RK NEWZ গ্রেফতার করা হল মিনার মণ্ডলকে। অনুব্রত মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডলের আত্মীয় মিনারের বাড়ি থেকে বুধবারই সাড়ে ২৮ কোটি টাকা উদ্ধার হয়। পাওয়া যায় ১৫ কেজি সোনাও। তার পরে রাতভর চলে ‘সিজ়ার লিস্ট’ তৈরির কাজ। বৃহস্পতিবার সকালে ট্রাঙ্ক ভর্তি সেই টাকা এবং সোনা বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে যান তদন্তকারীরা। বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় মিনারকেও। বৃহস্পতিবারই তাঁকে সিউড়ি আদালতে হাজির করানো হবে। পুলিশ সূত্রে খবর, গত মঙ্গলবার মহম্মদবাজার থানার আধিকারিকেরা সাত জন ডাকাতকে গ্রেফতার করে। ওই ডাকাত দলের সূত্র ধরেই অনুব্রত-ঘনিষ্ঠের আত্মীয়ের বাড়িতে টাকা ও সোনার ‘খনির’ হদিস পান তদন্তকারীরা। সূত্রের খবর, অর্জুন লোহার, শেখ গিয়াসউদ্দিন, শেখ ফরজুদ্নি, পুলক সাহা, শেখ ফিরোজ আহমেদ, অভিনব ভাতসা এবং রবিকুমার গুপ্ত— এই সাত জনকে মঙ্গলবার ডাকাতির মামলায় গ্রেফতার করা হয়। বুধবার ধৃতদের দু’দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেয় সিউড়ি আদালত। ওই মামলার তদন্তের সূত্রেই মঙ্গলবারই গভীর রাতে মিনারের বাড়িতে হানা দেয় পুলিশ। সেই থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত চলে পুলিশি অভিযান। বুধবার রাতে বীরভূমের পুলিশ সুপার বিদীত রাজ বুন্দেশ জানান, মিনারের বাড়ি থেকে নগদ সাড়ে ২৮ কোটি টাকা উদ্ধার হয়েছে। সঙ্গে পাওয়া যায় প্রায় ১৫ কেজি সোনা। সেই থেকে রাতভর চলে ‘সিজার লিস্ট’ তৈরির কাজ। গোটা পর্ব মিনারের বাড়ি ঘিরে রেখেছিল পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী। বৃহস্পতিবার সকাল হতেই একের পর এক ট্রাঙ্ক নিয়ে বেরোন তদন্তকারীরা। বাড়ি থেকে বের করা হয় আলমারিও। মোট ছ’টি ট্রাঙ্ক এবং দু’টি আলমারি বের করা হয় অনুব্রত-ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীর আত্মীয়ের বাড়ি থেকে। সূত্রের খবর, এই ট্রাঙ্ক এবং আলমারিগুলির মধ্যেই লুকোনো ছিল নগদ টাকা এবং সোনা। মিনারের বাড়ির বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল পুলিশের ভ্যান। বাজেয়াপ্ত হওয়া ট্রাঙ্কগুলিকে পুলিশের ভ্যানে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। আলমারিগুলি তোলা হয় অপর একটি ছোট পণ্যবাহী গাড়িতে। তার পরে সেগুলি নিয়ে মহম্মদবাজার থেকে পুলিশ রওনা দেয় সিউড়ি ট্রেজারির উদ্দেশে।

অনুব্রত মণ্ডল ঘনিষ্ঠ ‘পাথরসম্রাট’ নাজিবুদ্দিন ওরফে টুলু মণ্ডলের ভগ্নিপতি(টুলুর পিসতুতো বোনের স্বামী)। একই সঙ্গে টুলুর টোল ব্যবসার ম্যানেজার। বুধবার ভোর থেকে তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ। তবে এলাকার মানুষ হোক বা পুলিশ, উদ্ধার হওয়া বিপুল টাকা যে মিনারের নয়, সে ব্যাপারে সকলেই এক মত। তা হলে টাকা কার? রাতে বীরভূমের পুলিশ সুপার বিদীত রাজ বুন্দেশ জানান, ওই টাকা টুলুরই। এ দিন দিনভর টুলুর খোঁজ পায়নি পুলিশ। আমরাও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। কিন্তু উদ্ধার হওয়া এই বিপুল টাকার সঙ্গে কেন জড়িয়ে গেল টুলুর নাম? এই কোটি কোটি টাকা, কেজি কেজি সোনার উৎসই বা কী? বীরভূমের মিনার মণ্ডলের বাড়ির আনাচকানাচ থেকে বেরিয়েছে থরে থরে নোট। এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত, উত্তরবঙ্গ রাজ্য পরিবহণ নিগমের বাসচালকের চাকরি থেকে ইস্তফা দেওয়া মিনারের বাড়ি থেকে উদ্ধার হয়েছে ২৮.