আশির দশকের কথা। গোটা দেশে ইন্দিরা গান্ধী এবং রাজীব গান্ধীর কংগ্রেস তখনও দাপটে রাজত্ব করছে। ভোটের সময় কংগ্রেসের প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে ছিল অনেক জল্পনা-কল্পনা, টানাপোড়েন, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। এমনকী, বেশিরভাগ সময়ই লোকসভা নির্বাচনের প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটি হত নয়াদিল্লিতে। আজ সেই পর্বেরই কিছু কথা, স্মৃতি। পশ্চিমবঙ্গে আজকের প্রজন্ম যে কংগ্রেস দলকে দেখছে, যেন এক ধ্বংসাবশেষ। টিমটিম করে জ্বলছে এক খণ্ডহরের মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রদীপ। কংগ্রেস একটি সর্বভারতীয় দল। সেই কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির রাজনৈতিক গুরুত্ব তখনও ছিল যথেষ্ট। সুতরাং, লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ে ইন্দিরা গান্ধী থেকে রাজীব গান্ধীর ভূমিকা থাকত। বিশেষত লোকসভা নির্বাচন মানে পার্লামেন্টের ভোট। যাঁরা জিতবেন, তাঁরা সংসদীয় দলে আসবেন। প্রধানমন্ত্রীকে আর দলের সভাপতিকে নিয়েই তাঁদের কাজ করতে হবে। প্রণব মুখোপাধ্যায় যেমন সেসময় নেহরু-গান্ধী পরিবারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেসের আরেক নেতা ছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ ঘনিষ্ঠ। সেই মানুষটি প্রণব মুখোপাধ্যায় দিল্লিতে থেকে গিয়েছেন। রাজ্য-রাজনীতিতে সেভাবে অংশ নেননি। শেষ জীবনে রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। তার ফলে এখনও সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে প্রণব মুখোপাধ্যায়কে মানুষ স্মরণ করেন। রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রণববাবুর নামে লাইব্রেরি, এমনকী, একটি রাস্তাও আছে। বরকত গণি খান চৌধুরীকে হয়তো মালদার কিছু প্রবীণ মানুষ এখনও স্মরণ করেন। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের সময় অথবা সাধারণ সময়েও বরকত গণি খান চৌধুরী খুব একটা আলোচ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন না।
১৯৮৯ সালের লোকসভা নির্বাচন। দিল্লিতে কংগ্রেস সংসদীয় বোর্ডের বৈঠক হচ্ছে। সেই বৈঠকে সব রাজ্যের দলীয় প্রার্থীদের নামের তালিকা চূড়ান্ত হবে। সেটাই ছিল তখন কংগ্রেসের রীতি। পশ্চিমবঙ্গ থেকে সংসদীয় বোর্ডের সদস্য তিনজন। প্রণব মুখোপাধ্যায়, বিধানসভায় কংগ্রেস পরিষদীয় দলনেতা ছিলেন আবদুস সাত্তার আর ছিলেন বরকত গণি খান চৌধুরী। সাত্তার সাহেব প্রণববাবুকে তেমন পছন্দ করতেন না। কিন্তু সোমেন মিত্রের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল মধুর। সাত্তার সাহেব থাকতেন বিশপ লেফ্রয় রোডে, যে-বাড়িতে সত্যজিৎ রায় থাকতেন সেই বাড়িতেই। বরকত গণি খান চৌধুরী ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা। পরবর্তীকালে রাজীব গান্ধী তাঁকে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতিও করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের বৈঠক হচ্ছে অনেক দেরিতে। ডিনারের পর। তার ফলে বেশ রাত হচ্ছে। আসন্ন বাংলার লোকসভা নির্বাচনে কে কোথায় প্রার্থী হবেন। সোমেন মিত্র তাঁর সেনাপতি আবদুল মান্নান বরকত সাহেবের বাংলোতে সংসদীয় বোর্ডের ভিতর, ১২ নম্বর আকবর রোড। বরকত গণি খান চৌধুরীর বাড়িতে সোমেন মিত্র অপেক্ষা করছেন। বরকত গণি খান চৌধুরীর একজন ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন। নাম সাধন মণ্ডল। বারবার চায়ের ব্যবস্থা করছেন। রাত তখন প্রায় সাড়ে ১২টা। আকবর রোডের গাড়ি বারান্দায় বরকত সাহেবের গাড়ি এসে ঢুকল। উনি ঘুম চোখে গাড়ি থেকে নামলেন। চোখ-মুখ দেখে মনে হচ্ছে যেন ক্লান্ত। