রাখতেন। এনক্রিপটেড মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে নিয়মিত তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন অর্পিতা, এমনটাই বলছে তদন্তকারীদের সূত্র। হামিমের গ্রেফতারির পর শুক্রবার রাতে ঝাড়খণ্ডের সাহিবগঞ্জ থেকে পাকড়াও করা হয় ২২ বছরের অর্পিতাকে। বাজেয়াপ্ত করা হয় তাঁর দু’টি মোবাইলও। রাজ্যের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) সূত্রে খবর, ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমেই দু’জনের পরিচয় হয়েছিল। ধৃত হামিমের সঙ্গে বিদেশি ‘হস্টাইল এলিমেন্ট’ (সন্দেহভাজন পাকিস্তানি অপারেটিভ)-দের যোগাযোগ ছিল বলে অভিযোগ। তদন্তে উঠে এসেছে পাকিস্তানি গ্যাংস্টার ভট্টির দুষ্কৃতীদলের কথাও। তদন্তকারীদের সূত্রে খবর, হামিম এবং অর্পিতাকে দুবাইতে দেখা করতে ডেকেছিল ভট্টি গোষ্ঠীর হ্যান্ডলারেরা। কিন্তু হামিমের পাসপোর্ট না থাকায় তাঁদের দুবাই যাওয়া হয়নি। তদন্তকারীদের সূত্র বলছে, নেটপ্রভাবী অর্পিতাকে দিয়ে চরচক্র চালানোর পরিকল্পনা করেছিল আইএসআই। সেই মতো তাঁর প্রশিক্ষণ (গ্রুমিং) শুরু হয়েছিল। সূত্রের খবর, ভট্টির গ্যাংয়ের কথা অর্পিতাকে জানিয়েছিলেন হামিম। তিনি জানিয়েছিলেন, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের জন্য ওই গোষ্ঠী তাঁদের অস্ত্র সরবরাহ করবে। পরে অর্পিতাকে আলাদা ভাবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছিল আইএসআই, ভট্টির গোষ্ঠী, এমনটাই দাবি তদন্তকারীদের একটি সূত্রের। তদন্তকারীদের দাবি, সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছিলেন অর্পিতা। তিনি রাজ্য পুলিশের কয়েক জন সিনিয়র অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। কয়েক জন রাজনীতিক এবং তাঁদের সচিবদের সঙ্গেও পরিচয় করেছিলেন, যাতে তাঁদের মারফত গোপন খবর পাওয়া যায়। তদন্তকারীদের একাংশ মনে করেন, অর্পিতাকে জ্যোতির মতো করে গড়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। পহেলগাঁও কাণ্ডের পর ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাতের আবহে পাকিস্তানি গুপ্তচরদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগ ছিল জ্যোতির বিরুদ্ধে। এ দেশে প্রভাবশালীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন তিনি। তাঁর মাধ্যমে এ দেশের গোপন খবর আইএসআই হাতাত বলে অভিযোগ। সে রকম ভাবে অর্পিতাকেও ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল হ্যান্ডলারদের, বলছে সূত্র। হামিম আরও কয়েক জনকে নিয়োগ করেছিলেন, এ বার তাঁদেরও খোঁজ করছেন তদন্তকারীরা।
হামিম এবং অর্পিতাকে জেরা করে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি সন্দেহজনক সমাজমাধ্যম হ্যান্ডলের খোঁজ পেয়েছেন তদন্তকারীরা। উঠে এসেছে ‘রানা’, ‘উজ়েইর’, ‘আবিদ জাট৩৩৩’, ‘হামাদ’-এর মতো কিছু নাম। সবগুলিই পাকিস্তানি হ্যান্ডল বলে তদন্তকারীদের দাবি। সূত্রের খবর, এর মধ্যে ‘আবিদ জাট’ এবং ‘হামাদ’ নামে দু’জনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল অর্পিতারও। হামিমের সঙ্গে যে অর্পিতার ‘অ্যাফেয়ার’ ছিল, তা শনিবার বিকেলেই সাংবাদিক বৈঠকে জানিয়েছেন এসটিএফ-এর আইজি গৌরব শর্মা। গত কয়েক মাসে অর্পিতার মাধ্যমে হামিম বিভিন্ন ভাবে জাল ছড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন বলেও জানান এসটিএফ কর্তা। সূত্রের খবর, অর্পিতার মাধ্যমে ‘হানিট্র্যাপ’ করে অপহরণ এবং ‘টার্গেটেড অ্যাসাসিনেশন’ (‘শিকার’ বেছে নিয়ে খুন)-এর ছক কষা হয়েছিল।




