‘‘বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যবাসীর সমস্ত কষ্ট দূর করব। কথা দিচ্ছি। সরকারে এলে আমাদের প্রথম কাজ হবে আলুচাষিদের জন্য। অনেক মুখ্যমন্ত্রী দেখেছি। এমন কাউকে দেখিনি, যিনি এত মিথ্যা কথা বলেন।’’ রাজ্য সরকারের যুবসাথী প্রকল্পে দেড় হাজার টাকাকে কটাক্ষ করেন অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্ত্তী। দিলীপ ঘোষ ব্রিগেডের মঞ্চে বলেন, ‘‘চোর-ডাকাতের সরকারকে বিদায় দিতে হবে। পশ্চিমবঙ্গকে বিজেপির হাতে তুলে দিন। আমরা রাজ্যে স্বপ্নের পরিবর্তন করব। আপনার ছেলে বাড়ি ছেড়ে গুজরাত বা অন্য কোথাও চাকরি করতে যাবে না। পশ্চিম ভারতে, দক্ষিণ ভারতে অনেকে চাকরি করতে যান। গত দু’মাসে প্রধানমন্ত্রী এই রাজ্যকে ১২টি ট্রেন দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্প ঘোষণা করছেন। প্রথম বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেন বাঙালিকে দিয়েছেন মোদী। রাজ্যে অনেক বিমানবন্দর করে দেওয়া হয়েছে। যাতায়াতের প্রভুত উন্নতি হয়েছে। এখানকার সরকারকে দেখে কোনও শিল্পপতি রাজ্যে আসেন না। তৃণমূল নিজেকে ভগবান মনে করছে।’’ লকেট চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘পরিবর্তন যাত্রাতেই আমরা টের পেয়েছি, মানুষ আমাদের সঙ্গে আছে। অবশ্যই রাজ্যে পরিবর্তন আমরা আনব।’’ সুকান্ত মজুমদার তৃণমূলকে চাঁছাছোলা ভাষায় আক্রমণ করে বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী কৃষকসম্মান নিধিতে ১৩ হাজার কোটি টাকা কৃষকদের অ্যাকাউন্টে দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী কি এগুলো দেখতে পান না? উল্টে আলুচাষিদের বঞ্চনা করছেন আপনি। আলুর দাম কমে গিয়েছে রাজ্যে। আলুচাষিরা হাহাকার করছেন। বিজেপি সরকার তৈরি হলে আলুর সহায়ক মূল্যের ব্যবস্থা করতে হবে। পশ্চিমবঙ্গকে পশ্চিম বাংলাদেশ না করতে চাইলে বিজেপির সরকার গড়ুন।’’ বক্তৃতার শেষে ‘পাঁচালি’ পড়ে শোনান সুকান্ত। তাপস রায় কড়া ভাষায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ করে বলেন, ‘‘হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথার কোনও ফারাক নেই।’ বাঙালি-অবাঙালি তফাতে বিশ্বাস না করার বার্তা দেন তাপস। অগ্নিমিত্রা পল বলেন, ‘‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বাঁচানোর জন্য বৈধ ভোটারদের নাম তুলতে দিলেন না। যোগ্য শিক্ষকদের চাকরি চুরি করে অযোগ্যদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ধর্ষিতা মহিলাদের পাশে দাঁড়াননি। অত্যাচারীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এ রাজ্যের মানুষ আপনার উপর ভরসা করেছিল। আপনি পশ্চিমবঙ্গকে শ্মশানে পরিণত করেছেন। তৃণমূলের সভায় লোক আনা ছাড়া পুলিশের আর কোনও কাজ নেই। সাধারণ মানুষের কথা ওরা শোনে না। মুখ্যমন্ত্রী আপনি কি ১৯৪৬ সালের ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে ফিরিয়ে আনতে চান? তা হলে চলুন আমরা সবাই গোপাল পাঁঠা হই!’’ শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘‘এই সভা থেকে পরিবর্তনের সঙ্কল্প নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী আমাদের ১৮ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন উপহার দিয়েছেন। বাংলার হৃতগৌরব ফেরাবে বিজেপি। মোদীজির নেতৃত্বে আমরা ডবল ইঞ্জিন সরকার গঠন করব।’’ বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘আমাদের একটাই লক্ষ্য: ২০২৬ সালের নির্বাচন, তৃণমূলের বিসর্জন। এটা কোনও ধর্মশালা নয়। এ দেশের মানুষকেই আমরা এ দেশে রাখব, ভোটার তালিকায় রাখব।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘রাজ্যে বিজেপি আসছে। এটা কালের দেওয়াল লিখন। একে কেউ বদলাতে পারবে না।’’ রাষ্ট্রপতিকে অপমান নিয়েও তৃণমূলকে কটাক্ষ করেন।
