RK NEWZ বাতিল হতে পারে ত্রুটিপূর্ণ বিল্ডিং প্ল্যান। গার্ডেনরিচ, তারাতলার মতো একের পর এক বিপর্যয় থেকে শিক্ষা। আপাতত কলকাতা, বিধাননগর, বরানগর, কামারহাটি এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ এলাকার নির্মীয়মাণ বেসরকারি বাণিজ্যিক বহুতলের স্বাস্থ্যপরীক্ষায় নজর শুভেন্দু সরকারের। অডিট কমিটির স্বাস্থ্যপরীক্ষার জন্য আপাতত ১ মাস বন্ধ জি+৫ নির্মাণ। নকশা বড়সড় ত্রুটি পেলে বাতিল হতে পারে বহুতলের অনুমোদন। পিডব্লুডি টেন্টে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী । কোন কোন জায়গায় অডিট কমিটির স্ক্যানারে, তা এদিন জানান তিনি। মুখ্যমন্ত্রী জানান, একমাস কলকাতা পুর এলাকা, বিধাননগর, রাজারহাট, নিউটাউন, পূজালি, বারুইপুর, মহেশতলা, রাজপুর-সোনারপুর, দক্ষিণ দমদম, কামারহাটি, বরানগর এবং বালিতে বেসরকারি বাণিজ্যিক নির্মাণ বন্ধ থাকবে। ১১ সদস্যের অডিট কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটি জি+৫ বহুতলগুলির স্বাস্থ্যপরীক্ষা করবে। বেশি অনিয়ম থাকলে পুরো বাতিল করে দেওয়া হবে অনুমোদন। স্বল্প ত্রুটির ক্ষেত্রে শোধরানোর সুযোগ দেওয়া হবে নির্মাণ সংস্থাকে। অডিট কমিটির স্বাস্থ্যপরীক্ষায় পাশ হলে ১ আগস্ট থেকে ফের শুরু হবে নির্মাণ। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, নগরায়ণ আটকানো সরকারের উদ্দেশ্য নয়। জীবনের অনেক দাম সে কারণেই নির্মাণ ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হবে। তবে বসতবাড়ির সংস্কার এই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে পড়ছে না। এই একমাসের মধ্যে বসতবাড়ির যাবতীয় কাজ করাতে পারে আমজনতা। প্রাথমিকভাবে নকশা যথাযথ কিনা, তা পরীক্ষা করে দেখবেন অডিটি কমিটির সদস্যরা। আগামী ৭ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট দেবেন তিনি। বহুতলের নকশা খতিয়ে দেখার পর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং বিদ্যুতের ক্ষেত্রে কোনও গলদ আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হবে। আগামী ৯০ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে হবে অডিট কমিটিকে।
তারাতলা বিপর্যয়ে দায় কার? তা নিয়ে চলছে জোর দড়ি টানাটানি। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, কলকাতা পুরসভার পাশ করা গলদে ভরা নকশার জেরে বিপর্যয়। সুতরাং প্রাক্তন মেয়র হিসাবে ফিরহাদ হাকিমের দিকে আঙুল উঠতে বাধ্য। যদিও দায় ঝেড়েছেন প্রাক্তন মহানাগরিক। তবে বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ ফিরহাদের গ্রেপ্তারির দাবি তোলেন। তার চব্বিশ ঘণ্টা কাটতে না কাটতে পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালেরও দাবিতে ক্রমশ জোরাল হচ্ছে ফিরহাদের গ্রেপ্তাররি আশঙ্কা। দুর্গাপুরে দাঁড়িয়ে পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা বলেন, “কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি শেষ কথা ছিল। তাকে যদি গ্রেপ্তার করা হয়, তাহলে যিনি মন্ত্রী ছিলেন যার স্বাক্ষর ছিল তাকে কেন ধরা হবে না। যারা যারা এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত তাদের কাউকে ছাড়া হবে না। ইতিমধ্যেই সিট গঠন করা হয়েছে। এই সিট প্রাক্তন সরকারের সিট নয়। আপনারা দেখতে পাবেন বর্তমান সরকারের এই সিট কি কাজ করছে।” তারাতলা কাণ্ডে ধৃত ফিরহাদ ‘ঘনিষ্ঠ’ কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ক্যামাক স্ট্রিটের যোগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল আরও বলেন, “ক্যামাক স্ট্রিটের সঙ্গে আইপ্যাকের কর্ণধার হোক বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যারই যোগ থাকুক না কেন, তাদের দড়ি বেঁধে আনা দরকার। ১৫ বছর ধরে পাড়ার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে বাংলার মানুষকে হুমকি দিয়েছে। গাড়ির বনেটে দাঁড়িয়ে ডিজে বাজাবে বলেছেন। কিন্তু ডিজে বাজানো কাকে বলে? শুভেন্দু অধিকারীর সরকার দেখিয়ে দেবে।” ২০০৩ সালে ওয়েস্ট বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে দ্বিতীয় হন কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। যোগ দেন ভূমি রাজস্ব দপ্তরে। এরপর ২০০৬ সালে ওয়েস্ট বেঙ্গল পুলিশ সার্ভিস পরীক্ষায় বসেন। তাতে প্রথম হয়ে ২০০৮ সালে রাজ্য পুলিশে যোগ দেন। কিন্তু প্রশিক্ষণের সময় তা ছেড়ে দেন বিশেষ কারণে। ওই বছরই ফের ভূমি রাজস্ব দপ্তরে ফিরে যান তিনি। সূত্রের খবর, ২০১০ সাল থেকে পুরসভায় কাজ শুরু কালীচরণের। সেই সময় মেয়র পারিষদ ছিলেন ফিরহাদ। কালীচরণ ছিলেন ফিরহাদের আপ্ত সহায়ক। ২০১৮ সালে কলকাতা পুরনিগমের মেয়র হন ফিরহাদ হাকিম। শোনা যায়, ক্যামাক স্ট্রিটের নির্দেশেই সেই সময় ফিরহাদ হাকিম কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিজের ওএসডি পদে নিয়ে আসেন। তারপর সময় যত এগিয়েছে উত্তরোত্তর বেড়েছে কালীর দাপট। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশের পর সেই কালীই আপাতত পুলিশের জালে।
কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় একা নন। তারাতলার বিপর্যস্ত গুদামের ত্রুটিযুক্ত প্ল্যান পাশের নেপথ্যে ছিল আরও অনেকে। হয়তো ছিলেন কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তিও। কালীর মাথায় হাত ছিল কার, সেই তথ্যের খোঁজে সিট। সরকারি আইনজীবীর এই যুক্তিতে তারাতলা কাণ্ডে ধৃত কালীকে পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিলেন আলিপুর আদালতের বিচারক। আগামী ৪ জুলাই পর্যন্ত শ্রীঘরে থাকতে হবে কালীকে। সরকারি আইনজীবী সৌরীন ঘোষাল শুক্রবার আদালতে জানান, টাকার বিনিময়ে ত্রুটিযুক্ত প্ল্যান পাশ করাতেন কালী। অনুমোদনের যোগ্য না হলেও সেই প্ল্যান পাশ করে দেওয়া হত। গলদে ভরা নকশা পাশ করানোর ক্ষেত্রে যেকোনও নথিপত্র তৈরি করতে টিম গড়েছিল কালী। কালীর টিমেই বা ছিলেন কারা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সরকারি আইনজীবীর আরও দাবি, কালীর মাথায় কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তির হাত ছিল। সে কারণে তাঁকে জামিন দিলে তদন্ত প্রভাবিত হতে পারে। তদন্তের স্বার্থে কালীর পুলিশ হেফাজতের আর্জি জানান তিনি।
পালটা কালীর আইনজীবী দাবি করেন, অভিযুক্তকে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কীসের এত জটিলতা? তাঁর বিরুদ্ধে কোনও তথ্যপ্রমাণ নেই। সমস্ত তথ্য পুরসভার ওয়েবসাইটে গেলেই পাওয়া যাবে। লুকনোর কিছু নেই। তাহলে আরও জিজ্ঞাসাবাদের কীসের প্রয়োজনীয়তা? যদিও দু’পক্ষের সওয়াল জবাব শোনার পর আলিপুর আদালতের বিচারক আগামী ৪ জুলাই পর্যন্ত কালীচরণকে পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে। তারাতলা বিপর্যয়ে বৃহস্পতিবার বিধানসভায় বিবৃতি জারি করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখানেই রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের মুখে শোনা যায় কালী নামে এক ব্যক্তির কথা। সেই সূত্র ধরেই তারাতলা বিপর্যয়েও জড়িয়ে গেল ‘কালীঘাট তৃণমূলে’র সেকেন্ড ইন কম্যান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “ক্যামাক স্ট্রিটের নির্দেশেই পুরসভায় নিয়োগ করা হয়েছিল কালীকে। আর কালী জানে না এমন কোনও বিল্ডিং কলকাতায় নেই। সব বিল্ডিংয়ের অনুমোদন হত ওর কথায়।” বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “কালীকে ধরলেই সব সামনে চলে আসবে।” তারপর থেকেই চর্চায় কালী।
তারাতলায় নির্মীয়মাণ গুদাম ভেঙে পড়ার ঘটনায় ধৃত কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে শুক্রবার আলিপুর আদালতে হাজির করানো হয়। সরকারপক্ষের অভিযোগ, ওই গুদামের নকশা ছিল ত্রুটিপূর্ণ। আর সেই নকশায় অনুমোদন ছিল কালীর! আদালতে পুলিশ সেই সূত্রের কথা উল্লেখ করে জানিয়েছে, ‘টিমওয়ার্ক’ করতেন কালী। আর সেই ‘টিমের’ খোঁজ করছেন তদন্তকারীরা। ধৃতের মাথায় কার হাত রয়েছে? তাঁর রক্ষাকর্তা কে? এই সব প্রশ্নই ভাবাচ্ছে পুলিশকে। আদালতে তাদের আর্জি, হেফাজতে নিয়ে সেই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চায় তারা। আদালত ৪ জুলাই পর্যন্ত কালীচরণকে পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছে। তারাতলার দুর্ঘটনার পরেই পূর্বতন তৃণমূল সরকারের গাফিলতির দিকে আঙুল তুলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৃহস্পতিবার বিধানসভায় একটি নথি দেখিয়ে তিনি দাবি করেন, ত্রুটিপূর্ণ নকশায় ছাড়পত্র দিয়েছিলেন প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম নিজেই। আর বৃহস্পতিবার রাতেই ফিরহাদের তৎকালীন ওএসডি (অফিসার অন স্পেশ্যাল ডিউটি) কালীচরণকে গ্রেফতার করে পুলিশ। শুক্রবার তাঁকে আদালতে হাজির করিয়ে পুলিশ দাবি করে, তারাতলার ঘটনায় যে অনিয়ম হয়েছে, তার নেপথ্যে ধৃতের ‘টিমওয়ার্ক’!