৫ কোটি টাকা এবং ১৫ কিলোগ্রাম সোনার বাট। পুলিশ সূত্রে খবর, টাকা গোনা চলছে। অনুব্রত মণ্ডল ঘনিষ্ঠ পাথর ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডলের ম্যানেজার তথা আত্মীয়ের বাড়ি থেকে উদ্ধার কোটি কোটি টাকা! খোঁজ বিপুল সোনার। বুধবার রাত পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, টুলু মণ্ডলের ম্যানেজার মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে ১৫ কেজি সোনা এবং নগদ সাড়ে ২৮ কোটি টাকা উদ্ধার হয়েছে। গোটা ঘটনার সঙ্গে সরাসরি টুলু মণ্ডলের নাম জড়িয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, পাথর ব্যবসার আড়ালে বড়সড় কোনও দুর্নীতি রয়েছে! আর তারই টাকা মিনারের বাড়িতে লুকানো ছিল? কিন্তু কে এই মিনার মণ্ডল?

যে মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে এই বিপুল অর্থ উদ্ধার হল, তাকে কার্যত চিনতেনই না থানার পুলিশ কর্মীদের থেকে শুরু করে স্থানীয় পাথর ব্যবসায়ীদের একটা বড় অংশও৷ টুলু মণ্ডলের একজন সাধারণ কর্মচারী হিসাবেই এলাকায় পরিচিত ছিলেন তিনি৷ ছেলের ভাল চাকরি, মেয়েরও বিয়ে হয় এক শিক্ষকের সঙ্গে৷ সব মিলিয়ে এলাকায় ‘ক্লিন ইমেজ’ ছিল মিনারের৷ তবে মিনারের উত্থানের কাহিনী বেশ চমকপ্রদ! স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, কিছু বছর আগে পর্যন্তও উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থায় বাসের চালকের কাজ করতেন মনির মণ্ডল। কিন্তু বছর চারেক আগে সেই সরকারি কাজ থেকে স্বেচ্ছাবসর নিয়ে টুলু মণ্ডলের ব্যবসার কাজ দেখাশোনাতেই মন দেন তিনি। জানা গিয়েছে, টুলু মণ্ডল ইজারা নিয়ে যে কয়েকটি ডিসিআর (ডুপ্লিকেট চালান রিসিপ্ট) গেট চালাতেন, তারই মধ্যে রায়পুরের ডিসিআর গেটের দেখভাল করতেন মিনার। মহম্মদবাজার থানা এলাকার ডেউচা বাস স্ট্যান্ডের পাশেই তাঁর দোতলা বাড়ি আকারে বেশ বড় হলেও আলাদা করে বিশেষ নজরে পড়ে এমনটা নয়! জাতীয় সড়কের পাশে থাকা বাড়ির সামনের রাস্তাটুকুর দশাও বেহাল। গত চার বছরের মধ্যে ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল মনির। রাতারাতি বদলে যায় ঠাটবাট। স্থানীয় বাসিন্দা শিবলাল সোরেন বলেন, “গত কয়েক বছরে হালচাল বদলে গিয়েছিল মিনার মণ্ডলের৷ হাতে টাকা এল যেমন বদল আসে, ঠিক তেমনই! তবে ওঁর বাড়ি থেকে এত কোটি কোটি টাকা উদ্ধার হবে আমরাও ভাবিনি৷ মহম্মদবাজারের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় আদিবাসীরা বঞ্চিতই থেকেছে আর তাদের হকের টাকা লুঠ করেছে এই ধরণের লোকেরা।” স্থানীয়দের থেকে শুরু করে বিজেপির নেতা সকলেরই দাবি, এই টাকা মিনারের বাড়িতে থাকলেও টাকার আসল মালিক টুলু মণ্ডলই। তৃণমূল আমলে বীরভূম জেলায় বেআইনি পাথর ও বালির ব্যবসার বেতাজ বাদশা হয়ে উঠেছিলেন টুলু মণ্ডল। নকল ডিসিআর (ডুপ্লিকেট চালান রিসিপ্ট) বানিয়ে