মোহনবাগান: ১ (সাহাল) ইস্টবেঙ্গল: ০
RK NEWZ ভারতীয় ফুটবলে প্রত্যাবর্তন হল চিরপরিচিত কলকাতা ডার্বি দিয়ে। কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গণে শুরু হল ১৩৫ তম ডুরান্ড কাপ। উদ্বোধনে এসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ। প্রথম ম্যাচেই মুখোমুখি মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল। আর বিশ্বকাপের মতোই ডুরান্ডের প্রথম ম্যাচও বিতর্কমুক্ত হল না। প্রথমার্ধের ফলাফল গোলশূন্য। তবে ২৪ মিনিটে সবুজ-মেরুনের একটি পেনাল্টির আবেদনে কানে তোলেননি রেফারি। বক্সের মধ্যে লাল-হলুদের জিকসন সিংয়ের হাতে বল লাগলেও পেনাল্টি দেওয়া হয়নি। যুবভারতীতে বলে কিক মেরে ডুরান্ডের আনুষ্ঠানিক শুভ সূচনা করেন ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ। ডুরান্ড কমিটির কর্তাব্যক্তিরা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন মানিকতলার বিধায়ক তাপস রায়। এবার ক্রীড়ামন্ত্রীর উদ্বোগে পেপারলেস টিকিটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্টেডিয়ামে জলের সমস্যা নিয়েও অভিযোগ বহুদিনের। সেই বিষয়েও আশ্বাস দিয়েছিলেন ক্রীড়ামন্ত্রী। এদিন স্টেডিয়ামের র্যাম্পের বাইরে পরিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা ছিল। ম্যাচের প্রথমার্ধেই বিতর্ক। ২৪ মিনিটে ইস্টবেঙ্গল বক্সের মধ্যে ঢুকে পড়েছিলেন মোহনবাগানের সাহাল আবদুল সামাদ। তাঁর জোরাল শট লাল-হলুদের জিকসন সিংয়ের হাতে লাগে। সাহাল আবেদন জানালেও রেফারি কর্ণপাত করেননি। গোলমুখী শটে রেফারি পেনাল্টি দিতেও পারতেন। আবার অনেকের যুক্তি, জিকসনের হাত শরীরের সঙ্গে লেগে ছিল। শটের জোরে জিকসনের হাত শরীর থেকে ছিটকে যায়। ফলে মরশুমের প্রথম ডার্বির প্রথমার্ধেই বিতর্কের শুরু। যুবভারতীতে ডার্বিতে দু’দলই বিদেশিহীন প্রথম একাদশ সাজিয়ে ছিল। দুই নতুন কোচ মোহনবাগানের প্যানাজিওটিস দিলম্পেরিস ও ইস্টবেঙ্গলের আন্তোনিও হাবাসের কাছে প্রস্তুতির খুব বেশি সময় ছিল না। ম্যাচে সেটা বোঝাও যাচ্ছিল। দুই দলের খেলাতেই সেটার ছাপ স্পষ্ট। ফিটনেস ও তালমিলের অভাব বেশ ভালোমতোই বোঝা যাচ্ছিল। বল পজেশন বা গোলমুখী আক্রমণে মোহনবাগান এগিয়ে ছিল। তবে খুব বিপজ্জনক পরিস্থিতি কোনও দলই তৈরি করতে পারেনি। গোল করার লোকের অভাব দু’দলেই। তবু প্রথমার্ধে বিতর্কের কমতি ছিল না। ২৪ মিনিটে ইস্টবেঙ্গল বক্সের মধ্যে ঢুকে পড়েছিলেন মোহনবাগানের সাহাল আবদুল সামাদ। তাঁর জোরাল শট লাল-হলুদের জিকসন সিংয়ের হাতে লাগে। সাহাল আবেদন জানালেও রেফারি কর্ণপাত করেননি। ম্যাচের বয়স তখন ৫২ মিনিট। ইস্টবেঙ্গল রক্ষণ বল বিপন্মুক্ত করতে ঝুঁকি নিয়েছিল। সেই সুযোগে বক্সের মধ্যে ঢুকে কিয়ান নাসিরি। ডানদিক