জার্মানি – ২(উন্ডাভ ২) আইভরি কোস্ট – ১ (কেসি)
নেদারল্য়ান্ডস – ৫ (ব্রবি ২, গ্যাকপো ২, সামারভিল) সুইডেন – ১ (এলাঙ্গা)
পিছিয়ে পড়েও আইভরি কোস্টকে হারিয়ে বিশ্বকাপের নকআউটে জায়গা করে নিল জার্মানি। ডেনিজ় উন্ডাভের শট জালে জড়াতেই জার্সি দিয়ে মুখ ঢাকলেন সাইমন আদিংরা। ঢাকবেনই তো। তার দু’মিনিট আগে ম্যাচের সবচেয়ে সহজ সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। সুযোগ পেয়েছিলেন জার্মানিকে হারিয়ে আইভরি কোস্টকে বিশ্বকাপের নকআউটে নিয়ে যাওয়ার। সেই সুযোগ তিনি নষ্ট করেছেন। উন্ডাভ কিন্তু তা করেননি। সুপার সাব হয়ে উঠলেন। ৬০ মিনিটে বেঞ্চ থেকে নেমে জোড়া গোলে জার্মানিকে জেতালেন। পিছিয়ে পড়েও আইভরি কোস্টকে হারিয়ে বিশ্বকাপের নকআউটে জায়গা করে নিল জার্মানি। খেলা শেষে কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যান, মানুয়েল নয়ারদের উল্লাস বুঝিয়ে দিল, কতটা মরিয়া ছিলেন। ২০১৪ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়নেরা পরের দু’বার গ্রুপ টপকাতে পারেননি। প্রশ্নচিহ্ন উঠে গিয়েছিল চার বারের বিশ্বজয়ীদের সামনে। অবশেষে জবাব দিল জার্মানেরা। ফুটবলে একটা কথা প্রচলিত। জার্মানি শেষ মিনিট পর্যন্ত লড়ে। সেই ছবি সত্যিই এই ম্যাচে দেখা গেল। ম্যাচের আগে আন্তর্জাতিক ফুটবলে শেষ ন’ম্যাচ জিতেছিল জার্মানি। শেষ ম্যাচে দুধের শিশু কুরাসাওকে সাত গোলের মালা পরিয়েছিল তারা। কিন্তু আইভরি কোস্ট দেখিয়ে দিল, এই জার্মানিকেও সমস্যায় ফেলা যায়। বিশ্বফুটবলে আইভরি কোস্টকে ডাকা হয় ‘দ্য এলিফ্যান্টস’ নামে। সেই হাতির হানায় বার্লিনের দুর্গ প্রায় ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু ওই যে, ফুটবলে গোলই শেষ কথা বলে। সেখানেই পিছিয়ে পড়ল দিদিয়ের দ্রোগবার দেশ। তবে যে ফুটবল তারা টরন্টোর স্টেডিয়ামে খেলল তা মুগ্ধ করবে ফুটবলপ্রেমীদের। জার্মানির বিরুদ্ধে প্রতিআক্রমণের ছকে নেমেছিল আইভরি কোস্ট। স্বাভাবিক। বড় দলের বিরুদ্ধে অপেক্ষাকৃত ছোট দল তাই করে। কিন্তু সেই প্রতিআক্রমণ কী ভাবে হচ্ছে, তার উপরেই নির্ভর করে ছোট দল কেমন ফল করবে। সেই প্রশ্নে প্রথমার্ধে ১০-এ ১০ পাবে আইভরি কোস্ট। ইয়ান দিয়োমান্দে নজর কাড়লেন। ১৯ বছরের এই ফুটবলার কেন এ বার ইউরোপের সেরা প্রতিভাবান ফুটবলার হয়েছেন তা বোঝালেন। হাসতে হাসতে জার্মানির অ্যাটাকিং থার্ডে ঢুকছিলেন তিনি। তবে তাঁর ফাইনাল ক্রস ও ফিনিশিংয়ের সমস্যা রয়েছে। অবশ্য এখনও পরিণত হবেন এই ফুটবলার। তাঁর দিকে নজর থাকবে সকলের। প্রথমার্ধে ফ্রাঙ্ক কেসির করা গোল প্রতিআক্রমণেরই ফসল। যদিও গোল করা উচিত ছিল আমাদ দিয়ালোর। দিয়োমান্দের ক্রস গোলের সামনে পেয়েছিলেন তিনি। সেই বল নয়ার কোনও রকমে বাঁচালেও ফিরতি বলে গোল করেন কেসি। বার বার প্রান্ত ধরে আক্রমণে উঠেছে আইভরি কোস্ট। তাদের অনেক ফুটবলার প্রিমিয়ার লিগে খেলেন। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগছিল। জার্মান রক্ষণকে রীতিমতো চাপে রেখেছিলেন। প্রথমার্ধে দলের খেলায় খুশি হতে পারেননি নাগেলসম্যান। দ্বিতীয়ার্ধে ৬০ মিনিটের মাথায় তিনটি বদল করলেন তিনি। নামিয়ে দিলেন উন্ডাভ, জেমি লিউইলিং ও নাদিম আমিরিকে। জার্মান কোচের এই এক চালেই খেলার ছবি বদলে গেল। উন্ডাভ আগের ম্যাচেও বেঞ্চ থেকে নেমে গোল করেছিলেন। এই ম্যাচেও তাই করলেন।

