আর্জেন্টিনা – ৩ (মেসি ৩)
আলজেরিয়া – ০
RK NEWZ চ্যাম্পিয়নের মতোই খেলল আর্জেন্টিনা। চ্যাম্পিয়নের মতোই খেললেন লিয়োনেল মেসি। মাঠে ছিলেন ৭৮ মিনিট। তার মধ্যেই করে ফেললেন হ্যাটট্রিক। বিশ্বকাপে প্রথম বার। মেসির পায়ে আলজেরিয়াকে হেলায় হারাল আর্জেন্টিনা। মেসি প্রথম ম্যাচেই বুঝিয়ে দিলেন, আরও এক বার চ্যাম্পিয়ন হতেই নেমেছেন। ৩৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপে খেলতে নেমেছেন। মেসি আদৌ ভাল খেলতে পারবেন তো? কত ক্ষণ খেলতে পারবেন? বিশ্বকাপের আগে চোট পেয়েছিলেন। সেই চোট কতটা সেরেছে? বেশ কিছু প্রশ্ন বিশ্বজয়ী অধিনায়ককে নিয়ে। তিন শটে তার জবাব দিয়ে দিলেন। মেসি কি শুরু থেকে খেলবেন? তার জবাব শুরুতেই দিয়ে দেন কোচ লিয়োনেল স্কালোনি। মেসিকে শুরু থেকেই নামিয়ে দেন তিনি। স্কালোনি চাইছিলেন, শুরুতেই গোল তুলে নিতে। আর তার জন্য মেসির উপরেই ভরসা রাখেন। কোচকে হতাশ করেননি মেসি। দু’দলের ডিফেন্ডারদের থেকেও বেশি পরিশ্রম করতে হচ্ছিল ভার প্রযুক্তির দায়িত্বে থাকা দলকে। ১০ মিনিটের মধ্যেই দু’দল এক বার করে গোল করে ফেলেছিল। আর্জেন্টিনার হয়ে বল জালে জড়ান মেসি। কিন্তু দু’বার অফসাইডে গোল বাতিল হয়। অর্থাৎ, ভার-এর দলকে তৎপর থাকতে হচ্ছিল। প্রথম ১০ মিনিটের মধ্যে বাতিল হল জোড়া গোল। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে। লাউতারো মার্টিনেসের বাড়ানো পাস থেকে বল পেয়ে গোলরক্ষককে ফাঁকি দিয়ে বল জালে পাঠান মেসি। আর্জেন্টিনা শিবিরে তখন উল্লাস শুরু হয়ে গেলেও সেই আনন্দ বেশিক্ষণ টেকেনি। সহকারী রেফারি অফসাইডের পতাকা তোলেন। ৮ মিনিটে প্রত্যাঘাত আলজেরিয়ারও। মাজার বাড়ানো থ্রু বল থেকে এমি মার্টিনেজকে পরাস্ত করেন চেইবি। সেই গোলও অফসাইডে বাতিল। খাতায়-কলমে শক্তিশালী দল আর্জেন্টিনা। নেপথ্যে সেই মেসি। মেসিকে মার্ক করেননি আলজেরিয়ার কোচ ভ্লাদিমির পেটকোভিচ। পাড়ার কোনও ক্লাবের কোচও এই ভুল করবেন না। অন্তত দু’জনকে মেসির পিছনে রাখবেন। তার খেসারত দিতে হল আলজেরিয়াকে। ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর কাছ থেকে থ্রু বল পেয়ে খানিকটা দৌড়ালেন মেসি। বক্সে ঢোকার চেষ্টাও করলেন না। প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে বাঁ পায়ের শটে গোল করলেন। এই ম্যাচে বিশ্বকাপে অভিষেক হল আর এক জিদানের। লুকা জিদান। ফরাসি কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানের ছেলে। আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা বলে হাত লাগালেও আটকাতে পারলেন না। ১৭ মিনিটে ১-০ গোলে এগোল আর্জেন্টিনা। প্রথম গোলের পর আর্জেন্টিনার খেলা বদলে গেল। বোঝা গেল, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার চাপ মাঠের বাইরে ছুড়ে ফেলেছেন তাঁরা। উপভোগ করছেন। বেশি ক্ষণ পায়ে বল রাখছিলেন না আর্জেন্টিনার ফুটবলারেরা। ওয়ান টাচ ফুটবল খেলছিলেন তাঁরা। বল পেলে সঙ্গে সঙ্গে সতীর্থকে দিয়ে দিচ্ছিলেন। তাতে খেলার গতি বাড়ছিল। প্রতিপক্ষ সুযোগ পাচ্ছিল না বলের দখল নেওয়ার। মেসি জানেন তাঁর বয়স হয়েছে। তাই দক্ষতার সঙ্গে বুদ্ধিও কাজে লাগাচ্ছেন তিনি। এক জায়গায় থাকছিলেন না মেসি। কখনও নীচে নেমে খেলা তৈরি করছিলেন। আবার কখনও উপরে উঠছিলেন। ফাঁকা জায়গায় থাকছিলেন তিনি। তাতে সতীর্থদের সুবিধা হচ্ছিল মেসিকে খুঁজে নিতে।

