স্পেন: ২ (ওয়ারজাবাল-পেনাল্টি, পোরো) ফ্রান্স: ০
RK NEWZ দিদিয়ের দেশঁকে পিছনে ফেলে দিলেন লুই দে লা ফুয়েন্তে। তারকা কিলিয়ান এমবাপে গোল্ডেন বুটের দাবিদার। জাল কাঁপাচ্ছেন উসমান ডেম্বেলে৷ রক্ষণও প্রায় অভদ্য। সমস্ত জৌলুস নিভে গেল সেমিফাইনালের মঞ্চে। বিশ্বকাপের আসরে ফ্রান্সের টানা তৃতীয় ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন হোঁচট খেল শেষ চারে। ডালাস স্টেডিয়ামে প্রথম সেমিফাইনালে স্পেন ২-০ স্কোরলাইনে হারাল ফরাসিদের। এক গোল মিকেল ওইয়ারজাবালের। অন্যটি পেদ্রো পোরোর। শেষ পর্যন্ত বলের দখল, ছন্দ, গতি। সবকিছুতেই এগিয়ে থেকে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করল লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। এই জয়ের সঙ্গে ইতিহাসও গড়ল স্পেন। বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল ২০১০ সালের পর প্রথম বার। অন্য দিকে দিদিয়ের দেশঁর ফ্রান্স একসঙ্গে হারাল দলগত ছন্দ, আক্রমণের ধার এবং সেই সঙ্গে ফাইনালের টিকিটও। গোটা প্রতিযোগিতায় দুরন্ত ফর্মে থাকা দলটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেই একযোগে হতশ্রী পারফর্ম করল। বাস্তিল দিবস। ১৭৮৯ সালে ১৪ জুলাই বিপ্লবীদের দাপটে ভেঙে পড়েছিল ফ্রান্সের কুখ্যাত বাস্তিল দুর্গ। সূচনা হয়েছিল ফরাসি বিপ্লবের। সেই ঐতিহাসিক দিনেই বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার যুদ্ধে নেমেছিলেন কিলিয়ান এমবাপেরা। কিন্তু এদিন সেমিফাইনালে ফরাসি বিপ্লব রুখে দিল স্প্যানিশ আর্মাডা। লামিন ইয়ামালদের তরুণ স্পেন উঠে গেল ফাইনালে। এই নিয়ে টানা তৃতীয়বার ফ্রান্সকে নকআউটে হারাল স্পেন। অন্যতম ফেভারিট হয়েও বিশ্বকাপ জেতা হল না ফরাসিদের।

পারফরম্যান্সের নিরিখে বিশ্বকাপের সেরা দু’দল মুখোমুখি হয়েছিল প্রথম সেমিফাইনালে। মাঠে ফুটবলারদের লড়াইয়ের পাশাপাশি আগ্রহ ছিল দুই কোচের কৌশলের টক্কর নিয়েও। তাতে দেশঁকে পিছনে ফেলে দিলেন লুই দে লা ফুয়েন্তে। আগ্রাসী মেজাজে শুরু করেছিল স্পেন। পেদ্রো পোরো, পাউ কুবারসি, আয়মেরিক লাপোর্তেরা মাঝ মাঠেই অফসাইডের ফাঁদ পেতে রেখেছিলেন। ফর্মে থাকা এমবাপে এবং উসমান দেম্বেলে জুটিকে এক রকম অকেজো করে দেন অফসাইডের ফাঁদে ফেলে। প্রথমার্ধে একাধিক বার মাঝ মাঠ পেরিয়েই অফসাইডে আটকে যান এমবাপেরা! কুবারসি প্রায় সারাক্ষণ নজরবন্দি করে রাখেন ফরাসি অধিনায়ককে। ম্যাচের ১০ মিনিটেই বক্সের কাছে ফ্রিকিক পায় স্পেন। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলেও গোলের জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি স্পেনকে। ২০ মিনিটের মাথায় ডিগনে ফাউল করে বলেন ইয়ামালকে। পেনাল্টি পায় স্পেন। গোল করতে ভুল করেননি মিকেল ওয়ারজ়াবাল। চলতি মরসুমে দেশের হয়ে ১৪টি গোল হয়ে গেল তাঁর। স্পেনের আর কোনও ফুটবলার এক মরসুমে দেশের জার্সিতে এত গোল করতে পারেননি। ষষ্ঠ মিনিটে ব্র্যাডলি বারকোলার দিক থেকে সুযোগ তৈরি হয়। পরে পাল্টা চাপ বাড়ায় স্পেন। ২০ মিনিটে বক্সের ভিতর লুকা দিনের ফাউলে লামিনে ইয়ামাল পড়ে