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন। অনেকক্ষণ ধরে ওই সাদা ফরাসে বসে থাকায় খুব কষ্ট! তখন নেতাদের বসতে হত পুরনো নেহরু-গান্ধী আমলের স্টাইল মেনে সাদা ফরাসে। এখন সেই প্রথা উঠে গিয়েছে। এখন তো টেবিল-চেয়ারে বসে ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক হয়। এই সাদা ফরাস পেতে এআইসিসির অধিবেশনের কৌলিন্য তখনও ছিল। কিন্তু ওইভাবে তাকিয়া নিয়ে বসলেও বরকত সাহেবের জন্য সেটা ছিল খুব কষ্টের।
৪২টি আসনে কে কোথায় প্রার্থী? কলকাতার একটা কেন্দ্রে প্রস্তাবিত প্রার্থীদের নামের তালিকা পড়ে গেলেন বরকত সাহেব। সেই তালিকায় একটা কেন্দ্রে ১১টা নাম। সোমেন মিত্র জানতে চাইলেন, কার নাম ফাইনাল হল? ১১টা নাম তো আমরাও জানি। স্ট্রোক দিয়ে দিয়ে নামটা আছে। কোন নামটা বোর্ডে ক্লিয়ার হল? বরকত সাহেব সোমেন মিত্রকে বললেন, আমি তো ঘুমোচ্ছিলাম। বিনা মেঘে যেন বজ্রপাত! সোমেনবাবু বরকত সাহেবকে বললেন, ‘‘আপনি কি পুরো মিটিংটাতেই ঘুমিয়েই কাটালেন?” এবারে বরকত সাহেব বললেন, ‘‘না-না-না। সারাক্ষণ যে ঘুমিয়েছি এমন নয়। বাঁকুড়ার কোনও একটা আসনে যখন নাম ফাইনাল হচ্ছিল তখন একবার ঘুম ভেঙেছিল। তখন দেখলাম, সাত্তার ওঁদের সাপোর্ট করছে।’’ তখন বরকত গণি খান চৌধুরী ছিলেন ঘোরতর সাত্তার বিরোধী। সাত্তার সমর্থন করছেন দেখে বললেন যে, ‘‘সাত্তার যদি এই নাম ফাইনাল করে তবে আমি পদত্যাগ করব।’’ তখন রাজীব গান্ধী বললেন, ‘‘সে কী! বরকত সাহেব যদি রাজি না হন, তবে সে নাম কেটে দাও। আর যার নাম বাঁকুড়া আসনে আছে তাঁর নাম চূড়ান্ত করে দাও।’’
রাজীব তখন কংগ্রেস সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রীও। বরকত গণি খান চৌধুরী কোনও প্রার্থীকেই চিনতেন না। সোমেন মিত্র যেভাবে তাঁকে বলেছেন, সেইভাবে তালিকা তাঁর হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি ঘুমিয়ে পড়ায় এমন সব প্রার্থী সেবার টিকিট পেল যাঁরা সব সোমেন মিত্রের ঘোরতর বিরুদ্ধে। অতএব কংগ্রেসের যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব সেই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে তাঁরা সব ‘সোমেন বিরোধী’ নেতা বলে পরিচিত। ফলে সোমেন তো প্রচণ্ড চটে গেলেন। বরকত সাহেবকে বললেন, ‘‘এভাবে যদি আপনি ঘুমোন তবে ভোটটা করব কী করে?’’ ওখান থেকে সোমেন মিত্র বরকত গণি খান চৌধুরীকে ছেড়ে সোজা সার্কুলার রোডে রাজ্য সরকারের অতিথিশালায়, মানে বঙ্গভবন গেলেন। যাকে এখনও ‘বঙ্গভবন’ বলা হয়। সেখানে সাত্তার সাহেব ছিলেন। ওখানে জ্যোতি বসুও থাকতেন। বঙ্গভবনে গিয়ে জানতে পারা গেল, কার কার তালিকায় নাম চূড়ান্ত হয়েছে।
কংগ্রেসের যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব সেই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে তাঁরা সব ‘সোমেন বিরোধী’ নেতা বলে পরিচিত। ফলে সোমেন তো প্রচণ্ড চটে গেলেন। কাজেই এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বরকত গণি খান চৌধুরীর কোনও অগ্রাধিকারই ছিল না। তিনি বৈঠককে একেবারেই কোনওরকম গ্রাহ্য না-করে ঘুমিয়ে গিয়েছেন। আসলে বরকত গণি খান চৌধুরীর রাজনীতির স্টাইলটাই অন্যরকম ছিল। আর সোমেন মিত্র তাঁকে ভীষণভাবে সেই সময় নিয়ন্ত্রণ করতেন। বরকত গণি খান চৌধুরীর মনস্তত্ত্ব সোমেন মিত্র খুব ভালো বুঝতেন। কিন্তু সেসময় ভোটের