পায়ে বল পেলে দেখা যাচ্ছিল মেসির সেই চোরা গতি। গোল খাওয়ার পর শোধ করার মরিয়া চেষ্টা করে আলজেরিয়া। কিন্তু প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার রক্ষণ ভাঙতে পারেনি। দ্বিতীয়ার্ধ শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রতি আক্রমণ থেকে ভাল সুযোগ তৈরি করেছিল আর্জেন্টিনা। ডান প্রান্তে অনেকটা ফাঁকা জায়গা পেয়েছিলেন রদ্রিগো ডি পল। বক্সে ঢুকে পড়েন তিনি। ডি পল নিজেই শট মারতে পারতেন। মেসিকে খোঁজার চেষ্টা করেন। তাঁর পাস ভাল হয়নি। ফলে গোলের সুযোগ নষ্ট হয়। ৫৫ মিনিটের মাথায় আক্রমণে জোড়া বদল করেন স্কালোনি। লাউতারো মার্তিনেজ় ও থিয়াগো আলমাডার বদলে নিকোলাস গঞ্জালেজ় ও ইউলিয়ান আলভারেজ়কে নামান তিনি। আক্রমণে যাতে মেসির উপর চাপ কমে, তার জন্যই এই সিদ্ধান্ত। স্কালোনি চাইছিলেন, যত ক্ষণ সম্ভব মেসিকে মাঠে রাখতে। সেই সিদ্ধান্ত কাজে লাগে। আর্জেন্টিনার বাকি স্ট্রাইকারদের আটকাতে গিয়ে মেসিকে বার বার ছেড়ে দিচ্ছিলেন ডিফেন্ডারেরা। ৬০ মিনিটের মাথায় সুযোগসন্ধানী স্ট্রাইকারের ভূমিকায় দেখা গেল মেসিকে। যে আক্রমণ তৈরি হয়েছিল মেসির পায়ে, তা শেষও হল মেসির পায়েই। বাঁ প্রান্ত থেকে সতীর্থের উদ্দেশে পাস বাড়িয়েছিলেন মেসি। বল যায় অ্যালেক্সিস ম্যাকঅ্যালিস্টারের কাছে। জোরালো শট কোনও রকমে বাঁচান লুকা। কিন্তু ফিরতি বল আসে মেসির পায়ে। ডান পায়ে গোল করে দলকে ২-০ এগিয়ে দেন।

এ বারের বিশ্বকাপও নিজের নামে করতে নেমেছেন মেসি। ৭৬ মিনিটেই হয়ে গেল তাঁর হ্যাটট্রিক। বিশ্বকাপে প্রথম বার। মেসিকে থামাতে পারছিল না আলজেরিয়া। আরও এক বার বক্সের বাইরে বেশ খানিকটা জায়গা পান তিনি। বার বার এক ভুলের খেসারত দিতে হল আলজেরিয়াকে। বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ে নিখুঁত ফিনিশ মেসির। ৩-০ গোলে এগিয়ে গেল আর্জেন্টিনা। ফ্রান্সের খেলা না দেখে ছেলের খেলা দেখতে মাঠে ছিলেন জিদান। কয়েকটি ভাল সেভ করলেও বাবার সামনে ৩ গোল খেলেন ছেলে। এই অভিষেক ভুলতে চাইবেন লুকা। গোল করার পরেই মেসিকে তুলে নেন স্কালোনি। যে কাজের জন্য তাঁকে শুরু থেকে নামানো হয়েছিল, তা করে ফেলেছিলেন তিনি। তাই মেসিকে নিয়ে আর ঝুঁকি নেননি স্কালোনি। বেঞ্চে বসে বাকি খেলা দেখলেন মেসি। দেখলেন তাঁর দল সহজে ম্যাচ জিতে মাঠ ছাড়ল। এই আক্রমণ তৈরিই হয়েছিল মেসির পায়ে। ম্যাকঅ্যালিস্টারের জোরাল শট কোনওক্রমে বাঁচান লুকা। ফিরতি বল থেকে গোল করে ব্যবধান বাড়ান মেসি। এর ১০ মিনিট পর বিশ্বকাপে প্রথম হ্যাটট্রিকও করলেন। সব মিলিয়ে ১১টা আন্তর্জাতিক হ্যাটট্রিক হয়ে গেল মেসির। বক্সের বাইরে নিখুঁত ফিনিশিং দেখল ফুটবলবিশ্ব। তৃতীয় গোল করে বিশ্বকাপে ১৬তম গোল করলেন মেসি। ফলে মিরোস্লাভ ক্লোজের বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ ১৬ গোলের রেকর্ডও ছুঁয়ে ফেললেন। প্রথম ম্যাচেই আর্জেন্টিনা বুঝিয়ে দিল, চ্যাম্পিয়ন হতে নেমেছে তারা। প্রথম ম্যাচেই মেসি বুঝিয়ে দিলেন, চ্যাম্পিয়ন হতে নেমেছেন।

বাবা ফ্রান্সের সর্বকালের সেরা, ছেলে আলজেরিয়ার গোলের নীচে। আলজেরিয়ার গোলরক্ষকের নাম লুকা জিদান। বাবার নাম জিনেদিন জ়িদান। ফ্রান্সের সর্বকালের সেরা ফুটবলার। কিন্তু লুকা মায়ের দেশের হয়ে বিশ্বকাপ খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।





