কাটছাঁটের নোটিস দিয়েছে। কয়েকটি নামী রেস্তরাঁ বন্ধ হয়েছে মহানগরে। এবং এমনটা চললে গিগ ওয়ার্কারদের রুটি রুজিই বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ, খাবার বাড়িতে পৌঁছতে তাঁদের অনেকেই আবার দু চাকার যানও ব্যবহার করেন, সেখানেও তো জ্বালানি মিলবে না, ফলে জোড়া বিপদের মুখে তাঁরা। একই আতঙ্ক অ্যাপ নির্ভর বাইক বা গাড়ির চালকদের মধ্যেও। শিল্পক্ষেত্রেও প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক। শিলিগুড়িতে একটি কারখানা উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। সুইগি, জোমাটো, ব্লিঙ্কিট, র্যাপিডো এবং উবর-এর মতো অ্যাপগুলিতে অসংখ্য কর্মী আছেন। কাজের উপর ভিত্তি করে মাসে ১২ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন তাঁরা। তাঁদের কাজ এখনই কমেছে। দক্ষিণ কলকাতার একটি নামী ক্লাব খাবারের মেনুতে কাটছাঁটের নোটিস দিয়েছে। কয়েকটি নামী রেস্তরাঁ বন্ধ হয়েছে মহানগরে। দেশে গ্যাসের মূল জোগানদার কাতার। কিন্তু সেই গ্যাস আসার পথ আটকে হরমুজ প্রণালী। আপাতত বাড়ির গ্যাস পেতেই যেখানে ঘাম ছুটছে, সেখানে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রের জ্বালানি যে কয়েকদিনের মধ্যেই যে শূন্যে পৌঁছবে তা স্পষ্ট। বিমান বন্ধ। জলপথ অবিন্যস্ত। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পক্ষেত্রের পণ্য আটকে। গ্যাসের আকালে পরিবহণ ক্ষেত্র থেকে শুরু করে রেস্তরাঁ ও হোটেল শিল্প সংকটে। সব কিছু সচল থেকেও এক অচল অর্থনীতির আশঙ্কা! যা কর্মচ্যুতির বড় সম্ভাবনা তৈরি করে দিয়েছে। সমস্যা এতটাই তীব্র যে, বেশ কিছু রেস্তরাঁয় তালা। অনলাইনে খাবার ডেলিভারি কমেছে। আয় কমেছে গিগ ওয়ার্কার্সদের। পাহাড় থেকে সমুদ্রসৈকত, হোটেলগুলোর দিন কাটছে ঝাঁপ বন্ধের উদ্বেগে। এবং এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে কয়েকদিনের ভিতর তাঁদের আর কাজ থাকবে কি না সেটাই বড় প্রশ্ন। ভারতের মোট জিডিপি-র প্রায় তিন শতাংশ খরচ হয় জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে। হরমুজ প্রণালী বন্ধে ক্রুড অয়েলের জোগান কমায় তেলের দাম বাড়লে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি আকাশছোঁয়া হতে পারে। আর জ্বালানির অভাবে মুখ থুবড়ে পড়বে ভারী থেকে ক্ষুদ্র বা মাঝারি শিল্পও। ইতিমধ্যেই কিছু ছোট কারখানার উৎপাদন বন্ধ। রাস্তায় অটো কমতে শুরু করেছে। অর্থাৎ পরিবহণ ক্ষেত্রেও বেকারত্বের ছায়া ফেলতে শুরু করেছে যুদ্ধ। শুধু তাই নয়, মোবাইল ফোনের টাওয়ারে প্রতিদিন ডিজেল লাগে, তা কতদিন মিলবে সেটাও প্রশ্ন। সব মিলিয়ে এখন রোজকার দিনযাপনটাই এক যুদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে চলেছে বহু মানুষের কাছে। অনেকটা করোনা-কালে লকডাউনের মতো, তবে এ হল চোখের সামনে সব সচল দেখা গেলেও এক অচল অবস্থা এবং সার্বিক অর্থনীতি তথা ব্যক্তিজীবনে বড় ধাক্কা যার প্রভাব দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যে বারুদের গন্ধ কতটা স্থায়ী হবে নির্ভর করবে তার উপর। হাওড়ার জালান ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের এক কর্তা জানান, সেখানেও অনেকে উৎপাদনে কাটছাঁট করেছেন। আসানসোল-দুর্গাপুর অথবা বড়জোড়া, পুরুলিয়া, ইস্পাত ও সিমেন্টের মতো ভারী শিল্পও সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। ডিজেল ছাড়া (ভাটি) চুল্লি জ্বালানো যায় না। কাঁচামাল উৎপাদন ব্যাহত হয়। সেই ডিজেল আগামী কতদিন মিলবে তা বোঝা যাচ্ছে না বলেই ধীরে চলো নীতি তাঁদের। সেখানেও কর্মী সংকোচনের পথে হাঁটতে চলেছে অনেক শিল্পগোষ্ঠী। আমাদের দেশে গ্যাসের মূল জোগানদার কাতার। কিন্তু সেই গ্যাস আসার পথ আটকে হরমুজ প্রণালী। আপাতত বাড়ির গ্যাস পেতেই যেখানে ঘাম ছুটছে, সেখানে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রের জ্বালানি যে কয়েকদিনের মধ্যেই যে শূন্যে পৌঁছবে তা স্পষ্ট।
সংকট স্বীকার করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সংগঠন ফসমির রাজ্য সভাপতি বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য বলেন, “পরিস্থিতি সবদিক দিয়েই উদ্বেগজনক। অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদী হলে তা কাটানো খুবই কষ্টসাধ্য।” পূর্বাঞ্চলের হোটেল ও রেস্তরাঁ সংগঠন এইচআরএআই-এর সভাপতি সুদেশ পোদ্দার উদ্বেগের সুরে বলেছেন, “জ্বালানি সংকটে এখনই কয়েকটি হোটেল রেস্তরাঁ বন্ধ হয়েছে। এমন চললে কাজ হারাবেন রাজ্যের কয়েক লক্ষ মানুষ।” সুদেশবাবুরা দ্বারস্থ হয়েছেন ইন্ডিয়ান অয়েলের। একই অবস্থা মিষ্টি শিল্পের। বড় সংস্থা বয়লারে উৎপাদন করলেও ছোট বা মাঝারি দোকানের উৎপাদন গ্যাসের অভাবে চলতে পারে না। সেখানেও তো কয়েক লক্ষ মানুষ কাজ করেন। সঙ্গে রয়েছে আনুষঙ্গিক জোগানদারের অর্থনৈতিক নির্ভরতা। সেখানে গ্যাসের বিশেষ ভরতুকি তুলে নিয়েছে কেন্দ্র। তার পর জোগানও কম, ফলে সমস্যা বাড়তে চলেছে বলেই স্বীকার করেন প্রখ্যাত মিষ্টি উৎপাদক সংস্থার কর্ণধার ধীমান দাশ। ফলে সব মিলিয়ে অত্যন্ত তেতো পরিস্থিতির মুখে শিল্প। ফলে কাজ হারানোর শঙ্কায় কয়েক কোটি মানুষ। প্রাণঘাতী করোনা ফিরে আসেনি, লকডাউন নয়। কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্র হানার লড়াইয়ের অংশীদার না হয়েও আপাতত নিঃশব্দ অর্থনৈতিক মন্দার মতো ঘাতকের মুখোমুখি দেশ, বঙ্গও। বিপদের মুখে প্রত্যেকেই।