তিনি নামার পর ডান প্রান্ত ধরে একের পর এক ক্রস তুলতে শুরু করলেন আমিরি, জোশুয়া কিমিচেরা। আমিরির তেমনই এক ক্রসে সমতা ফেরান উন্ডাভ। ম্যাচের প্রথম ৬০ মিনিটে দাপট ছিল আইভরি কোস্টের। কিন্তু ৬০ মিনিটের পর থেকে একের পর এক আক্রমণ জার্মানির। এত বড় দলের বিরুদ্ধে এতটা রক্ষণাত্মক হয়ে গেলে তার ফল তো ভুগতে হবেই। একটা ভুল করলেই গোল। সেটাই হল। তবে তার পরেও কিন্তু ড্রয়ের জন্য খেলেনি আইভরি কোস্ট। তারাও আক্রমণ ভাগে বদল করে। সেই বদলই জিতিয়ে দিচ্ছিল। নিকোলাস পেপে বল পেয়ে গতিতে সকলকে পরাস্ত করে জার্মানির বক্সে ঢোকেন। অরক্ষিত দাঁঢ়িয়ে ছিলেন আদিংরা। তিনি চলতি বলে শট নিলে হয়তো নয়ারের কিছু করার ছিল না। কিন্তু বলের নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়ে গড়বড় করে ফেলেন। শেষ তিন মিনিটে কিছুটা শ্লথ হয়ে গেল আইভরি কোস্ট। জার্মানির বিরুদ্ধে ৯০ মিনিট ধরে গতিশীল ও শারীরিক ফুটবল কিছুটা হলেও ক্লান্ত করে দিয়েছিল তাদের। সেই সুযোগটাই নিলেন উন্ডাভ। বিশ্বকাপে নিজের তিন নম্বর গোল করে জার্মানিকে নকআউটে তুললেন। প্রশ্ন রয়েছে জার্মানির রক্ষণকে ঘিরেও। দুই সাইড ব্যাক কিমিচ ও লেরয় সানে আক্রমণে বার বার উঠলেন। কিন্তু রক্ষণে তেমন দেখা গেল না তাঁদের। ফলে রক্ষণে ফাঁক ধরা পড়ল। জোনাথন তাহ, নিকো শ্লটারবেক, আন্তোনিয়ো রুডিগারদের বয়স ৩০-এর উপর। ফলে তাঁদের গতি অনেকটাই কম।

সুইডেনকে ৫-১ গোলে হারাল ডাচ ব্রিগেড। এই ফলের পর চাপ বাড়ল জাপানের উপর। টিউনিশিয়াকে হারাতেই হবে। নেদারল্যান্ডসের এই খেলাটা দেখতেই তো অভ্যস্ত সকলে। কমলা ঝড় উঠবে সবুজ মাঠে। পাস, পাস আর পাস। গতিময় ফুটবলে প্রতিপক্ষকে ফালাফালা করে ফেলা। কিন্তু আগের ম্যাচে জাপানের বিরুদ্ধে এই খেলাটা কোথায় ছিল? তার ফলও মিলেছিল। পয়েন্ট নষ্ট করতে হয়েছিল। সুইডেনের বিরুদ্ধে খোলস ছেড়ে বেরোল নেদারল্যান্ডস। সুইডেনও ভাবেনি, এ ভাবে শুরু থেকে আক্রমণ করবে নেদারল্যান্ডস। সুইডেনকে ৫-১ গোলে হারাল ডাচ ব্রিগেড। ঘটনাচক্রে আগের ম্যাচে টিউনিশিয়াকে ৫ গোল দিয়েছিল সুইডেন। পাঁচ দিন পর সেই ৫ গোল তারাই খেল। খাওয়াটাই স্বাভাবিক। গোটা ম্যাচে তাদের রক্ষণ খুঁজে পাওয়া গেল না। লিন্ডেলফের মতো অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার থাকার পরেও বার বার রক্ষণে বিস্তর ফাঁক ধরা পড়ল। আর সেই ফাঁক দিয়ে বার বার ঢুকল নেদারল্যান্ডস। জাপানের বিরুদ্ধে ক্রিসেন্সিয়ো সামারভিল গোল করার পরেও এই ম্যাচে তাঁকে শুরু থেকে খেলাননি কোচ রোনাল্ড কোমান। বদলে খেলান ব্রায়ান ব্রবিকে। বিশ্বকাপের