RK NEWZ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মজয়ন্তীতে একাধিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে সোমবার কলকাতায় এসেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। আর তারই ফাঁকে অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের বালিগঞ্জের বাড়িতে গেলেন তিনি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন লকেট চট্টোপাধ্যায়, নিশীথ প্রামাণিকরা। প্রসেনজিতের বাড়িতে শুধুমাত্র ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ করতেই শাহ গেলেন কি না, তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে। কলকাতায় শাহর যে সব কর্মসূচি নির্ধারিত ছিল, সেখানে প্রসেনজিতের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি উল্লেখ ছিল না। কলকাতা বিমানবন্দরে নামার পর শাহ ইকো পার্কে যান। সেখানে শ্যামাপ্রসাদের ১২৫ ফুট মূর্তির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সেখান থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যান ভবানীপুরে শ্যামাপ্রসাদের পৈতৃক বাড়িতে। সেখানে কিছুক্ষণ ছিলেন তিনি। শ্যামাপ্রসাদের পৈতৃক বাড়ি থেকে মিলন মেলায় শ্যামাপ্রসাদকে নিয়ে অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা ছিল শাহর। তবে ভবানীপুর থেকে বেরিয়ে প্রসেনজিতের বালিগঞ্জের বাড়িতে পৌঁছে যান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। মিনিট পনেরো ছিলেন অভিনেতার বাড়িতে। সেখানে শুধু চা পান করেন বলে জানা গিয়েছে। বাংলা সিনেমা জগতের প্রথিতযশা অভিনেতার সঙ্গে শাহর সাক্ষাৎ নিয়ে নানা জল্পনা শুরু হয়েছে।
চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি প্রসেনজিতের বালিগঞ্জের বাড়িতে গিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার। প্রসেনজিৎ পদ্মশ্রী সম্মান পাওয়ার পর রুদ্রনীল ঘোষকে নিয়ে প্রসেনজিতের বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছিলেন সুকান্ত। প্রসেনজিতের হাতে একটি রামলালার মূতি তুলে দিয়েছিলেন। জানা গিয়েছিল, সিনেমা জগত, অভিনয় নিয়ে মূলত তাঁদের মধ্যে কথা হয়েছিল। উঠে এসেছিল রাজ্য ও দেশের সার্বিক পরিস্থিতির কথাও। প্রসেনজিতের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সুকান্ত জানিয়েছিলেন, অভিনেতার সঙ্গে সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। পদ্মশ্রী সম্মান পাওয়ায় প্রসেনজিৎকে শুভেচ্ছা জানাতেই তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলেন। সুকান্ত বলেছিলেন, “এই সাক্ষাৎ একেবারেই রাজনৈতিক নয়। সব কিছুর পিছনে রাজনীতি না খোঁজাই ভালো। শিক্ষা, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে নিয়ে রাজনীতি না করাই ভালো। রাজনৈতিক আগ্রাসন থেকে দূরে থাক সিনেমা।” সেইসময় ওই সাক্ষাৎ ঘিরে আলোচনা বেশিদূর গড়ায়নি। তবে কিছুদিন আগে তাঁর নিজের ছবি দেখার আমন্ত্রণ জানিয়ে রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছিলেন প্রসেনজিৎ। এবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পৌঁছে গেলেন অভিনেতার বাড়িতে। তাঁদের এই সাক্ষাৎ ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা শুরু হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সফরের মধ্যেই ভিডিয়োবার্তা এবং সমাজমাধ্যমে লেখা পোস্টে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে দেশবাসীকে বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। অন্য দিকে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সোমবার শ্যামাপ্রসাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কলকাতায় এসে ভারত ভাগের ইতিহাসের প্রসঙ্গ তুলে নিশানা করলেন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে। তুললেন, শ্যামাপ্রসাদের ‘রহস্যমৃত্যু’র প্রসঙ্গও।