২০২১ সালের বিধানসভা ভোট এবং ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে বিজেপির বিরুদ্ধে বাঙালি অস্মিতাকেই হাতিয়ার করে প্রচারের নীলনকশা সাজিয়েছিল তৃণমূল। জোড়াফুল শিবির এই ভাষ্য তৈরি করতে চেয়েছিল যে, বাঙালি উত্তরমেরুতে থাকলে বিজেপি দক্ষিণমেরুর দল। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগেও সেই বাংলা এবং বাঙালির সরণিতেই হাঁটছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই নিরিখে বিজেপির ব্রিগেডে হিন্দুত্বের সঙ্গে বাঙালিয়ানার মিশেল এবং হিন্দু বাঙালি বা বাঙালি হিন্দুর কথা তুলে ধরা ‘তাৎপর্যপূর্ণ’। রবীন্দ্রনাথের পদবি বলার সময়ে ‘টেগোর’ উচ্চারণ করতেন মোদী। কিন্তু রবিবার সেই মোদীই বললেন ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’। মঞ্চে মোদীকে রজনীগন্ধার মালা পরিয়ে বরণ করলেন রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। যে রজনীগন্ধা ফুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে বাঙালি অনুষঙ্গ। মোদীর হাতে শিল্পী সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়ের আঁকা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতিও তুলে দেন শমীক। ঘটনাচক্রে, সংসদে মোদীর ‘বঙ্কিমদা’ মন্তব্য নিয়েই সাহিত্যসম্রাটের অপমানের অভিযোগ তুলে সরব হয়েছিল তৃণমূল। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী মোদীর হাতে তুলে দিলেন দুর্গাঠাকুরের মূর্তি। বিশাল মঞ্চের প্রেক্ষাপটে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের প্রতিকৃতি। মঞ্চের এক পাশে বাঁকুড়ার ঐতিহ্য টেরাকোটা এবং অন্য দিকে চা বাগানের সংস্কৃতি। ‘জয় শ্রীরাম’-এর পাশাপাশি ব্রিগেডের বক্তাদের মুখে শোনা গেল ‘জয় মা কালী’, ‘জয় মা দুর্গা’। বক্তৃতায় মোদী সরাসরি অভিযোগ করলেন, তৃণমূলের জমানায় পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাস বদলে যাওয়ার কারণেই বাঙালি হিন্দুরা বিপন্ন! তাঁর কথায়, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাস দ্রুত বদলে দেওয়া হচ্ছে। সেই কারণেই বাঙালি হিন্দুর সংখ্যা কমছে।’’ অর্থাৎ শুধু হিন্দু নয়, বাঙালি হিন্দু। এখানেই শেষ নয়। এর সঙ্গেই মোদী জুড়ে দিলেন স্বাধীনতার সময়ে দেশভাগ এবং তার পরবর্তী সময়ে পশ্চিমবাংলার পরিস্থিতির কথা। মোদী বললেন, ‘‘স্বাধীনতার পরে বিভাজন, হিংসার আগুন, অনুপ্রবেশ দেখেছে পশ্চিমবাংলার মানুষ। তাঁরাই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। আর যখন হিন্দু শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তখন তৃণমূল তার বিরোধিতা করছে।’’ অনেকের বক্তব্য, এই কথার মধ্য দিয়ে মোদী আসলে উদ্বাস্তু অধ্যুষিত এলাকার মানুষ এবং সমাজের মতুয়া অংশকে ছুঁতে চেয়েছেন। যেখানে জুড়ে রয়েছে হিন্দু-বাঙালিদের বিষয়।
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন থেকেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ‘ধর্মীয় মেরুকরণ’ চলছে। প্রাথমিক ভাবে তৃণমূলকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্যে বামেদের যে ভোট বিজেপিতে গিয়েছিল, ক্রমে তাকে বিজেপি হিন্দু ভোটে পরিণত করতে পেরেছে বলে অভিমত অনেকের। কিন্তু তার পর থেকে যে দু’টি বড় নির্বাচন হয়েছে, সেখানে তৃণমূল বাঙালি গরিমাকেই তুলে ধরেছিল। সে দিক থেকে বিজেপি ছিল তাদের চিরাচরিত হিন্দুত্বের লাইনেই। কিন্তু ২০২৬ সালের আগে সেই অভিমুখে মোচড় ঘটে গেল ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড থেকে। সভার আগে-পরে সেই বাঙালিয়ানার রেশ ধরেই দূর দূর থেকে আসা কর্মী-সমর্থকেরা পেটপুজো সারলেন ডিম-ভাত অথবা মুরগির ঝোল-ভাত দিয়ে। তথাকথিত ‘নিরামিষ’ ভোজনের উত্তর ভারতীয় হিন্দুত্ব সেখানেও ঠাঁই পায়নি। ব্রিগেডে বিজেপির সভায় আরও একটি বিষয় চোখে পড়ার মতো ছিল। তা হল, গ্রামের বাঙালির সমাগম। গত লোকসভা ভোটে বিজেপি-কে পিছনে ফেলে তৃণমূল আসনসংখ্যায় এগিয়ে থাকলেও ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছিল, পদ্মশিবির শহরাঞ্চলে এগিয়ে ছিল। যদিও গ্রামাঞ্চলের সমর্থন দিয়ে তা ম্লান করে দিয়েছিল রাজ্যের শাসকদল। কিন্তু শনিবার বিজেপির সংগঠিত ব্রিগেডে সেই গ্রামাঞ্চল থেকে আগত মুখের ভিড় ছিল নজরে পড়ার মতো। গ্রামের জমায়েত ব্রিগেডে নজর কাড়লেও ভোটবাক্সে তার প্রতিফলন হবে কিনা, তা স্পষ্ট নয়। অনেক সময়েই ব্রিগেডের ভিড় দিয়ে ভোট মাপা যায় না। সিপিএমের আমলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকে ব্রিগেড সমাবেশে যা ভিড় হয়েছিল, সেই ভিড় ভোটবাক্সে গেলে রাজ্যে আরও আগে ক্ষমতার পালাবদল হয়ে যেতে পারত। ব্রিগেডে ভিড় করেছিল সিপিএমও। কিন্তু তার পরেও ভোটে তাদের খাতা খোলেনি। তবে শনিবারের ব্রিগেডে বিজেপি এটা বোঝাতে পেরেছে যে, তারা কট্টর হিন্দুত্বের লাইন ছেড়ে নরম বাঙালি হিন্দুয়ানির লাইন নিচ্ছে। তাতে যদি বাঙালি ভোটারদের মন পাওয়া যায়।