রাজনীতিতে দিল্লির ভূমিকা ছিল যে কতটা সাংঘাতিক, সেটা বোঝা যাচ্ছে যে, রাজীব গান্ধী নিজে বৈঠক করে ৪২টি আসনে লোকসভা প্রার্থী ঠিক করছেন। রাজীব গান্ধী সেই সময় কম্পিউটার চালু করেছিলেন। প্রত্যেকটা প্রার্থীর ব্যাকগ্রাউন্ড, সামাজিক পরিচিতি সমস্ত কিছু দেখেশুনে তারপর প্রার্থী বাছাই হবে। রাজীব গান্ধী কিন্তু প্রার্থী বাছাইয়ে একটা আধুনিকতা আনতে চেয়েছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর সময়ে কংগ্রেসে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বেড়ে গিয়েছিল এবং অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন যে, নেহরুর মৃত্যুর পর কংগ্রেসে ইন্দিরা গান্ধী রাশ ধরলেন শেষ পর্যন্ত, সঙ্গে সঙ্গে কংগ্রেসের যে অতীতের পুরনো সংস্কৃতি যা স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্দোলনের সময় থেকে কংগ্রেসের মধ্যে বিকশিত হয়েছিল, সেই কংগ্রেসের অধ্যায় কিন্তু সমাপ্তি হল। অনেকে বলেছেন যে, ইন্দিরা গান্ধী কংগ্রেসে নিয়ে এসেছিলেন, ‘এন্ড অফ ইনোসেন্স’। অর্থাৎ কংগ্রেসের মধ্যে যে-একটা সহজ-সরল ইনোসেন্সের দিক ছিল, সেটা নষ্ট হল। কংগ্রেস অনেক বেশি ‘আধুনিক’ হয়ে উঠল। আর গড়ে উঠল ‘হাইকমান্ড’ নামক একটা ভাবনা। আগে পশ্চিমবঙ্গেও আঞ্চলিক নেতারা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। অন্যান্য রাজ্যেও তাই। প্রত্যেকটা রাজ্যেই কোনও না কোনও নেতা সেই এলাকার জনপ্রতিনিধিত্ব করতেন। পশ্চিমবঙ্গে যেমন বিধান রায় ছিলেন। উড়িষ্যায় ছিলেন বিজু পট্টনায়েক। কামরাজ ছিলেন দক্ষিণে। লখনউয়ে অনেকেই ছিলেন। আমি তো এনডি তিওয়ারিকেও দেখেছি। বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং উত্তরপ্রদেশের নেতা ছিলেন। বিহারের কথা ছেড়েই দিলাম। জগন্নাথ মিশ্র থেকে শুরু করে অনেক মুখ্যমন্ত্রী দাপটে রাজত্ব করেছেন। মহারাষ্ট্রে শরদ পাওয়ারের গুরু মারাঠা নেতা যশবন্তরাও চহ্বান একটা সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। তিনি মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী হন। পরবর্তীকালে তার পুত্র এস ভি চহ্বান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও হয়েছিলেন। এস ভি চহ্বান উত্তরাধিকার সূত্রে সেটি পান। ইন্দিরা গান্ধী দু’জন নেতার মধ্যে একেকটা রাজ্যে একজন নেতাকে কেন্দ্রে মন্ত্রী করতেন। আরেকজন নেতাকে মুখ্যমন্ত্রী করতেন। তাঁদের মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব থাকত। ঝগড়া থাকত।
আর সেই ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ করে ইন্দিরা গান্ধী খুব সহজেই তাঁর নিজের কর্তৃত্ব এবং নেতৃত্ব বজায় রাখতেন। কংগ্রেস দু’-দু’বার ভেঙেছে। ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট হয়েছে। ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে সেই কারণে একটা নিরাপত্তার অভাববোধ তৈরি হয়েছিল। সেটা করতে গিয়ে কংগ্রেসের কিন্তু লোকসান হল।
প্রণব মুখোপাধ্যায় একদা বলেছিলেন যে, কংগ্রেসের সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে আমজনতার সঙ্গে যোগাযোগটা কমতে শুরু করল যখন থেকে একটা অভিজাততন্ত্র, একটা ড্রয়িং রুম, একটা ক্লাব, একটা এলিট সমাজ কংগ্রেসে নেতৃত্ব দিতে শুরু করল তখন আমজনতা থেকে কংগ্রেস বিচ্ছিন্ন হতে থাকল। তখন আমজনতার বিভিন্ন প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আলাদা আলাদা দল হয়ে গেল। জাতপাতের ভিত্তিতে তৈরি হল লোহিয়াদের দল। পরবর্তীকালে মুলায়ম