প্রধানমন্ত্রী মোদী সোমবারই ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউ জ়িল্যান্ড সফরে রওনা হয়েছেন। সমাজমাধ্যমে ‘ভারত কেশরী’ শ্যামাপ্রসাদের উদ্দেশে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করে তিনি লেখেন, ‘‘আজ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জয়ন্তী। আমি ভারতের অন্যতম অনন্য জাতি-নির্মাতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। তাঁর জীবনে জ্ঞানচর্চা, সাহস এবং জাতির সেবার প্রতি অবিচল অঙ্গীকারের সংকল্প ছিল। তিনি ভারতের ঐক্য, মর্যাদা এবং অগ্রগতির জন্য নিজেকে নিবেদিত করেছিলেন।’’ প্রয়াত জনসঙ্ঘ-প্রতিষ্ঠাতার অবদান সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্র জুড়ে বিস্তৃত ছিল জানিয়ে মোদী লিখেছেন, ‘‘তিনি (শ্যামাপ্রসাদ) ছিলেন একজন অসাধারণ চিন্তাবিদ এবং শিক্ষাবিদ, যিনি উদ্ভাবনমুখী ও ভবিষ্যৎমুখী শিক্ষাকে সমর্থন করেছিলেন। শিল্পমন্ত্রী হিসেবে তিনি শিল্পে স্বনির্ভরতার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী ক্ষেত্র এবং তাঁর সম্পর্কিত জীবিকা যেন সমৃদ্ধ হয়, তা নিশ্চিত করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে দুর্ভিক্ষের সময় তাঁর মানবিক প্রচেষ্টা সঙ্কটাপন্ন মানুষের প্রতি তাঁর গভীর সহানুভূতির প্রতিফলন। সর্বোপরি, ভারতের ঐক্য ও অখণ্ডতার প্রতি তাঁর অটল অঙ্গীকার আজও অনুপ্রেরণার এক চিরস্থায়ী উৎস হয়ে রয়েছে। আমরা যখন একটি বিকশিত ভারতের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করেছি, তাঁর দূরদর্শিতা আমাদের পথকে আলোকিত করে চলেছে।’’সোমবার সন্ধ্যায় বিশ্ববাংলা মেলা প্রাঙ্গণে শাহের বক্তৃতায় গোড়াতেই এসেছে নেহরুর মন্ত্রিসভা থেকে শ্যামাপ্রসাদের ইস্তফার ঘোষিত ও প্রত্যক্ষ কারণ— ১৯৫০ সালের এপ্রিল মাসে স্বাক্ষরিত ‘নেহেরু-লিয়াকত (পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী) চুক্তি’ বা ‘দিল্লি চুক্তি’। শাহ বলেন, ‘‘আমি সেই পদত্যাগপত্র দেখেছি। চুক্তিটি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় অধ্যয়ন করে বলেছিলেন যে, তাতে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসকারী হিন্দুদের কথা চিন্তাই করা হয়নি। তিনি বলেন, ‘ভারতে থেকে যাওয়া মুসলমানদের কথা চিন্তা করা হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান, বাংলাদেশের হিন্দুদের কথা ভাবা হয়নি। এই চুক্তি একতরফা। তাই আমি ইস্তফা দিচ্ছি।’’’ ৬৩ বছর পরে শ্যামাপ্রসাদের দলের সরকার সিএএ এনে হিন্দুদের নাগরিকত্ব দিচ্ছে জানিয়ে শাহ বলেন, ‘‘শুভেন্দু আমাদের রোজ বলছেন। তাঁকে বলছি, নাগরিকত্ব দেওয়ার কাজ যেটুকু বাকি আছে, তা-ও দ্রুত করে দেব।’’ মৃত্যুর ৬৩ বছর পরে শ্যামাপ্রসাদের নিজের রাজ্যে তাঁর স্মারক তৈরি হচ্ছে জানিয়ে শাহ সোমবার বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গকে আবার যিনি সমগ্র ভারতের প্রেরণাকেন্দ্র বানানোর কাজ শুরু করেছেন, আমার সেই মিত্র পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে অনেক অভিনন্দন। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের দলের সরকার হল। তাঁর বিচারধারার সরকার হল। দেশভক্তদের সরকার হল। তাই শ্যামাপ্রসাদের নিজের রাজ্যে তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করা হচ্ছে।’’ সোমবার দুপুরে নিউ টাউনের ইকো পার্কে শ্যামাপ্রসাদের মূর্তির ভিত্তিস্থাপন করেন শাহ। সেই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘এটি শুধু শ্যামাপ্রসাদের মূর্তি প্রতিষ্ঠার ভূমিপূজন নয়। এটা সোনার বাংলার সঙ্কল্পকে বাস্তবায়িত করার ভূমিপূজন। শুভেন্দু অধিকারীকে অনেক অনেক অভিনন্দন। মনুষ্যনির্মিত বৃহত্তম ঝিলের ধারে এক অসামান্য স্থানে যেখানে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, সেখানে ভারতের নিরাপত্তা সংক্রান্ত গবেষণা করার জন্য ‘শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ইনস্টিটিউট’ও হবে।’’ শাহের দাবি, শ্যামাপ্রসাদ এমন বীজ বপন করেছিলেন ভারতীয় জনসঙ্ঘের রূপে, যা ভারতের সব জাতীয়তাবাদী শক্তিকে একত্রিত করেছিল। তাঁর বপন করা বীজ আজ বটবৃক্ষের রূপ নিয়ে গোটা দেশকে ফল দিচ্ছে। সেই সঙ্গে জম্মু ও কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিলের প্রসঙ্গ তুলে তাঁর মন্তব্য, ‘‘শ্যামাপ্রসাদ যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সেই স্বপ্নই পূরণ করছেন।’’ সেই সঙ্গে তাঁর প্রতিশ্রুতি, ‘‘ভারতের জমি থেকে প্রত্যেক অনুপ্রবেশকারীকে বার করে ভারতকে পূর্ণ সুরক্ষিত বানাব।’’ নেহরুর জমানায় কাশ্মীরের জেলে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘সন্দেহজনক মৃত্যু’ হয়েছিল জানিয়ে শাহ বলেন, ‘‘কিন্তু কংগ্রেস কোনও দিন তার তদন্ত করায়নি।’’
বন্দে মাতরম রচনার ১৫০ বছর, শ্যামাপ্রসাদের ১২৫ বছর জন্মদিবস এসেছে একই বছরে। শাহের কথায়, ‘এই ঘটনা বিধির বড় সঙ্কেত। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যে বন্দে মাতরমের রচনা করেছিলেন, তার মাধ্যমে ভারতের সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের ভিত তৈরির কাজ হয়েছিল। এর চেয়ে ভাল মণিকাঞ্চন যোগ কোথাও হয় না।’’ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ হোক, অখণ্ড ভারতের সঙ্কল্প হোক, সব বিচারধারার একটাই গঙ্গোত্রী— শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, ‘‘৬৩ বছর ধরে নিজের জন্মভূমিতে শ্যামাপ্রসাদকে ভোলানোর চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সূর্যকে কখনও আড়াল করে রাখা যায় না। শুভেন্দুজিকে আমি ফোন করেছিলাম যে, শ্যামাপ্রসাদের জন্মদিনে ছুটি ঘোষণা হোক আর তাঁর সুউচ্চ মূর্তি প্রতিষ্ঠা হোক। তিনি দু’টিই মেনে নিয়েছেন। ভারতীয় ভাষার জন্য শ্যামাপ্রসাদের যে ভাবনা ছিল, এ বার তা নিয়েও কাজ হবে।’’ শ্যামাপ্রসাদের ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতেই যে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, সে কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন শাহ। তিনি বলেন, ‘‘এত কম সময়ে ভারতীয় জনতা পার্টির মুখ্যমন্ত্রী অন্নপূর্ণা যোজনা শুরু করে দিয়েছেন। উজ্জ্বলা ৩.০ চালু হয়েছে। মহিলা, ছাত্রীদের জন্য বাসে বিনামূল্যে যাতায়াত শুরু। লাখপতি দিদি চালু। আয়ুষ্মান ভারত চালু। উত্তরবঙ্গে ক্যানসার হাসপাতাল তৈরি শুরু হয়ে গিয়েছে। বিএসএফকে বেড়ার জন্য জমি দেওয়ার কাজ হয়ে গিয়েছে। দুর্নীতির তদন্তের জন্য কমিটি তৈরি হয়ে গিয়েছে। কমিটির রিপোর্ট এলেই পাইপয়সা বার করে দিতে হবে, তা গরিব জনতার। মহিলাদের উপরে অত্যাচারের তদন্তে কমিটি হয়েছে। অভিন্ন দেওয়ানি বিধির জন্য কমিটি তৈরি হয়ে গিয়েছে। গুন্ডাদমন বিল পাশ হয়ে গিয়েছে। আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, গুন্ডাদের উল্টো ঝুলিয়ে সোজা করব। মা-বোনেদের নিরাপত্তার জন্য গঠন করা হয়েছে দুর্গা সুরক্ষা স্কোয়াড।’’ শাহ জানান, কোনও রাজ্য সরকার এত কম সময়ে এত প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন বলে তাঁর জানা নেই। সেই সঙ্গে তাঁর বার্তা, ‘‘পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং ভারত সরকারের সাংস্কৃতিক বিভাগকে অনেক অভিনন্দন। যিনি বাংলাকে বাঁচিয়েছেন, যিনি কাশ্মীরকে বাঁচিয়েছেন, যিনি অসমকে বাঁচিয়েছেন, তাঁর স্মারক এত দিন বানানো হয়নি, কিন্তু এ বার হচ্ছে। শুভেন্দু অধিকারীর সরকার প্রতিটি প্রতিশ্রুতি পাঁচ বছরে পূরণ করবে।’’