থেকে তাঁর বল কভার করেন মনবীর সিং। সেখান থেকে যখন সেকেন্ড বারে বল আসে, তখন সাহালের সামনে ফাঁকা গোল। সেই সুযোগ নিতে বিন্দুমাত্র ভুল করেননি সাহাল। ফাঁকা জালে বল জড়িয়ে দেন। ইস্টবেঙ্গল গোলটাই পেল না। এই প্রথমবার ডার্বিতে হারলেন হাবাস। এর আগে সবুজ-মেরুন ডাগআউট থেকে জয়ের সাক্ষী ছিলেন। পালাবদলে লাভ হল না হাবাসের। বরং প্রথম ডার্বিতেই জয়ের স্বাদ পেলেন প্যানোস। সেই সঙ্গে ডুরান্ডের পরের রাউন্ডের দিকেও এক পা বাড়িয়ে রাখল মোহনবাগান।

মোহনবাগানকে তুলনায় ভাল দেখালেও দু’দলের খেলাতেই প্রস্তুতির অভাব স্পষ্ট। দু’দলেরই প্রস্তুতি শুরু হয়েছে কয়েক দিন আগে। প্রাক মরসুম প্রস্তুতির কোনও সুযোগ নেই। কোচেরা এখনও ফুটবলারদের বুঝে উঠতে পারেননি। এই অবস্থায় দল নামাতে হয়েছে ডুরান্ড কাপে। ফুটবলারদের মধ্যে বোঝাপড়া তৈরি হয়নি। দু’দলের ফুটবলারেরাই অসংখ্য মিস পাস করেছেন। পায়ে বল পাওয়ার পর সতীর্থদের খুঁজতে হয়েছে। কাকে বল দেবেন বুঝতে পারছিলেন না ফুটবলারেরা। বেশ কিছু ফুটবলার নতুন হওয়ায় এই সমস্যা বেশি হয়েছে ইস্টবেঙ্গলের। দু’দলেরই ফিটনেসের মান অত্যন্ত খারাপ। ৩০-৩৫ মিনিট খেলার পরই হাঁপাতে শুরু করেছেন ফুটবলারেরা। দায়সারা মনোভাব চোখে পড়েছে একাধিক ফুটবলারের মধ্যে। কোনও দলের খেলাতেই পরিকল্পনা চোখে পড়েনি। ভাল ফুটবলের জন্য প্রয়োজন ভাল মাঠ। যুবভারতীর মাঠের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। বড় ঘাস এবং অসমান মাঠ সমস্যায় ফেলেছে ফুটবলারদের। দৌড়তে গিয়ে সমস্যায় পড়েছেন। মাটিতে পড়ে গিয়েছেন কেউ কেউ। মরসুমের শুরুতে চোট পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়েই যতটা সম্ভব খেলার চেষ্টা করেছেন দু’দলের ফুটবলারেরা। কলকাতা ডার্বি এখনও ভারতীয় ফুটবলের সেরা আকর্ষণ। ভাল মানের খেলার জন্য প্রয়োজন ঠিকঠাক প্রস্তুতি এবং ভারসাম্যযুক্ত দল। ডুরান্ড কাপের আয়োজকদের সম্ভবত এ সব নিয়ে ভাবনা নেই। দু’দলকে লড়িয়ে দিতে পারলেই হল। মানুষের আবেগ উস্কে দেওয়াই যেন আসল লক্ষ্য। সূচি নিয়ে ক্লাবগুলির সঙ্গে আলোচনা করা হয় না। যথেষ্ট আগে থেকে প্রতিযোগিতা শুরুর দিনক্ষণ জানানো হয় না। ক্লাবগুলি থাকে অন্ধকারে। দল গঠনের কাজ শেষ হওয়ার আগেই প্রতিযোগিতা খেলতে নেমে পড়তে হয়। এ ভাবে পাড়ার ফুটবলও ভাল হয় না।

