ভোট পিছোবে না, কবে ও ক’দফায় পশ্চিমবঙ্গ সহ ৫ রাজ্যে ভোট হবে ঠিক করে ফেলল নির্বাচন কমিশন। অনেকেরই ধারণা ছিল এসআইআর-এর কারণে বাংলায় ভোট ঘোষণা পিছিয়ে যেতে পারে। যে হেতু ৬০ লক্ষ আবেদন এখনও বিবেচনাধীন, তাই তার নিষ্পত্তির পরই ঘোষণা হবে বিধানসভা নির্বাচন। এমনকী রাজনৈতিক শিবিরের অনেকে এও মনে করছিলেন, বাংলায় রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে তার পর ভোট ঘোষণা করা হবে। সে সবই জল্পনা মাত্র। পশ্চিমবঙ্গ সহ ৫ রাজ্যে কবে ভোট ঘোষণা করা হবে তা এক প্রকার চূড়ান্ত করে ফেলল নির্বাচন কমিশন। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেই বিধানসভা ভোট হবে তামিলনাড়ু, কেরল, অসম ও পন্ডিচেরিতে। শেষ পর্যন্ত কোনও অঘটন না ঘটলে বা নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত বদল না করলে ১৬ মার্চ সোমবার বাংলা সহ এই ৫ রাজ্যে বিধানসভা ভোট ঘোষণা করবেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। বাংলায় ভোট সন্ত্রাসের জন্য নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকে বামেদের বিরুদ্ধে লাগাতার নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জানাত তৃণমূল কংগ্রেস। মুকুল রায়রা বারবার কমিশনের কাছে গিয়ে বলতেন, বাংলায় ভোট স্বচ্ছ ও অবাধ করতে যথাসম্ভব বেশি দফায় ভোট করাতে হবে। সেই থেকে বাংলায় ভোটের দফা ক্রমশই বাড়তে থাকে। এক সময়ে তা ৮ দফা পর্যন্ত পৌঁছয়। কিন্তু কমিশনের কাছেও এখন স্পষ্ট যে, এটা একটা মিথ। বিজেপি-র কাছেও তা অস্বচ্ছ নয়। ফলে এবার যে ভোটের দফা কমে যেতে পারে সেই দেওয়াল লিখন অনেক দিন ধরেই পড়া যাচ্ছিল। সম্ভবত সেটাই হতে চলেছে। বাংলায় এ বার ভোট হতে পারে দু’দফায়। ১৬ মার্চ ভোট ঘোষণা হলে প্রথম দফার ভোটের আগে অন্তত ২৮ থেকে ৩০ দিন সময় দিতে হবে। অর্থাৎ এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি বা তৃতীয় সপ্তাহে হবে প্রথম দফার নির্বাচন। সে ক্ষেত্রে এপ্রিলের মধ্যেই ভোট গ্রহণ ও ফলাফল ঘোষণাও শেষ হয়ে যেতে পারে। জাতীয় নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যাচ্ছে, ১৮ মার্চ থেকে জমা নেওয়ার কথা ঘোষণা করে দেওয়া হতে পারে। তবে বাংলার রাজনীতিকদের অনেকে মনে করছেন, তা হয়তো বাংলার জন্য হবে না। অসম, তামিলনাড়ু, কেরল, পণ্ডিচেরিতে এক দফায় ভোট হবে। তা সাঙ্গ করে তবেই বাংলায় ভোট হবে। এখন কৌতূহলের বিষয় হল, ৬০ লক্ষ আবেদনের ভবিষ্যৎ কী? সেই সব আবেদনের নিষ্পত্তির কী হবে? সামপ্লিমেন্টারি তালিকাই বা কবে প্রকাশ হবে? ১০ মার্চ শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট পরিষ্কার করেই জানিয়েছে, ভোট ঘোষণায় কোনও বাধা নেই। শুনানিতে জানা গেছে, ৬০ লক্ষের মধ্যে ১০ লক্ষ আবেদনের নিষ্পত্তি ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে। তার মধ্যে ৩ লক্ষ ৪ হাজারের মতো আবেদন খারিজ হয়েছে। সাপ্লিমেন্টারি তালিকা কীভাবে প্রকাশ করা হবে তা কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি স্থির করবেন বলে জানিয়েছে শীর্ষ আদালত। সেই মোতাবেক কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের সঙ্গে বৈঠকে বসবে সিইও দফতর। ৬০ লক্ষ আবেদনের নিষ্পত্তি