গেলে পেনাল্টি দেন রেফারি। এগিয়ে যাওয়ার পরেও গোল পার্থক্য বাড়াতে লাগাতার আক্রমণ শানিয়ে গেল স্পেন। ইয়ামাল, রড্রি, ওলমোরা বেশ কয়েকটা সুযোগ তৈরি করেছেন। প্রথমার্ধের শেষদিকটায় খানিকটা চেনা ছন্দে ধরা দিতে শুরু করেছিল ফ্রান্সও। কুন্দে-বারকোলারা চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু স্প্যানিশ রক্ষণে বারবার আটকে গেল ফরাসিরা। স্পেনের থেকে বল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়েই বারবার ডুবলেন দেম্বেলেরা। ২২ মিনিটে স্পট-কিক থেকে নির্ভুল শটে গোল করেন মিকেল ওইয়ারজাবাল। টুর্নামেন্টে এই নিয়ে পাঁচ বার জালে বল জড়ালেন। ডেভিড ভিয়া এবং এমিলিয়ানো বুত্রাগেনিয়োর সঙ্গে এক বিশ্বকাপে সর্বাধিক গোল করা স্প্যানিশ ফুটবলারের তালিকায় নামও লেখালেন স্প্যানিশ স্ট্রাইকার। ফ্রান্সের বিপদ আরও বাড়ে ৩০ মিনিটে। চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন প্রথম একাদশের অন্যতম ভরসা উইলিয়াম সালিবা। তাঁর জায়গায় নামেন ম্যাক্সঁস লাখরোয়া। বিরতির আগে কয়েকটি সুযোগ এলেও সমতা ফেরাতে ব্যর্থ ফরাসিরা। দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচ পুরোপুরি স্পেনের নিয়ন্ত্রণে। তার ফল ফলে ৫৮ মিনিটে। দানি ওলমোর পাস থেকে ডান দিক দিয়ে উঠে এসে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন পেদ্রো পোরো। বিশ্বকাপের নকআউটে এটি তাঁর দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক গোল। ৬২ মিনিটে লামিন ইয়ামাল বল জালে জড়ালেও অফসাইডের জন্য সেই গোল বাতিল হয়। বার্সা তারকা হাত তুলে আপত্তি জানান। কিন্তু সিদ্ধান্ত বদলায়নি। এমবাপে এ দিন যেন নিজের ছায়া! প্রথমার্ধে সম্ভাবনাময় আক্রমণ নষ্ট করেন। দ্বিতীয়ার্ধে বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া তাঁর জোরালো শট শেষ মুহূর্তে আটকে দেন মার্ক কুকুরেয়া। টুর্নামেন্টের অন্যতম ভয়ঙ্কর আক্রমণভাগ এ দিন স্পেনের সুশৃঙ্খল রক্ষণে কার্যত অচল! মাইকেল ওলিসে, উসমান ডেম্বেলে, বারকোলা। কেউই প্রভাব ফেলতে পারেননি। ৭২ মিনিটে মাইকেল ওলিসে এবং ডিগনেকে তুলে রায়ান চেরকি এবং থিয়ো হের্নান্দেজ়কে নামান ফ্রান্স কোচ। তাতেও লাভ হয়নি। স্পেনের রক্ষণের সামনে বার বার খেই হারিয়েছে ফরাসি আক্রমণ। সময় যত এগিয়েছে তত চাপ বেড়েছে ফ্রান্সের ফুটবলারদের উপর। ৮৭ মিনিটে বক্সের ঠিক মাথায় ভাল জায়গায় ফ্রিকক পায় ফ্রান্স। এমবাপের শট অল্পের জন্য বাইরে চলে যায়। ০-২ গোলে পিছিয়ে পড়া দলকে মেসির মতো উদ্ধার করতে পারলেন না এমবাপে। এক দম শেষে সংযুক্ত সময়ে দেম্বেলের শটও আটকে দেন সিমন। এই নিয়ে স্পেনের কাছে টানা তিন ম্যাচ হারল ফ্রান্স। বিশ্বকাপ ২০২৬-এর প্রথম ফাইনালিস্ট এখন স্পেন। দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্তিনার লড়াইয়ের বিজয়ীর মুখোমুখি হবে। আর ফ্রান্সের কাছে এই ম্যাচ থেকে থেকে যাবে বড় শিক্ষা হিসেবে—ফুটবলের বৃহত্তম মঞ্চে কয়েক মিনিটের ভুলই চূড়ান্ত স্খলন ঘনিয়ে আনতে পারে৷ স্তিমিত হতে পারে বিশ্বজয়ের সমস্ত আশা।