দু’জনেরই কোচিং শুরু হয়েছে ডার্বি দিয়ে। ডুরান্ড কাপের ডার্বিতে ইস্টবেঙ্গলকে হারিয়েছে মোহনবাগান। খেলা শেষে দুই কোচের উপলব্ধি দু’রকম। প্রথম বার কলকাতার কোনও দলের দায়িত্ব নিয়েছেন পানাজিয়োটিস দিমপেরিস। আর শুরুই হয়েছে ডার্বি জিতে। সবুজ-মেরুন ভক্তেরা খুশি। বিশেষ করে গত মরশুমে ইস্টবেঙ্গলের কাছে আইএসএল ট্রফি হারানোর পর এই মরশুমের শুরুটা জয় দিয়ে শুরু না হলে চাপ আরও বাড়ত। কিন্তু খুশি নন কোচ। খেলা শেষে দিমপেরিস জানিয়েছেন, জিতলেও দলের খেলা খুশি করতে পারেনি তাঁকে। কোচ বলেন, “আমাদের হাতে প্রস্তুতির সময় খুব বেশি ছিল না। তাই ভাল ফুটবল খেলতেও পারিনি। অবশ্য ৬০ মিনিট পর্যন্ত আমরা দাপট দেখিয়েছি। তার পরে হঠাৎ হারিয়ে গিয়েছি। তবে শেষ পর্যন্ত একটা কঠিন ম্যাচ জিতেছি।” ৬০ মিনিটের পর ফুটবলারেরা কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন বলে স্বীকার করে নিয়েছেন দিমপেরিস। তিনি বলেন, “এমন নয় যে ইচ্ছা করে রক্ষণাত্মক খেলিয়েছি। তখন ফুটবলারেরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তাই এ রকম খেলাতে হয়েছে। তবে এখনও অনেক সময় আছে। পরের ম্যাচ থেকে এই দলটাকেই অনেক শক্তিশালী দেখাবে।” এখন দলের অনেক উন্নতি প্রয়োজন বলে মনে করেন দিমপেরিস। তিনি বলেন, “সব বিভাগেই উন্নতি করতে হবে। আমি তো এখানে রাজনীতি করতে আসিনি। আমার কাছে ফুটবল একটা ধর্ম। এই দলের সমর্থক প্রচুর। তাঁদের অনেক আশা রয়েছে। সেই আশা পূরণের জন্য আমাদের আরও উন্নতি করতে হবে।” যাঁর করা একমাত্র গোলে মোহনবাগান জিতেছে সেই সাহাল আব্দুল সামাদ তাঁর গোল উৎসর্গ করেছেন স্ত্রীকে। তিনিও জানিয়েছেন, এখনও অনেক উন্নতি প্রয়োজন। সাহাল বলেন, “দলে অনেক নতুন ফুটবলার এসেছে। কোচও নতুন। তাই বোঝাপড়া হতে একটু সময় লাগবে। আমাদের আরও উন্নতি করতে হবে।” একটি দল হিসাবে খেলে ট্রফি জিততে চান সাহাল। তিনি বলেন, “কোচ প্রথম দিনই বলেছেন, সব ম্যাচই ডার্বি। তাই সে ভাবেই প্রস্তুতি নিতে হবে। একসঙ্গে খেলব। একটা দল হয়ে একের পর এক ম্যাচ জিতব। এটাই আমাদের স্বপ্ন।” ইস্টবেঙ্গলের কোচ আন্তোনিয়ো হাবাস ভারতীয় ফুটবলে পরিচিত নাম। তবে এর আগে তিনি ছিলেন মোহনবাগানের দায়িত্বে। এ বার ইস্টবেঙ্গল তাঁর উপর ভরসা দেখিয়েছে। ডার্বি হারলেও দলের খেলায় খুশি হাবাস। তিনি বলেন, “আমি তো এখনও কাউকে তেমন ভাবে চিনিই না। বিদেশিরা একটা সেশন অনুশীলন করেছে। খেলার ফলাফলে আমি সন্তুষ্ট না হলেও যে ভাবে সকলে লড়াই করেছে তাতে খুশি। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে আমরা সাত থেকে আটটা সুযোগ তৈরি করেছি। গোল করতে পারিনি। ওরা সেটা করেছে বলে জিতেছে।” পুরনো ছাত্র বিশাল কাইথের পারফরম্যান্সে খুশি হাবাস। বিশাল না থাকলে হয়তো শেষ পর্যন্ত জিতে মাঠ ছাড়ত ইস্টবেঙ্গল। তবে আর এক পুরনো ছাত্র শুভাশিস বসুকে হলুদ কার্ড দেখানো মানতে পারছেন না হাবাস। লাল-হলুদ কোচের মতে, শুভাশিসকে লাল কার্ড দেখানো উচিত ছিল। হাবাস জানিয়েছেন, সোমবার ইস্টবেঙ্গলের আর এক বিদেশি চলে আসবেন। তা হলে তাঁর দল আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।




