RK NEWZ রাজনীতি থেকে শতহস্ত দূরে থাকা এই জ়েন-জ়ি-দের হাতের পোস্টারেও নেই পরিচিত রাজনীতির ছোঁয়া। কারুর হাতের পোস্টারে লেখা, ‘‘এরর ৪০৪, অ্যাকাউন্টিবিলিটি নট ফাউন্ড’। আবার কেউ লিখেছেন, ‘মেলোনিজি, হাম বরবাদ হো গয়ে। আপ মত হোনা। প্লিজ ব্রেক আপ কর লো।’ শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টে। শহর কলকাতার প্রাণকেন্দ্রের অন্যতম ব্যস্ত ডোরিনা ক্রসিং তত ক্ষণে মেলার চেহারা নিয়েছে। কোথাও গান চলছে, কোথাও আবার অনেকে মিলে গোল হয়ে বসে গল্প করছেন। আবার কোথাও চলছে নিখাদ হুল্লোড়। পাশেই দেখা যাচ্ছে মোবাইল নিয়ে ছবি তোলার হিড়িক! সৌজন্যে ‘আরশোলা’র দল। দিল্লি, মুম্বই, পটনার পর কলকাতার রাজপথের দখল নিল ‘ককরোচ’রা। প্রায় এক ডজন বাম .ছাত্র সংগঠনের চেনা ‘ধর্মতলা চলো’ আন্দোলনের ছবিটা বদলে গেল সঙ্গী আরশোলাদের ‘যেমন খুশি চলা’র দাপটে। এদের অনেকের কৈশোর কাটেনি। কেউ কেউ সদ্য কলেজের গণ্ডি পেরিয়েছেন। মধ্য কলকাতার নামী ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের সদ্য প্রাক্তণি জ়ায়ান রহমান নিজেও নিট দিয়েছেন। এক বার নয় দু’বার। দ্বিতীয় বারের ফল প্রথম বারের থেকে খারাপ। নিজেরই স্কুলের আরও কয়েক জন বন্ধুকে নিয়ে শামিল ধর্মতলামুখী যাত্রায়। পাশ দিয়ে তখন ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের পতাকা লাগানো ম্যাটাডোর থেকে বাছাই করা বিজেপি বিরোধী, মোদীবিরোধী স্লোগান চলছে। পাশে থাকা জ়ায়ানরাও স্লোগান দিচ্ছেন। তবে তার ভাষা আলাদা। সেই ভাষা রাজনীতির নয়। একদমই পাড়ার আড্ডার ভাষা! আঙুলের ‘ভঙ্গিতেও’ সেই বেপরোয়া ছাপ। রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র মহম্মদ রিজ়ওয়ানের বক্তব্য,‘‘আমরা দিল্লির আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশের লাঠিচার্জের প্রতিবাদে আজ রাস্তায় নেমেছি। এই দুর্নীতি কোনও ভাবে মেনে নেওয়া যায় না।’’ রিজওয়ান নিজেকে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র সমর্থক না-বললেও, সমাজমাধ্যমে এই প্রতিবাদ কর্মসূচির কথা জেনে পৌঁছে গিয়েছিলেন শিয়ালদহ স্টেশন চত্বরে, যেখান থেকে মিছিল শুরু হয়। রাজাবাজারের আফরিন এখনও স্কুলের গন্ডি পেরোয়নি। খালসা স্কুলের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী আফরিন মিছিলে কেন এসেছে বলতে গিয়ে গড়গড় করে দিল্লির ঘটনা বলে গেল। কিন্তু এখানে তারা কী করবে? প্রশ্ন করতেই মন দিলেন বন্ধুদের সঙ্গে সেলফি তোলায়। এঁরা কস্মিনকালেও কেউ রাজনীতি করেননি। রাজনীতি থেকে শতহস্ত দূরে থাকা এই জ়েন-জ়ি-দের হাতের পোস্টারেও নেই পরিচিত রাজনীতির ছোঁয়া। কারুর হাতের পোস্টারে লেখা, ‘‘এরর ৪০৪, অ্যাকাউন্টিবিলিটি নট ফাউন্ড’। আবার কেউ লিখেছেন, ‘মেলোনিজি, হাম বরবাদ হো গয়ে। আপ মত হোনা। প্লিজ ব্রেক আপ কর লো।’ কারুর পোস্টারের ভাষা বিশুদ্ধ গালি। কারুর মুখ সার্জিক্যাল মাস্কে ঢাকা। অনেকেই আবার ব্যাটম্যান, সুপারম্যান থেকে হাল্কের মুখোশ মুখে চড়িয়ে ‘সুপারহিরো’।
এঁরা নিজেদের আরশোলা বলে পরিচয় না-দিলেও, সমাজমাধ্যমে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকেই পথে নেমেছেন শুক্রবার বিকেলে। কলকাতার এই সিজেপির অস্তিত্ব দু’দিন আগেই প্রকাশ্যে এসেছে দেদীপ্য গঙ্গোপাধ্যায় নামে এক বছর পঁচিশের যুবকের কলকাতা পুলিশকে দেওয়া চিঠির সুবাদে। শুক্রবার ২৪ জুলাই মিছিল করতে চেয়ে ককরোচ জনতা পার্টির সদস্য পরিচয় দিয়ে পুলিশকে চিঠি দিয়েছিলেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র দেদীপ্য। ডোরিনার ‘মেলার মাঠ’-এর এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত দৌড়ে বেড়াচ্ছেন দেদীপ্য। কখনও সঙ্গী আরশোলাদের রোষ থেকে সংবাদমাধ্যমকে বাঁচাতে। আবার কখনও ভিড়ের মধ্যে ‘বিজেপির দালাল’কে গণপ্রহারের হাত থেকে বাঁচাতে। কে বিজেপির দালাল সেই সন্দেহে এক দফা তত ক্ষণে জুতো বনাম জলের বোতল ছুড়ে যুদ্ধ হয়ে গিয়েছে ডোরিনার ময়দানে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গেলে পুলিশের দিকেও উড়ে আসে জলের বোতল। পাল্টা লাঠি হাতে তাড়া করতে হয় পুলিশকে। সেই দেদীপ্যের কথায়, ‘‘কলকাতার সিজেপির সঙ্গে অভিজিৎ দিপকে, আশুতোষ রাঙ্কা হোক বা সৌরভ দাসের সঙ্গে কোনও যোগ নেই। ইনস্টাগ্রামের একটি পেজ থেকে কলকাতায় তাঁদের যাত্রা শুরু, যার ফলোয়ার বর্তমানে প্রায় ১৬ হাজার।’’ সেখান থেকেই ১০ থেকে ১২ জন মিলে আরও একটা ছোট গ্রুপ করেছেন দেদীপ্য। ছোটবেলায় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখা গোঁসাইবাগানের ভুত ছবিতে বুরুনের ভূমিকায় অভিনয় করা দেদীপ্য নিজেও খানিক হতবাক মাত্র সাত দিনের প্রস্তুতিতে সমাজমাধ্যমের প্রচারে জড়ো হওয়া চারপাশের ‘নিধিরাম’দের দেখে। গল্পের নিধিরাম বুরুনকে সাহায্য করলেও মাঝেমধ্যেই উবে যেত। ডোরিনার নিধিরামদের নাচ গান, আমোদের আন্দোলনে চেনা চোয়ালচাপা কাঠিন্য নেই। বরং শরীরি ভাষায় ছিল বেপরোয়া ভাব, নিয়ম ভেঙে যেমন খুশি চলার ইচ্ছে। যা সামাল দিতে ঘাম ছুটেছে দেদীপ্যের। যদিও দেদীপ্য থেকে শুরু করে মিছিলের ডাক দেওয়া বাম ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বের অভিযোগ বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী বহিরাগতরা। বুরুণ (দেদীপ্য) কি খুঁজে পাবেন বিশৃঙ্খল নিধিরামদের পিছনে থাকা হাবু ওস্তাদকে? তা না হলে কলকাতার জ়েন জ়ি-র প্রতিবাদ, তাঁদের হতাশা হয়তো চাপা পড়ে যাবে বিশৃঙ্খলার আড়ালে। নিটের প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনে তোলপাড় রাজধানী। শুক্রবার মিছিল শেষে ‘ককরোচ’দের জঙ্গিপনার সাক্ষী থাকল কলকাতা! এবার সিজেপি ও বামেদের আন্দোলনের প্রতিবাদে পথে নামছে বিজেপি। সোমবার একই রুটে ‘তিরঙ্গা যাত্রা’র পরিকল্পনা উত্তর কলকাতার বিজেপি সংগঠনের। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ডোরিনা ক্রসিং পর্যন্ত মিছিল নামবেন গেরুয়া সমর্থকরা। বিজেপি সূত্রে খবর, সোমবার বিকেল ৩টেয় শিয়ালদহ স্টেশন থেকে শুরু করে শিয়ালদহ ফ্লাইওভার, মৌলালি, এস এন ব্যানার্জি রোড হয়ে মিছিল পৌঁছবে ডোরিনা ক্রসিংয়ে।
নিট কেলেঙ্কারির বিরোধিতার নামে দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টিকে সমর্থন জানিয়ে শুক্রবার বাম ছাত্র সংগঠনের ডাকা প্রতিবাদ মিছিল তুমুল বিশৃঙ্খলায় পরিণত হয়েছে। মিছিল শেষে ধর্মতলায় অবস্থান বিক্ষোভ থেকে কার্যত ‘জঙ্গিপনা’ হয়েছে। পুলিশকে লক্ষ্য করে জুতো, জলের বোতল ছোড়া হয়। রেহাই পাননি আন্দোলনের খবর করতে যাওয়া সাংবাদিক, চিত্রসাংবাদিকরাও! তাঁরা ‘ককরোচ’ সমর্থকদের ভিড়ে মিশে যাওয়া ‘বহিরাগত’দের হামলায় আক্রান্ত হয়েছেন। বেশ কয়েকজন ভর্তি এসএসকেএমে হাসপাতালে। রাতেই তাঁদের দেখতে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও ‘আসল’ তৃণমূলের বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। যাঁদের জন্য সাংবাদিকদের এই অবস্থা, তাঁদের উদ্দেশে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। শুক্রবার রাত প্রায় সাড়ে ৯টা নাগাদ এসএসকেএমের ট্রমা কেয়ার সেন্টার অর্থাৎ যেখানে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের চারজন সাংবাদিক ও চিত্রসাংবাদিক চিকিৎসাধীন, সেখানে পৌঁছে যান মুখ্যমন্ত্রী। আহতদের খোঁজখবর নিয়ে, চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বেরিয়ে আসেন আধঘণ্টার মধ্যে। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী কড়া সুরে জানালেন, ‘‘কটা দিন অপেক্ষা করুন, ওদের কী করতে হয়, আমি জানি। এই ‘শুক্রবারি’দের দেখিয়ে দেব।” মুখ্যমন্ত্রী ফিরে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এসএসকেএমে গিয়ে আহত সাংবাদিকদের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর মন্তব্য, ‘‘এটা কোনও ছাত্র আন্দোলনের রূপ নয়। এটা চূড়ান্ত স্বৈরাচার। যেসব ভিডিও দেখলাম, তাতে প্রতিবাদীদের যা কথা শুনলাম, তাতে আমি বিস্মিত। ভাবতেই পারছি না এটা ছাত্রদের আন্দোলন!”