আদালতে সরকারি আইনজীবী সৌরীন ঘোষাল জানান, ধৃত কী কী কাজ করতেন, তার কিছুটা আভাস পাওয়া যাবে কেস ডায়েরিতে। ইতিমধ্যেই তাঁর বয়ান নেওয়া হয়েছে। পুলিশের দাবি, কোনও নির্মাণ নিয়ে প্রশ্ন থাকলে, সেটা করিয়ে দিতেন কালীচরণ। অর্থাৎ, হবে না এমন কাজও করিয়ে দেওয়ার ‘ক্ষমতা’ ছিল তাঁর। আদালতে ধৃতকে ‘প্রভাবশালী’ও বলেও উল্লেখ করেছে পুলিশ। শুক্রবারের শুনানিতে বার বার ‘টিমওয়ার্কের’ বিষয়ে জোর দিয়েছে পুলিশ। তাদের দাবি, শুধু একা কালীচরণ নন, অনিয়মের নেপথ্যে আরও অনেকে রয়েছেন। তাঁদের ‘মাথার’ খোঁজ চলছে। এই ‘টিমে’ আর কারা রয়েছেন, তা জানার প্রয়োজন আছে। সৌরীনের প্রশ্ন, ‘‘কালীচরণের রক্ষাকর্তা কে? তাঁর মাথায় কার হাতে রয়েছে?’’ সেই সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য ধৃতকে হেফাজতে নেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে আদালতে জানায় পুলিশ। সরকারি আইনজীবীর কথায়, ‘‘ধৃতকে পুরোপুরি হেফাজতে না-পাওয়া গেলে, অনেক প্রশ্নের উত্তর জানা যাবে না।’’ আদালতে কারীচরণের তরফে দাবি করা হয়, তারাতলার ঘটনার এফআইআরে তাঁর নাম নেই। তাঁর আইনজীবীর কথায়, ‘‘আমার মক্কেলকে বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরবর্তী তদন্তের জন্য হেফাজতে নেওয়ার আবেদন করেছে পুলিশ, যা পুরোপুরি ভিত্তিহীন।’’ কালীর দাবি, তিনি পুরসভায় কাজ করতেন। যে নথির কথা বলা হচ্ছে, তা পাবলিক ডোমেনে রয়েছে। তার জন্য হেফাজতে নেওয়ার প্রয়োজন কোথায়? যদিও আদালত পুলিশের আবেদন মেনে কালীচরণকে তাদের হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। পরে আদালতের বাইরে সৌরীন বলেন, ‘‘(তারাতলার দুর্ঘটনাগ্রস্থ) লাইসেন্স প্রক্রিয়া করতে কালীচরণের সরাসরি যোগাযোগ ছিল। এমন ঘটনা আগেও ঘটিয়েছেন। উনি যে নথি দিয়েছিলেন, সেখানে পরিকল্পনায় অনুমোদন দেওয়াটা সঠিক ছিল না। যদি সঠিক অনুসন্ধান করে কাজ হত তবে ওই পরিকল্পনা অনুমোদন পেত না।’’ সৌরীনের দাবি, ‘‘তারাতলার ঘটনায় টাকার বিনিময়ে প্রভাব খাটানোর বিষয় উঠে আসছে।’’ বুধবার বেলা ১২টা ৭ মিনিটে তারাতলায় আচমকাই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে নির্মীয়মাণ একটি গুদামের ছাদ। লোহার কাঠামো, কংক্রিটের স্তূপের নীচে চাপা পড়ে যান অনেকে। এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ১৪ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। বেশ কয়েক জন এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ঘটনার পর থেকেই ওই গুদামের নির্মাণ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। তৎকালীন মেয়র ফিরহাদ বা তাঁর ওএসডি কালীচরণের ভূমিকাও আতশকাচের নীচে। রাজ্যের মন্ত্রী থেকে কালীঘাট-তৃণমূলের নেতারা একই সঙ্গে এই সব প্রশ্ন তুলছেন। শুক্রবার আদালতে সেই ‘রক্ষাকর্তা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলল পুলিশও।