দৈনিক কয়েক কোটি টাকা রোজগার করতেন তিনি। সেই টাকার ভাগ তৃণমূল আমলে দলের জেলা থেকে রাজ্য নেতৃত্ব পর্যন্ত সব জায়গাতেই পৌঁছে যেত বলেও অভিযোগ। বিধানসভা ভোটের আগে নিউটাউনে একটি গাড়ি থেকে ৫ কোটি টাকা উদ্ধার করে এসটিএফ, সেই ঘটনাতেও নাম জড়িয়েছিল টুলু মণ্ডলের। ২০২২ সালে একটি খুনের মামলায় টুলু মণ্ডলকে গ্রেফতারও করে মহম্মদবাজার থানার পুলিশ। খুন, হুমকি, অস্ত্র প্রদর্শন, ঝামেলায় উস্কানি সহ একাধিক ধারায় তার বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়। মাস খানেক জেল হেফাজতে থাকার পর এই মামলায় জামিন পান টুলু। বছর দুয়েক আগে বলিউডের তারকাদের উপস্থিতিতে সিউড়িতে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে টুলু মণ্ডলের মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানও অনেকেরই নজর কেড়েছিল। যা নিয়ে সরব হয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী সহ অনেকেই। মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে সেই টুলু মণ্ডলের বিশাল বেআইনি টাকার ভাণ্ডারের ছিটেফোঁটারই হদিশ মিলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

বীরভূম জেলায় টুলুর পরিচয়— ‘পাথরসম্রাট’। পিছনে অনেকেই বলেন, ‘পাথর মাফিয়া’। মহম্মদবাজার থেকে শুরু করে মুরারই, নলহাটির বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে থাকা ব্যাসল্ট পাথরের খনি থেকে গোটা রাজ্যে, ভিন্রাজ্য বা বাংলাদেশেও যে পাথর (নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত কালো স্টোনচিপ) সরবরাহ হয়, গোটাটাই নাকি নিয়ন্ত্রণ করেন টুলু। খনি থেকে পাথর প্রথমে আসে ক্রাশারে, যেখানে বড় বড় পাথরের টুকরো বিভিন্ন মাপে ভাঙা হয়। ক্রাশার থেকে লরি ভর্তি হয়ে সেই পাথর যায় বিভিন্ন জায়গায়। আর ক্রাশার থেকে লরি বেরোনোর চাবিকাঠি (ডুপ্লিকেট কার্বন রিসিট বা ডিসিআর)-এর মালিক টুলু। সোজা কথায় টুলুকে এড়িয়ে একটা লরিও ক্রাশার থেকে পাথর নিয়ে যেতে পারে না। ব্যাসল্ট পাথরের খনির সুবাদে ঝাড়খণ্ড লাগোয়া সাৎশোল গ্রামের রাস্তায় শ’য়ে শ’য়ে লরির ভিড়। এলাকার চাষি পরিবারের ছেলেরাও ভিড় জমাচ্ছে ক্রাশারে, পাথর খনিতে— রোজগারের আশায়। পাঁচামি স্টোন কোয়ারি সংগঠনের এক প্রবীণ সদস্যের কথায়, ‘‘ওই যুবকদের ভিড়ে ছিল টুলুও। সময়টা ২০০০ সাল। প্রথম দিকে দিনমজুর হিসেবে ক্রাশারে আসা লরিতে পাথর বোঝাই করত টুলু।’’ তবে বেশি দিন সেই কাজ করেননি। লরিচালকদের সঙ্গে চুক্তি করে লরিতে পাথর বোঝাই করার বরাত নেওয়া শুরু করেন। মূলধন ছাড়া ব্যবসা। সেই মুনাফার টাকাতেই ২০১০ সালের মধ্যে কিনে ফেলেন পুরনো একটা লরি। সেই লরিতে শুরু হয় পাথর সরবরাহ। বছর কয়েকের মধ্যে আরও দুটো পুরনো লরি কিনে টুলু হয়ে ওঠেন ছোটখাটো পাথর ব্যবসায়ী। পাঁচামি স্টোন কোয়ারি অ্যাসোসিয়েশনের আরও এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘‘টুলুর ভাগ্য বদলে গেল ২০১৬ সালের পর থেকে। যখন থেকে পাথর খাদানে ডিসিআর কাটার নিয়ম চালু হল।’’ বাম আমলে স্টোন কোয়ারি বা পাথর খনি যিনি লিজ নিয়েছেন তাঁর কাছ থেকেই রাজ্য সরাসরি শুল্ক আদায় করত। শুল্ক সংগ্রহ করা হত ভূমি রাজস্ব দফতর। ক্রাশার থেকে পাথর বোঝাই লরি নিয়ে যাওয়ার সময় আর এক দফা বাণিজ্যিক কর আদায় করত স্থানীয় ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত। তাদের দেওয়া চালান সমস্ত লরিতে থাকা বাধ্যতামূলক ছিল। তৃণমূল আমলে এর সঙ্গে যুক্ত হল টন-পিছু বা কিউবিক মিটার-পিছু আরও একটি শুল্ক। ভূমিরাজস্ব দফতর সেই কর আদায় করত। ২০১৬ সালে দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় এসে টোল গেট দেখভালের দায়িত্ব বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেয় তৃণমূল। উদ্দেশ্য, কোনও লরি শুল্ক ফাঁকি দিয়ে চলে যাচ্ছে কিনা, সে দিকে নজরদারি করা। বীরভূমের পাথর ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, এই পরিকল্পনার পিছনে ছিলেন রাজ্যের এক আমলা, যিনি এক সময় বীরভূমের জেলাশাসক হিসেবে কাজ করেছেন। কোন সংস্থা টোল গেট পরিচালনার দায়িত্ব পাবে তা ঠিক করতে টেন্ডার ডাকা হয়। কিন্তু সরষের ভিতরে ভূত ঢুকতে দেরি হয়নি।

আপাত ভাবে নয়া শুল্ক নীতিতে দুর্নীতির আভাস পাওয়া কঠিন। রাজ্যের কোষাগার ভরানোর জন্যই এই সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, টেন্ডার প্রক্রিয়াতেই স্বচ্ছতার অভাব। বীরভূমে সেই সময় অনুব্রত মণ্ডলই শেষ কথা। সাৎশোলের পাথর ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, অনুব্রত মণ্ডলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদেই টোল গেট পরিচালনার দায়িত্ব পান টুলু। শুরুতে বাড়ির এলাকা সাৎশোলের টোলগেটের। পরে ওই এলাকার আরও ছ’টি টোলগেটের। সেখান থেকেই তাঁর ফুলে ফেঁপে ওঠা। অভিযোগ, শাসক নেতাদের সক্রিয় মদতে তৈরি হতে থাকে জাল ডিসিআর। অর্থাৎ লরি থেকে নিয়মমতো শুল্ক নিয়ে যে ডিসিআর চালকের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হতো, সেটা নকল। এই জালিয়াতির পিছনে ভূমিরাজস্ব দফতরের কর্মীদেরও ভূমিকা রয়েছে বলে তদন্তকারীদের ধারণা। দু’পক্ষের যোগসাজশে কার্যত লুট হতে থাকে কোটি কোটি টাকা। এক পাথর ব্যবসায়ী জানাচ্ছেন, যখন এই টোল চালু হয়, তখন টন প্রতি ১০০ টাকা করে নেওয়া হত। বাড়তে বাড়তে যা এখন টন প্রতি ২৫০ টাকা। ক্রাশার থেকে মূলত ১৬ বা ১৮ চাকার লরি পাথর পরিবহণ করে। প্রথম ধরনের লরির নিয়মমাফিক (ওভার লোডিং না করলে) বহনক্ষমতা ৩২ টন, দ্বিতীয় ধরনের লরির ৪০ টন। অর্থাৎ লরি প্রতি শুল্ক ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। দিনে গড়ে ৩ হাজার লরি পাথর পরিবহণ করে ওই এলাকায়। অর্থাৎ সরকারের কোষাগারে প্রতিদিন অন্তত আড়াই কোটি টাকা শুল্ক জমা পড়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তার ১০ শতাংশও জমা পড়ত না। ডিসিআর নকল করে বাকি টাকা চলে যেত টুলুর কাছে। সেখান থেকে অন্যত্র। তৃণমূলের বিভিন্ন স্তরের নেতারা ওই টাকার ভাগ পেতেন বলে বিজেপির অভিযোগ। ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই বিজেপি নেতারা এ নিয়ে সরব। ক্ষমতায় আসার পরেই, বেসরকারি হাতে টোল গেট নিয়ন্ত্রণ হওয়া বন্ধ করে দেয় বিজেপি। ভূমিরাজস্ব, পরিবহণ দফতর-সহ সরকারের চারটি দফতরের আধিকারিকদের সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ১৭ মে থেকে চালু হয়েছে নতুন পদ্ধতি। সরকারি নথি বলছে, বিগত সরকারের আমলে ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ১৯ লক্ষ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে ডিসিআর থেকে। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন রাজস্বের পরিমাণ গড়ে ৭০ লাখ। আর নতুন সরকারের আমলে ১৭ মে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ কোটি ২০ লক্ষ টাকা। পরের দিন আদায়ের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ২ কোটি ৩০ লক্ষ। সিউড়ির বিধায়ক এবং রাজ্যের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ‘‘দিনে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত শুল্ক আদায় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’’ বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও ডিসিআর দুর্নীতির উল্লেখ করে মাসে ১০০ কোটি শুল্ক আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা রেখেছেন। জগন্নাথের দাবি, বিগত সরকারের আমলে কমপক্ষে ১০ হাজার কোটি টাকার ডিসিআর দুর্নীতি হয়েছে।

টুলুর আত্মীয়ের বাড়ি তল্লাশি চলাকালীন উদ্ধার হওয়া টাকা এবং সোনার ছবি এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করে মুখ্যমন্ত্রী টুলুকে ‘বালি মাফিয়া’ বলেছেন। কারণ, পাথরের পাশাপাশি বালির ব্যবসাও ছিল টুলুর। গরুপাচার মামলায় অনুব্রত গ্রেফতার হওয়ার পরে টুলুর নামও ভেসে উঠেছিল। তবে সিবিআই আধিকারিকদের ইঙ্গিত, পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণের অভাবে সে যাত্রা রেহাই পান টুলু। তখনও পর্যন্ত টুলু ওরফে মহম্মদ নাজিবুদ্দিন মণ্ডল স্টোন প্রোডাক্টস্ প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি সংস্থার ডিরেক্টর। অনুব্রত গ্রেফতার হওয়ার পরে, স্ত্রী এবং মেয়েকে ডিরেক্টর করে ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে আরও চারটি নতুন কোম্পানি খোলেন তিনি। সিবিআই বা ইডির মতো কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা, যাঁরা আগে টুলুকে নিয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান করেছিলেন, তাঁদের মতে, বিভিন্ন কোম্পানি খুলে বিপুল বেআইনি অর্থ সরাতে থাকেন টুলু। সরকার বদলের পর চাপ বাড়তে থাকে টুলুর উপর। ২৩ মে মহম্মদবাজার থানায় দুর্গাপুরের রাজু মণ্ডল নামে এক ব্যবসায়ী টুলুর বিরুদ্ধে লরি আটকে রাখার অভিযোগ দায়ের করেন। ৩ জুলাই তিনি ফের অভিযোগ করেন যে, টুলু তাঁকে অভিযোগ তুলে নিতে বলে হুমকি দিচ্ছেন। ঠিক তার পরের দিন ভূমিরাজস্ব দফতর টুলুর বিরুদ্ধে বেআইনি বালি পাচারের অভিযোগ দায়ের করে মহম্মদবাজার থানায়। উদ্ধার হয় ৩ লক্ষ কিউবিক ফুটের বেশি অবৈধ ভাবে তোলা বালি। সবটাই পাওয়া যায় টুলুর জমি থেকে। বুধবার রাজ্য পুলিশের তল্লাশির পর টুলু যে ফের ইডির মতো কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থারও তদন্তের বিষয় হয়ে উঠবেন, সেই ইঙ্গিত মিলেছে। আর টুলু থেকে শুরু করে তদন্তের শাখাপ্রশাখা আরও অনেক দূর যাবে বলেই ইঙ্গিত রাজ্য পুলিশের।