অভিষেকেই ব্রবি বোঝালেন, কেন কোচ তাঁকে এত ভরসা করেছেন। দীর্ঘদেহী ব্রবি শারীরিক ক্ষমতায় ডিফেন্ডারদের বার বার পরাস্ত করলেন। তাঁকে সামলাতে হিমশিম খেতে হল সুইডেনের রক্ষণকে। পাশাপাশি দুর্দান্ত চোরা গতি তাঁর। খুব দ্রুত বলের কাছে পৌঁছোতে পারেন। আদর্শ বক্স স্ট্রাইকার। কোমান চাইছিলেন শুরুতেই গোল তুলে নিতে। ব্রবি সেটাই করে দেখালেন। ৫ ও ১৭ মিনিটের মাথায় জোড়া গোল করে নেদারল্যান্ডসের কাজটা সহজ করে দেন ব্রবি। দু’টি গোলের ক্ষেত্রেই তিনি ঠিক সময় ঠিক জায়গায় ছিলেন। প্রিমিয়ার লিগে সান্ডারল্যান্ডে খেলা এই স্ট্রাইকার অভিষেকে হ্যাটট্রিকও করতে পারতেন। তাঁর খেলা মুগ্ধ করল। আপাতত নেদারল্যান্ডসের বাকি সব ম্যাচে প্রথম একাদশে নিজের জায়গা পাকা করে নিয়েছেন ব্রবি। সুইডেন যে খুব খারাপ খেলেছে তা বলা যাবে না। বরং প্রথমার্ধের শেষ পাঁচ মিনিট ও দ্বিতীয়ার্ধে অন্তত ২০ মিনিট আধিপত্য দেখিয়েছে তারা। আরও এক বার নজর কাড়লেন ইয়াসিম আয়ারি। টিউনিশিয়ার বিরুদ্ধে জোড়া গোল করেছিলেন।

এই ম্যাচেও করতে পারতেন। বার বার শট মারলেন। কিন্তু তেকাঠিতে রাখতে পারলেন না। যেগুলি রাখলেন, তা ভারব্রুগেনকে পরাস্ত করতে পারল না। নেদারল্যান্ডসের জয়ের নেপথ্য নায়ক ভারব্রুগেন। আটটি শট বাঁচিয়েছেন তিনি। বিরতির ঠিক আগে গয়কেরেসের তিনটি শট বাঁচান ভারব্রুগেন। বিরতির আগে সুইডেন গোল পেয়ে গেলে হয়তো দ্বিতীয়ার্ধে খেলাটা অন্য রকম হত। প্রথমার্ধে ব্রবি যে কাজটা করেছিলেন, দ্বিতীয়ার্ধে ঠিক সেটাই করলেন কডি গ্যাকপো। ৪৭ ও ৫৪ মিনিটে জোড়া গোল করলেন। ব্যস, খেলার ফয়সালা হয়ে গেল। গ্যাকপোর গোল দু’টির ক্ষেত্রেও সুইডেনের রক্ষণ ভেঙে পড়ল। এ রকম রক্ষণ নিয়ে পরের ম্যাচে জাপানের বিপক্ষে নামতে হবে সুইডেনকে। আরও একটি কঠিন লড়াই তাদের সামনে। ভারব্রুগেন গোলের সামনে যতটা ভাল খেললেন, ততটাই খারাপ দেখাল সুইডেনের গোলরক্ষক নর্ডফিল্ডকে। অন্তত দু’টি শট বাঁচানো উচিত ছিল তাঁর। গ্যাকপোর দ্বিতীয় গোল ও সামারভিলের গোলের ক্ষেত্রে তাঁকে নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। টিউনিশিয়া সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। নেদারল্যান্ডস পেরেছে। সেখানেই বেরিয়ে পড়েছে সুইডেনের রক্ষণের ফাঁক। কোমান আরও একটি পরিকল্পনা করেছিলেন এই ম্যাচে। টর্নেডোর পূর্বাভাস থাকায় হিউস্টনের স্টেডিয়ামের ছাদ ঢাকা ছিল। ফলে হাওয়ায় শট খেললে তা সুইং করার বা ডিপ হওয়ার সম্ভাবনা কম ছিল। যে কারণে আয়ারির বেশির ভাগ শট বার উঁচিয়ে চলে গেল। কোমান তাঁরা ছেলেদের বলেছিলেন মাটিঘেঁষা শটে খেলতে। নেদারল্যান্ডসের পাঁচটি গোলই কিন্তু মাটিঘেঁষা শটে। বোঝা গেল, খেলা শুরুর আগেই আসল খেলা খেলে ফেলেছিলেন কোমান। নেদারল্যান্ডস যথন ৪-১ গোলে এগিয়ে তখন গ্যালারিতে দেখা গেল উইলিয়াম আলেকজ়ান্ডারকে। নেদারল্যান্ডসের রাজা বসেছিলেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সামনে





