RK NEWZ পদ্ম জমানায় জেলায় জেলায় বিজেপির নতুন কোর কমিটিগুলি বামেদের দেখানো সেই পথেই হাঁটবে কি না, তা এখনও বলার সময় আসেনি। তবে এই কমিটিগুলি সরকারি কাজকর্ম বা উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয়ে যে রকম সিদ্ধান্ত নেবে, তার প্রভাব যে স্থানীয় প্রশাসনের গতিবিধির উপরে থাকবে, সে কথা বিজেপি নেতারাও অস্বীকার করছেন না। বাম জমানায় সরকার তথা প্রশাসন এবং দল (সিপিএম) তথা সংগঠনের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত সীমারেখা আপাতদৃষ্টিতে বহাল রাখা হত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজত্বে যেমন তৃণমূল আর প্রশাসন মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল, বামফ্রন্ট শাসনে আপাতদৃষ্টিতে অন্তত তেমনটা হত না। সরকারি সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপের কথা জ্যোতি বসু বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যেরা মহাকরণ থেকে ঘোষণা করতেন। আর দলীয় নীতি বা সিদ্ধান্ত ঘোষিত হত আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের মুজফ্ফর আহমেদ ভবন থেকে। প্রমোদ দাশগুপ্ত, সরোজ মুখোপাধ্যায়, শৈলেন দাশগুপ্ত, অনিল বিশ্বাস, বিমান বসুরাই সে সব করতেন। যদিও বিরোধী শিবির বরাবরই অভিযোগ করত যে, সিপিএম রাজ্য প্রশাসনের ‘চূড়ান্ত রাজনৈতিকীকরণ’ ঘটিয়েছে। ‘দলদাস পুলিশ’ বা ‘শিক্ষায় অনিলায়ন’ গোছের শব্দবন্ধের উদ্ভব সে সময়েই। কোর কমিটি গঠনের লক্ষ্য সংক্রান্ত বিষয়ে রাজ্য বিজেপির তরফে আনুষ্ঠানিক ভাবে কেউ কোনও মন্তব্য করতে চাননি। তবে একাধিক জেলা সভাপতি জানাচ্ছেন, সংগঠনের সঙ্গে বিধায়কদের সমন্বয় তৈরি করতেই এই কমিটি গঠন করা হচ্ছে। কারণ, জেলায় জেলায় বা রাজ্য স্তরে যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদে রয়েছেন, এ বারের ভোটে তাঁদের টিকিট না-দেওয়ার নীতি নিয়েছিল বিজেপি। অপরপক্ষে, যাঁরা টিকিট পেয়েছেন এবং জিতে বিধায়ক হয়ে এসেছেন, সংগঠনে তাঁরা কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদে নেই। তাই সাংগঠনিক পদাধিকারীরা এবং বিধায়কেরা যদি নিজেদের মতো চলতে থাকেন, তা হলে দুটো সমান্তরাল ধারা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা। কোনও প্রশাসনিক বা সরকারি কাজের বিষয়ে দল কী নীতি নিয়েছে, সে বিষয়ে বিধায়কেরা অবহিত না-থাকতে পারেন। আবার বিধায়কেরা নিজের নিজের এলাকায় প্রশাসনিক কাজের তত্ত্বাবধান কী ভাবে করছেন, সে বিষয়ে সংগঠন অন্ধকারে থাকতে পারে। এই পরিস্থিতি এড়াতেই কোর কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে বিজেপি সূত্রের ব্যাখ্যা। কোর কমিটির বৈঠকে যে কোনও কাজের বিষয়ে দলের নীতি তথা নির্দেশ বিধায়কদের কাছে পৌঁছে যাবে। আবার প্রশাসনিক গতিবিধির খোঁজখবরও বিধায়কদের মাধ্যমে দলের কাছে পৌঁছে যাবে। এতে শুধু সংগঠন এবং বিধায়কদের মধ্যে সমন্বয় বাড়বে না, তার সঙ্গে এলাকায় এলাকায় প্রশাসনিক গতিবিধির উপরে বিজেপির স্থানীয় নেতৃত্বের নজরদারি তথা নিয়ন্ত্রণও সুনিশ্চিত হবে। কোর কমিটি গড়ার জন্য বনসল ১০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। ২৫ মে-র মধ্যে সব জেলায় কমিটি গড়ে ফেলতে হবে বলে গত ১৫ মে তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন। বিজেপি সূত্রে খবর, প্রায় সর্বত্রই কমিটি সদস্যদের নাম চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছে। কারণ, এই কমিটির সদস্য কারা হবেন, তা নিজেদের মতো করে বাছাই করার কোনও অবকাশ নেই। নেতৃত্বই তা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। জেলা সভাপতি, জেলা পর্যবেক্ষক, জেলা সাধারণ সম্পাদকেরা কমিটিতে থাকবেন। আর থাকবেন ওই সাংগঠনিক জেলার বিজেপি সাংসদ ও বিধায়কেরা।
বনসলের নির্দেশ জারি হওয়ার পরে অনেকে ভেবেছিলেন যে, জেলা সভাপতিরা যাতে নিজের নিজের জেলায় একতরফা সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দল চালাতে না-পারেন, তার জন্যই এই নতুন বন্দোবস্ত। আগে দল ছোট ছিল, বিধায়ক সংখ্যা কম ছিল। এখন তা বেড়ে প্রায় আগের তিনগুণ হয়েছে। তাই নানা সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে এখন থেকে জনপ্রতিনিধিদের মতামতের গুরুত্ব যাতে বাড়ে, বনসল বা শমীক ভট্টাচার্যেরা তা নিশ্চিত করতে চাইছেন বলে অনেকে প্রথমে মনে করছিলেন। কিন্তু বিজেপি সূত্রে পরে জানা গিয়েছে যে, আসলে দল এবং প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হল মূল লক্ষ্য। প্রথমে গড়েছিলেন সংগঠনের ভিত। তার পরে মাসের পর মাস ধরে লাগাতার প্রচেষ্টা চালিয়ে সংগঠনের কাঠামোকে পূর্ণতা দিয়েছিলেন। সংগঠনকে মজবুত করেছিলেন। তাই গত ১৫ মে সুনীল বনসল যখন রাজ্য বিজেপি-কে জেলায় জেলায় কোর কমিটি গড়ার নির্দেশ দিলেন, তখন সকলে ভেবেছিলেন, সংগঠনকে আরও মজবুত করার চেষ্টা করছেন কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক। কিন্তু কমিটি গড়ার সময়সীমা শেষ হওয়ার পরে স্পষ্ট হল, এ বারের নির্দেশ শুধুমাত্র সাংগঠনিক ‘শক্তিবৃদ্ধি’ সংক্রান্ত নয়। এ নির্দেশ আসলে সংগঠনের ‘প্রভাব বৃদ্ধি’র লক্ষ্যে। জেলায় জেলায় দল এবং প্রশাসনের মধ্যে অদৃশ্য অথচ মসৃণ সমন্বয় তৈরির করতে চলেছে বিজেপির এই নতুন জেলা কোর কমিটিগুলি। ৪ মে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষিত হয়েছে। তার পর থেকে রাজ্যের অধিকাংশ এলাকায় পুরসভা এবং পঞ্চায়েতগুলির তৃণমূল সদস্য বা প্রধানেরা কার্যত ‘অকেজো’ হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ। কেউ দফতরে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। কেউ বিক্ষোভের মুখে পড়েছেন। কেউ ভোট পরবর্তী হিংসার অভিযোগে, কেউ দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন। একাধিক পুরসভায় তৃণমূল কাউন্সিলরদের গণইস্তফার ঘটনাও ঘটে গিয়েছে। এ হেন পরিস্থিতিতে পুর পরিষেবা বা পঞ্চায়েতি কাজকর্ম যাতে বন্ধ না-হয়ে যায়, তা নিশ্চিত করতে চাইছে সরকার এবং বিজেপি। সর্বত্র সরকারি পরিষেবা মসৃণ রাখতে বিধায়কেরা উদ্যোগী হবেন বলে রাজ্যের নতুন শাসক দলের তরফ থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে। বিধায়কেরা সে কাজে তৎপরও হয়েছেন। বিজেপির জেলা কোর কমিটিগুলি সেই উদ্যোগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছে বলে খবর।





