RK NEWZ সর্বকালের অন্যতম সেরা এই অলরাউন্ডার ব্যাট ও বল হাতে যে কীর্তি গড়ে গিয়েছেন তা চির অমলিন হয়ে থেকে যাবে। প্রয়াত স্যার গ্যারফিল্ড সোবার্স। শুক্রবার সন্ধ্যায় তাঁর প্রয়াণ সংবাদ মিলতেই শোকে মুহ্যমান ক্রীড়াজগৎ। বয়স হয়েছিল ৮৯। সর্বকালের অন্যতম সেরা এই অলরাউন্ডার ব্যাট ও বল হাতে যে কীর্তি গড়ে গিয়েছেন তা চির অমলিন হয়ে থেকে যাবে। দু’সপ্তাহ পরে ছিল নব্বইতম জন্মদিন। তার ঠিক আগেই তাঁর প্রয়াণ সংবাদ জানিয়ে দিল একটি যুগের চির অবসান হয়েছে। গ্যারি সোবার্স এমন এক ক্রিকেটারের নাম, যা উচ্চারিত হলেই সম্ভ্রমে নতজানু হয় বিশ্বক্রিকেট। খোদ স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান তাঁকে বলতেন ‘ফাইভ ইন ওয়ান’ ক্রিকেটার। টেস্টক্রিকেটে ব্যাট হাতে ধুন্ধুমার ফেলে দেওয়া খেলোয়াড়টি বল হাতেও ছিলেন এক অবিশ্বাস্য প্রতিভা। ইনিংসের শুরুতে নতুন বলে ওপেন করতেন। আবার বল পুরনো হলে সেই তিনিই হয়ে যেতেন চায়নাম্যান বোলার। অর্থাৎ বাঁ হাতে স্পিন করতেন। পাশাপাশি প্রয়োজনে মিডিয়াম পেসও করতে পারতেন! আবার ফিল্ডিংয়েও ছিলেন বিদ্যুতের মতো ক্ষিপ্র। মনে করা হয়, ওয়ানডের যুগেও যদি তিনি থাকতেন, সেই ফর্ম্যাটেও মাতিয়ে দিতেন অনায়াসেই। এমনকী, আজকের টি২০-তেও রোখা যেত না তাঁকে। ভুললে চলবে না প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তিনিই প্রথম যিনি এক ওভারে ছয় ছক্কা হাঁকান! যার মধ্যে ষষ্ঠ ছক্কাটি ছিল এমন বিপুল, বলা হয়েছিল ‘ওটা ছয় নয়, বারো’। বল পড়েছিল স্টেডিয়াম পেরিয়ে কার পার্কের পাশের রাস্তায়! এমন ক্রিকেটার ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ততম সংস্করণেও যে অপ্রতিরোধ্য থাকতেন, সেব্যাপারে নিশ্চিত বিশেষজ্ঞরা। ১৯৫৩ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সেই প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয় তাঁর। প্রতিভার তীব্র ঝলকানিতে নিজেকে শুরু থেকেই চিনিয়ে দেন তিনি। পরের বছরই সুযোগ পেয়ে যান ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে। ভুললে চলবে না ততদিনে বিশ্বক্রিকেটে ক্যারিবিয়ানরা তাঁদের আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে দিয়েছেন। সেই দলে ঢুকে পড়ে এক কিশোর। যে অচিরেই গড়বে অবিশ্বাস্য কীর্তি। ১৯৫৮ সালে সোবার্স পেলেন জীবনের প্রথম টেস্ট শতরান। বিপক্ষ পাকিস্তান। কিন্তু স্রেফ সেঞ্চুরিতে মন ভরল না বছর বাইশের তরুণের। তিনি খেলেই চললেন! তাঁকে আর আউট করা যায়নি ওই ইনিংসে। তিনি করলেন অপরাজিত ৩৬৫। ভেঙে দিলেন স্যার লেন হাটনের রেকর্ড। ওই স্কোরটাই হয়ে দাঁড়াল টেস্টে এক ইনিংসে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের ইনিংস। যা টিকেছিল ৩৬ বছর। ১৯৯৪ সালে যে রেকর্ড ভেঙে দেন সোবার্সেরই স্বদেশীয় ব্রায়ান চার্লস লারা।
এই ছিলেন সোবার্স। ৯৩ টেস্টে ৮,০৩২ রান। গড় ৫৭.৭৮। শতরান ২৬টি। আবার বল হাতে পেয়েছেন ২৩৫ উইকেট। অন্যদিকে তালুবন্দি করেছেন ১০৯ ক্যাচ। প্রায় দেড়শো বছরের টেস্ট ইতিহাসে এমন অলরাউন্ডিং পারফরম্যান্স প্রায় বিরল বললেই চলে। তবে কেবল পরিসংখ্যানে সোবার্সের মতো ‘অলৌকিক’ প্রতিভাকে বোধহয় মাপাও যায় না। যে কীর্তি গড়ে গিয়েছেন, সেটা চোখ কপালে তোলার মতোই। কিন্তু সোবার্সের ক্রিকেটীয় উচ্চতা আরও বিশাল। অধিনায়ক হিসেবে বহু ক্রিকেটারকে তুলে এনেছেন। ছিলেন কত মানুষের আদর্শ! ক্রিকেট যাদের কাছে ছিল ধর্মাচরণের মতো, সেই ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে তিনি ছিলেন কার্যতই এক ‘মসিহা’র সমান! তাঁর ক্রিকেট বীক্ষাও থেকে যাবে চিরস্মরণীয় হয়ে। মনে রাখতে হবে, সোবার্সই ১৯৮৩ সালের ভারতীয় দলকে বলেছিলেন তারাই এবারের প্রতিযোগিতার ‘ডার্ক হর্স’। তাঁর ‘জহুরির চোখ’ ঠিকই চিনেছিল কপিলদেব রামলাল নিখাঞ্জের নেতৃত্বাধীন দলটির ভিতরে থাকা ‘সুপার পাওয়ার’কে। সোবার্স আসলে এমন এক ক্রিকেটার, যিনি কেবল ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জেই নয়, গোটা বিশ্বের ক্রিকেট তথা ক্রীড়াজগতের চিরবিস্ময়। তাঁর মৃত্যু হলেও থেকে গেল সেই বিস্ময়।



