RK NEWZ স্বদেশ তাঁকে ঠাঁই দেয়নি। ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছিল। এ জন্মে আবার বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন বলে আর বিশ্বাস রাখেন না বিশ্বখ্যাত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। কিন্তু তাই বলে মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা, উদ্বেগ – এসব তো অনুভূতি উধাও হয়ে যায় না। যিনি যত সংবেদনশীল, তিনি তত বেশি যন্ত্রণাক্লিষ্ট। তসলিমা নাসরিনও তার ব্যতিক্রম নন। দূরে থেকেই প্রতি মুহূর্তে তাঁর চেতনায়, মনজুড়ে বসে আছে বাংলাদেশ। মৌলবাদের চাপে অন্ধকারাচ্ছন্ন স্বদেশ আজ কতটা এগোল? এই চিন্তা তাঁকে ঘিরে রাখে। তসলিমা এখন বসে তাঁর আরেক প্রিয় শহর কলকাতায়। রবিবার এখান থেকেই বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা বললেন। হিন্দু সন্ন্যাসী চিন্ময় প্রভু দীর্ঘদিন ধরে জেলবন্দি। বিশ্বের সমস্ত প্রগতিশীল মানুষের হয়ে তাঁর আবেদন, ‘চিন্ময় প্রভুর মুক্তি চাই।’ বাংলাদেশে সনাতন জাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র তথা হিন্দু সমাজের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের জেলবন্দির বিষয়টি অন্যতম কলঙ্কিত অধ্যায়। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের পর সেখানে সংখ্যালঘুরা বিপন্ন হয়ে পড়েন। অন্তর্বর্তী মহম্মদ ইউনুসের আমলে নিরাপত্তা প্রায় শিকেয় ওঠে। এমনই পরিস্থিতিতে সে বছরের নভেম্বর মাসে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে হত্যামামলার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় চিন্ময় প্রভুকে। দীর্ঘদিন বিনা বিচারে তিনি জেলবন্দি থাকেন। পরবর্তী সময়ে একাধিকবার জামিন খারিজ হয়। আরও মামলা চাপানো হয় তাঁর ঘাড়ে। বিচারের নামে প্রহসনের চূড়ান্ত নজির তৈরি হয় চিন্ময় প্রভুকে ঘিরে। এটি আন্তর্জাতিক মহলে তোলপাড় পড়ে যায়। চিন্ময় প্রভুকে নিয়ে আগেও তসলিমা মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন। আর কলকাতায় বসে বললেন, ‘‘ইউনুসের জমানা হোক বা আজকের তারেক রহমানের জমানা, অন্ধকার থেকে বাংলাদেশ বেরতে পারেনি। মৌলবাদীদের বাড়বাড়ন্ত এখনও আছে। এখনও নারীরা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। বাবার সম্পত্তির উপর তাঁদের অধিকার নেই। সংখ্যালঘু হিন্দুরা নিপীড়িত হচ্ছেন, তাঁদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নেই। বাংলাদেশের বাইরে ভারত বা পৃথিবীর যে কোনও দেশে যে কোনও প্রগতিশীল বাংলাদেশিদের হয়ে আমার দাবি, হিন্দু সন্ন্যাসী চিন্ময় প্রভুর মুক্তি চাই।” ২০২৪ সালে যে ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে হাসিনা সরকারের পতন ঘটেছিল, তাকে সাফল্য বলে বারবার মহিমান্বিত করা হলেও তসলিমা একমত নন। বাংলা অ্যাকাডেমির সাংবাদিক বৈঠকে তাঁর মত, ‘‘আমার মনে হয়, ছাত্র সমাজ আমাদের বোকা বানিয়েছিল। ওরা চেয়েছিল, কোটা উঠে যাক। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তো দেখলাম, ওরা নিজেদের ঐক্য রাখতে পারেনি। ভেঙে গিয়েছিল।”
“মাদ্রাসায় জঙ্গি তৈরি হয়”, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের এই মন্তব্যকেই কার্যত সমর্থন করলেন তসলিমা নাসরিন। রবিবার বাংলা অ্যাকাডেমিতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান, অনেক ক্ষেত্রে মাদ্রাসায় জেহাদি তৈরি হয়। কিছু কিছু মাদ্রাসা জেহাদি তৈরির কারখানা। মাদ্রাসাগুলিতে শিশু নির্যাতন, শিশু ধর্ষণ হয়। তাই এসব মাদ্রাসা থাকা উচিত নয়। এর পাশাপাশি অভিন্ন দেওয়ানি বিধির পক্ষেও সওয়াল করেন তসলিমা। তিনি বলেন, “অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চাই। যে কোনও সভ্য দেশে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রয়োজন। এক দেশ, এক আইন, সবার জন্য সমান আইন চাই।” ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান তিন দেশেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর পক্ষে কথা বলেন তসলিমা। ২০০২ সালে সীমান্ত এলাকার কিছু অনুমোদনহীন মাদ্রাসা নিয়ে রাজ্যের তৎকালীন মুখ্য়মন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বলেছিলেন, মাদ্রাসাগুলি জঙ্গি কার্যকলাপের আঁতুরঘর হয়ে উঠেছে। এই মন্তব্য নিয়ে বিতর্ক কম হয়নি। এবার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যকেই সমর্থন করলেন তসলিমা। তিনি জানান, বেশিরভাগ সময় মাদ্রাসাগুলিতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ছোটো থেকেই সেখানে অমুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ শেখানো হয়। সব সরকারই ধর্মান্ধদের ভোটের জন্য আপস করে। সেই কারণে মাদ্রাসাগুলিতে জেহাদিদের জন্ম হয়। তাই সব মাদ্রাগুলিতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। এই শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন দরকার বলেও মনে করেন তসলিমা। তসলিমার কথায়, “যে ধর্ম নারীকে যৌন দাসী হিসেবে গণ্য করে, আমি সেই ধর্মের সমালোচনা করি। সমালোচনা করতে হবে। সমালোচনা না করলে সংস্কার হবে না। আমি সমালোচনা করি বলে আমাকে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল।” তসলিমা স্পষ্ট করে দেন, তাঁর কোনও মন্তব্যের সঙ্গে রাজনীতির কোনও সম্পর্ক নেই। তিনি মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী। তাঁর কথায়, “আমি অনেক রাজ্যেই যাই। এই যেমন কেরলায় যাই, আমি কি সেই রাজ্যের রাজনীতির অংশ হয়ে যাই? কখনোই নয়। আমি আমার মতোই থাকি। কোনও সরকার আমাকে নিরাপত্তা দেয় কারণ নিরাপত্তা দেওয়া তাদের দায়িত্ব। এর সঙ্গে রাজনীতির কোনও যোগ নেই।”