সিং এবং লালুপ্রসাদ যাদব সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেন। আবার একইভাবে এলাকা ভিত্তিক দলও তৈরি হল। যেরকম তেলুগু দেশম, এআইডিএমকে, ডিএমকে। এইভাবে বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন আঞ্চলিক দল হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ‘আমরা বাঙালি’ হয়নি। যেরকম ভাবে তেলুগু দেশম হয়েছে। তার একটা মস্ত বড় কারণ হচ্ছে যে, এখানে কংগ্রেসের অবক্ষয়ের পর ’৭৭ সাল থেকে অ-কংগ্রেসি সরকার গঠন হয়েছে। সেটা কখনও সিপিএম কখনও তৃণমূল কংগ্রেস। তারাই আঞ্চলিক যে-পরিসর সেটাকে প্রতিনিধিত্ব করেছে। তার ফলে আলাদা করে ‘আমরা বাঙালি’ বলে কোনও দল গড়ে ওঠেনি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম এবং তৃণমূল কংগ্রেস তারাই কিন্তু এই এলাকার আইডেনটিটি সেটাকে বহন করে চলেছে।
কংগ্রেস জমানার ভোট মানে তো শুধু ভোটের দিনে বুথে গিয়ে ভোট দেওয়া নয়। ভোটপর্ব কিন্তু শুরু হয়ে যায় মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় থেকে। ’৮৮ লোকসভা নির্বাচনের আগে থেকেই সমস্ত জেলাতে জেলা কমিটির বৈঠক হত। ’৮৯-এর লোকসভা নির্বাচনের আগে কংগ্রেসের রাজ্য কমিটির বৈঠক হয়েছে। তারপর জেলাওয়ারি সমস্ত কমিটির বৈঠক হত। জেলা কমিটির বৈঠকে জেলার সভাপতির বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধরা কার্যত বিদ্রোহ ঘোষণা করতেন। অনেক সময় বিক্ষুব্ধরা সভাপতির ধুতি খুলে দিতেন। চড়-থাপ্পড়-ঘুসি চলত। অনেক সময় লাঠালাঠি পর্যন্ত হয়েছে। এই কংগ্রেসের যে-গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, এই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কিন্তু অতীতেও ছিল। চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু, বিধান রায়ের আমলেও ছিল। ’৮০-র দশকে কংগ্রেসের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। তখন জেলা কংগ্রেসের বৈঠকের গোষ্ঠী কোন্দল। গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, মারামারি ভোটে প্রভাব ফেলত না। অর্থাৎ ভোটটা সাধারণত হয় রাজনৈতিক দলের সিম্বলে। যেখানে কংগ্রেস নেতাদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আমজনতার ভোটারদের ভোটে প্রভাব ফেলে না। প্রণব মুখোপাধ্যায়, বরকত গণি খান চৌধুরী দিল্লির নেতা। রাজ্যে সোমেন মিত্র আমহার্স্ট স্ট্রিটে থাকতেন। সুব্রত মুখোপাধ্যায় দক্ষিণ কলকাতার সুরেন ঠাকুর রোডে। প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি ভবানীপুরের কাছে রানি রাসমণি রোডে। গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব শুরু। একদিকে প্রিয়-সুব্রত, অন্যদিকে সোমেন মিত্র। সোমেন মিত্র বিক্ষুব্ধ নেতা। এক প্রবীণ সাংবাদিক বলেছিলেন, সোমেন মিত্র চিরকালের বিক্ষুব্ধ নেতা। বিক্ষুব্ধ লগ্নে তাঁর জন্ম। প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সিকে রাজীব গান্ধী পছন্দ করলেন। অশোক সেন, প্রণব মুখোপাধ্যায় প্রদেশ সভাপতি হলেন। কলকাতা পুরসভার নির্বাচনে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে কংগ্রেস ফটো ফিনিশ রেজাল্ট করে। কলকাতা শহরে কংগ্রেসের অসাধারণ ফলাফল। কর্পোরেশনে সিপিএম খেল জোর ধাক্কা। কমল বসু ছিলেন কর্পোরেশনের মেয়র। প্রণববাবু ফোটো ফিনিশ ফলাফল দিলে কী হবে? রাজীব গান্ধী তাঁকে পছন্দ করেন না। রাজীব গান্ধী তাঁকে ইস্তফা দিতে বাধ্য করেন। ইন্দিরা গান্ধীর বাংলার ঘনিষ্ঠ সেই দুই মোক্ষম সেনাপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় আর বরকত গণি খান চৌধুরী – দু’জনকেই রাজীব গান্ধী সরিয়ে দিলেন। জাতীয় স্তরে মণিশংকরর আইয়ারকে রাজীব গান্ধী ‘মণি’ বলে ডাকতেন।