কত দিনের মধ্যে শেষ করা যাবে তা এখনও অনিশ্চিত। এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টও নজর রাখছে। বাকিটা আদালতেই পরিষ্কার হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গে কি নির্ধারিত সময়েই হবে বিধানসভা নির্বাচন? না কি তা করা সম্ভব হবে না? সেক্ষেত্রে কি রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হতে পারে? রাষ্ট্রপতি শাসনের মধ্যেই হতে পারে বিধানসভা নির্বাচন? প্রশ্ন উঠছে তার কারণ, SIR-এ এখনও বহু তথ্য যাচাইয়ের কাজ বাকি! ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ভোটার তালিকা অনুযায়ী, ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জনের নাম ‘বিবেচনাধীন’ রয়েছে। যার মধ্যে শুক্রবার পর্যন্ত সাড়ে ৭ লক্ষ ভোটারের নিষ্পত্তি হয়েছে বলে, নির্বাচন কমিশন সূত্রে দাবি। অর্থাৎ এখনও বাকি প্রায় সাড়ে ৫২ লক্ষ। নির্বাচন কমিশন সূত্রে খবর, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এই কাজ করছেন ৫০১ জুডিশিয়াল অফিসার। সেই কাজে যোগ দেবেন ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড থেকে আসা আরও ২০০ জন জুডিশিয়াল অফিসার। এদিকে বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হবে ৭ মে। এখানেই প্রশ্ন উঠছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই কি এই বিপুল সংখ্যক নথিপত্র যাচাই করা যাবে? আর যদি তা না করা যায়, তাহলে কী হবে? সমস্ত নথি যাচাই না করেই কি ভোট গ্রহণ সম্ভব? বিধানসভা ভোট পিছিয়ে দিতে হলে কি রাজ্যে ৩৫৬ ধারা প্রয়োগ করতে হতে পারে? কারণ, নির্বাচন কমিশন সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, মার্চের শেষেও বাকি কাজ শেষ হওয়া কার্যত অসম্ভব।

এই পরিস্থিতিতে, প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের বক্তব্য, ২৮ তারিখ ফাইনাল লিস্ট। দিন ঘোষণা করতেই পারে। সাংবিধানিকভাবে বাধা নেই। কারণ চূড়ান্ত লিস্ট বের করে দিয়েছে। বিবেচনাধীনগুলি তো সাপ্লিমেন্টারি হিসেবে প্রকাশ হবে। একবার পাঞ্জাব ও জম্মু কাশ্মীরে নজির আছে, ভোট পিছিয়ে দেওয়ার পর রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছিল। কিন্তু এই ইস্যুতে নেই। রাষ্ট্রপতি শাসন হলে এখানকার সরকার ভেঙে দিতে হয়, সেখানে রাজ্যপাল কেন্দ্রের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে হয়। প্রশাসন রাজ্যপালের অধীনে চলে যায়। এই জটিল পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন একটাই বিধানসভা ভোট নির্দিষ্ট সময়ে হবে না কি রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হতে পারে কিছুদিনের জন্য? আর এই পরিস্থিতিতেই রাজ্যে আসছেন নতুন রাজ্যপাল প্রাক্তন আইপিএস অফিসার আর এন রবি! আর তাঁর আগমন জল্পনা আরও উস্কে দিয়েছে। সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এখন জল্পনাময়!
২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২ দফায় নয়, বরং ২৭ মার্চ থেকে ২৯ এপ্রিল, ২০২১ পর্যন্ত ৮টি দফায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২৯২টির ভোট গ্রহণ করা হয় এবং তৃণমূল কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।





