২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দুর প্রতিপক্ষ ছিলেন খোদ তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুভেন্দুর কাছে হেরে যান মমতা। এবারও নন্দীগ্রামের প্রার্থী বাছাইতে যে তৃণমূল বিচক্ষণতার সঙ্গেই সিদ্ধান্ত, তেমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। বাংলার রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রের নাম নন্দীগ্রাম। কলকাতা থেকে ১৩০ কিলোমিটার দূরের এই কেন্দ্র ২০২৬-এর ভোটেও চর্চার কেন্দ্রে উঠে আসছে নন্দীগ্রামের নাম। বিদায়ী বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, নন্দীগ্রাম তিনি ছাড়বেন না। সোমবার প্রার্থী তালিকা প্রকাশ হওয়ার পর দেখা গেল, তাঁর সেই ইচ্ছাতেই মান্যতা দিয়েছে বিজেপি। একসঙ্গে দুই কেন্দ্রে লড়ছেন। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম নিয়েও জল্পনা তৈরি হয়েছিল। তবে ভূমিপুত্রেই ভরসা রাখছে তৃণমূল। বিজেপিতে যোগ দেবেন নন্দীগ্রাম দুই ব্লকের বিজেপি নেতা পবিত্র কর। শুভেন্দু অধিকারী ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর তাঁকেই প্রার্থী করা হবে বলে জল্পনা। আগেও তৃণমূলেই ছিলেন তিনি। ২০১৮ সালে তিনি ছিলেন বয়াল দুই গ্রামের প্রধান। পরে ২০২১ সালে শুভেন্দুর হাত ধরে বিজেপিতে যোগ দেন তিনি। ২০২৩-এ পবিত্র করের স্ত্রী বিজেপির টিকিটে জয়ী হয়ে বয়াল দুই গ্রাম পঞ্চায়েতে প্রধান হন। নন্দীগ্রাম বিধানসভা দু’টি ব্লক নিয়ে গঠিত। শুধুমাত্র নন্দীগ্রাম ২ ব্লকেই বিজেপি এগিয়ে। সেই ব্লকেরই বাসিন্দা পবিত্র কর। তমলুক সাংগঠনিক জেলা বিজেপির অন্যতম পদাধিকারীও তিনি। এলাকায় তাঁর যথেষ্ট পরিচিতি রয়েছে। তৃণমূলে থাকার সময় থেকেই ওই এলাকায় জনপ্রিয় মুখ তিনি। কিছুদিন আগেই আইপ্যাকের সঙ্গে তাঁর গোপন বৈঠকের কথা ছড়িয়ে পড়ে। বিজেপির একটি সূত্রের খবর, এই খবর জানার পর শুভেন্দু অধিকারীও তাঁর এই অনুগামী নেতার সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন। ছোট্ট চেহারার মানুষ পবিত্র কর মুখে মৃদু হাসি নিয়ে কাজ করে যান। বেশি প্রচারে থাকেন না কোনওদিনই, কাজ করেন নিঃশব্দে।
২০২১-এ গোটা রাজ্যের নজর ছিল নন্দীগ্রামে। সবাইকে চমকে দিয়ে নিজের নাম প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাকি ইতিহাস সবারই জানা। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হলেও শেষ পর্যন্ত জেতা হয়নি মমতার। পাঁচ বছর বাদে অনেক কিছু বদলেছে। কিন্তু এবারও হয়ত মমতার প্রতিপক্ষ থাকবে একই। কারণ ভবানীপুরে শুভেন্দু অধিকারীকে টিকিট দিয়েছে বিজেপি। সূত্রের খবর, শুভেন্দু নিজে নন্দীগ্রাম থেকে লড়তে চাইলেও, তাঁকে ভবানীপুরে লড়ানোর কথা ভেবেছিল গেরুয়া শিবির। ভবানীপুর কেন্দ্র নিয়ে জল্পনা অনেকদিন ধরেই ছিল। ভবানীপুরে কর্মসূচিতেও যোগ দিতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। সরস্বতী পুজোয় ভবানীপুরের একাধিক মণ্ডপে ঘোরাফেরা করতে দেখা গিয়েছে। ২০২১-এর ভোটের আগে নন্দীগ্রামে পড়ে থেকে প্রচার করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নন্দীগ্রাম থেকে বেরিয়ে খুব বেশি প্রচারে যেতে পারেননি তিনি। কিন্তু তৃণমূল সুপ্রিমো নিজেকে ২৯৪টা কেন্দ্রের প্রার্থী বলে দাবি করেন। সে ক্ষেত্রে সবকটা কেন্দ্রে তাঁর প্রচার করাও জরুরি। এবার কি তবে ভবানীপুরে আটকে রাখতেই এমন একটা চাল দিল বিজেপি?
বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর গড় বলেই পরিচিত পূর্ব মেদিনীপুরের একাধিক জায়গা। বিশেষ করে কাঁথি–তমলুক এলাকাকে শুভেন্দুর গড় হিসাবে এক ডাকে মানুষ চেনেন-জানেন। মূলত, রাজনীতিতে গড় বলতে এমন একটি অঞ্চলকে বোঝায় যেখানে কোনও নেতা বা দলের দীর্ঘদিনের শক্তিশালী প্রভাব থাকে। আর সেই অর্থে দেখতে গেলে শুভেন্দুদের গড় এই উপকূলের জেলা। তমলুকে লড়াই করবেন সিপিআই প্রার্থী নবেন্দু ঘড়া। অপরদিকে ময়নায় লড়ছেন সিপিআই প্রার্থী স্বপন বর্মন। সিপিএম-এর অশোক পাত্র লড়ছেন হলদিয়া থেকে। আবার পটাশপুরে লড়বেন সৈকত গিরি। তিনি সিপিআই প্রার্থী। কাঁথি উত্তর অর্থাৎ যেখানে শুভেন্দু অধিকারীর বাড়ি, তাঁর এলাকায় লড়ছেন সিপিএম-এর সুতনু মাইতি অন্যদিকে, কাঁথি দক্ষিণে সিপিআই প্রার্থী তেহরান হোসেন লড়বেন। অশোক কুমার মাইতি রাম নগরে লড়াই করবেন। রামনগর, কাঁথি উত্তর, কাঁথি দক্ষিণ, কাঁথি পূর্ব ,খেজুরি, এগরা, তমলুকে অধিকারী পরিবারের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। শুভেন্দুর বাবা শিশির অধিকারী এবং ভাই দিব্যেন্দু অধিকারীরাও এখানকার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলনের পর এই এলাকায় শুভেন্দু অধিকারীর জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়। সেখানেই এবার প্রার্থী দিল বামেরা।