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটের আগের ঘটনা। সম্ভবত ১৯৮৭ সালের ভোটের আগের কথা। অশোক সেন কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা। ঠিক হল তাঁর বাড়িতে রাজ্য কংগ্রেসের সব নেতারা যাবেন। নির্বাচন কমিটির বৈঠক হবে। সেই কমিটির বৈঠকে তালিকা চূড়ান্ত হবে। রাজ্য নেতারা তাঁদের দাবি অনুসারে এবার রাজ্যস্তরেই প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করে তারপর সেটা হাইকমান্ডের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। কাজেই তালিকা চূড়ান্ত করার জন্য অশোক সেনের বাড়িতে বৈঠক ডাকা হল। কোন আসনে কে প্রার্থী সেসব নিয়ে অনেক রাজ্য নেতাদের মধ্যে আলোচনা এবং তর্ক-বিতর্ক পর তালিকা চূড়ান্ত হল। অশোক সেনের মুরুব্বিয়ানাকে গুরুত্ব দেওয়া হল। পরের দিনই বোঝা গেল সে যে, মিথ্যা ছলনা। প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি এবং সুব্রত মুখোপাধ্যায় দু’জনেই পরের দিন দিল্লি চলে গেলেন। সকালে অশোক সেনের বাড়ির বৈঠকটা কার্যত অসাড় হয়ে গিয়ে প্রিয়-সুব্রত হাইকমান্ডের সঙ্গে দিল্লিতে বৈঠক করলেন। প্রার্থী মনোনয়নের ‘খেলা’টা দিল্লিতে চলে এল। সেই হাইকমান্ডের আশীর্বাদ নিয়ে প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করলেন। ভোটের আগে প্রার্থী মনোনয়ন ছিল একটা মস্ত বড় ব্যাপার। এখন যেরকম কংগ্রেস দলের অস্তিত্বই বিপন্ন। বিধানসভায় এবার একটা বিধায়ক। ফলে তাদের কে প্রার্থী হল, আর কে হল না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের কোনও উৎসাহ নেই। আর কংগ্রেসেরও সেই কারণে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের উৎসাহ কমে যাওয়ায় তাঁদের ক্ষমতায় কমে গিয়েছে। সেই সময় ভোটের আগে প্রার্থী মনোনয়ন ছিল একটা মস্ত বড় ব্যাপার। এখন যেরকম কংগ্রেস দলের অস্তিত্বই বিপন্ন। বিধানসভায় এবার একটা বিধায়ক। ফলে তাদের কে প্রার্থী হল, আর কে হল না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের কোনও উৎসাহ নেই। আর কংগ্রেসেরও সেই কারণে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের উৎসাহ কমে যাওয়ায় তাঁদের ক্ষমতায় কমে গিয়েছে। সেই সময় কংগ্রেসের যে কালচার ছিল, ‘হাইকমান্ড’ নামক একটা শক্তি দিল্লিতে থাকলেও রাজ্যস্তরে কিন্তু অনেক নেতা, তাঁদের অনেক গোষ্ঠী, তাঁদের অনেক সুপারিশ। সে একটা গোষ্ঠী-রাজনীতির গণতন্ত্র ছিল। এখন সেই ভোটের রাজনীতিটাই ভোটের আগে বদলে গিয়েছে। প্রার্থী হওয়ার জন্য কংগ্রেসের নেত্রী শংকরী দিল্লি চলে এসেছিলেন। তখন হাইকমান্ড সিদ্ধান্ত নেবেন ঠিক হল।
তৃণমূল কংগ্রেস এখন শাসকদল। প্রবল পরাক্রান্ত দল। জেলায় জেলায় তাঁদের অনেক নেতা। কে সেখানে বিধায়ক হবে, কে মন্ত্রী হবে – ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের আগেও জল্পনা কল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছে। এখন প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে সেই কংগ্রেসের সংস্কৃতি এখন তৃণমূলেও নেই। কারণ তৃণমূল কংগ্রেস আঞ্চলিক দল। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতেই ন্যস্ত করা আছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলোচনা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিদ্ধান্ত নেন।





