নির্বাচনের বাজারে রান্নার গ্যাস নিয়ে উদ্বেগকে ‘হাতিয়ার’ করে মমতা ঢুকে পড়লেন ভোটারদের হেঁশেলে! কলকাতা, জেলা, মফস্সলে গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থার গুদামের বাইরে সাধারণ মানুষের ভিড়। ফোনের মাধ্যমে গ্যাস বুক করার ব্যবস্থাও ঠিক মতো কাজ করছে না। এই পরিস্থিতিতে ময়দানে নামলেন মমতা। নামতে শুরু করল তৃণমূলও। ভোটমুখী পশ্চিমবাংলায় রাজনৈতিক আখ্যান নির্মাণে দ্রুত পটপরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। চলমান এসআইআর ইস্যু কার্যত চাপা পড়ে গিয়েছিল রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর ‘অসম্মান’ বিতর্কে। ৭২ ঘণ্টা কাটার আগেই সেই বিতর্ককে পিছনে ফেলে সামনে চলে এল রান্নার গ্যাস নিয়ে নাগরিক উদ্বেগ। এবং তাকে হাতিয়ার করে ভোটারদের হেঁশেলে ঢুকে পড়লেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং। দ্রুত সক্রিয়তা দেখিয়ে ময়দানে অবতীর্ণ হন মমতা। এক, কেন্দ্রকে এই উদ্বেগ ছড়ানোর জন্য দায়ী করে সংবাদমাধ্যমে এবং সমাজমাধ্যমে একটার পর একটা বক্তব্য রেখে যাওয়া। দুই, রাজ্যের ‘সীমাবদ্ধ’ জায়গা রান্নার গ্যাস নিয়ে প্রসাসনিক তৎপরতা ও বৈঠকের ঘোষণা। তিন, এ নিয়ে তৃণমূলের রাজনৈতিক প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করে দেওয়া। সঙ্গে দলের বিভিন্ন স্তরের সাংবিধানিক এবং প্রশাসনিক পদাধিকারীদের দিয়ে সঙ্কটের পরিস্থিতির প্রচার শুরু করিয়ে দেওয়া। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতির ফলেই রান্নার গ্যাসের জোগানে সমস্যা তৈরি হয়েছে। যাকে ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে গেরস্থালিতে। সেই উদ্বেগ পুরোপুরি অমূলক এমন নয়। তবে এখনও তা সঙ্কটের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে এমনটাও বলা যায় না। তবে মমমতার মতো অনেকেরই অভিমত, নাগরিকদের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে তার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারেরও দায় রয়েছে। প্রথমে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে বলা হয়েছিল, ২১ দিনের আগে গ্যাস বুকিং করা যাবে না। তার পর তা বৃদ্ধি করে করা হয় ২৫ দিন। এই ঘোষণার কারণেই মানুষের মনে উদ্বেগ তৈরি হতে থাকে রান্নার গ্যাস নিয়ে।
নবান্নে একপ্রস্ত বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। তার পর তিনি বলেন, ‘‘একটা প্যানিক তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে যেটা চিন্তার বিষয়।’’ গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থাগুলির সঙ্গে রাজ্য সরকারের সমন্বয় তৈরি করার কথাও বলেন মুখ্যমন্ত্রী। যাতে কত গ্যাস মজুত রয়েছে এবং কত সরবরাহ করা হল, তার হিসাব থাকে। রাজ্যের গ্যাস যাতে বাইরে না-যায়, তা-ও সুনিশ্চিত করার কথা বলেছেন মমতা। প্রশাসনিক ভাবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা যখন এ হেন পদক্ষেপ করছেন, তখন তৃণমূলনেত্রী হিসাবে তিনি আগামী সোমবার কলকাতার রাস্তায় গ্যাস-উদ্বেগ নিয়ে মিছিলও করতে পারেন বলে জানিয়ে দিয়েছেন। শুধু মমতা নন, বিধানসভার স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমও মমতার পরে রান্নার গ্যাস নিয়ে মন্তব্য করেছেন। অর্থাৎ মমতা শুরু করার পরে বাকি তৃণমূলও গ্যাস-উদ্বেগকে হাতিয়ার করে ময়দানে নেমে পড়েছে। মা ক্যান্টিন নিয়েও দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিমান এবং ফিরহাদ। দিঘার জগন্নাথ মন্দিরে ভক্তদের জন্য তৈরি ভোগ বিতরণেও রাশ টানা হচ্ছে।সাধারণ মানুষের ভিড়। ফোনের মাধ্যমে গ্যাস বুক করার ব্যবস্থাও ঠিক মতো কাজ করছে না। ইতিমধ্যে কলকাতার রেস্তোরাঁগুলিতেও অনেক কিছু কাটছাঁট করা হচ্ছে। স্কুলগুলিতে মিড ডে মিলের রান্না কী ভাবে হবে, তা নিয়েও উদ্বেগ জারি রয়েছে প্রশাসনে। যদিও মমতা বলেছেন, কোনও ভাবেই মিড ডে মিল বন্ধ করা যাবে না। হাসপাতাল এবং হস্টেলগুলোতে যেন নিয়মিত গ্যাস পৌঁছোয় এবং সাধারণ বাড়ির গ্রাহকদের যাতে কোনও সমস্যায় পড়তে না হয়, তা-ও নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে নবান্নের তরফে। এই মর্মে জেলাশাসকদেরও নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য। কোথাও যাতে কালোবাজারি না-হয়, তা-ও পুলিশকে সতর্ক ভাবে নজরদারি করতে বলা হয়েছে। এলপিজি গ্যাসের মাধ্যমে যে অটো চলে, সেখানেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। সিএনজি ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় অনেক জায়গায় রান্নার গ্যাস ভরে অটো চালাচ্ছেন চালকেরা। বেশ কিছু জায়গা থেকে সিএনজি নিয়ে কালোবাজারিরও অভিযোগ উঠছে। কলকাতা ও শহরতলির বেশ কিছু রুটে আচমকা বেড়ে গিয়েছে অটো ভাড়াও। কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, দেশে গ্যাসের সঙ্কট হবে না। উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। কিন্তু কেন্দ্রের সেই ঘোষণায় যে উদ্বেগ কাটছে না, তা স্পষ্ট। এ হেন পরিস্থতিতে ভোটের আগে হেঁশেলে ঢুকে পড়তে চাইলেন মমতকা। এক দিকে ‘দিদি’ হিসাবে তিনি জনতার উদ্বেগকে গুরুত্ব দিলেন। অন্য দিকে প্রশাসক হিসাবে পদক্ষেপ করা শুরু করেছেন। নামতে পারেন রাস্তাতেও।এই পরিস্থিতিতে ময়দানে নামলেন মমতা। বুধবার দুপুরে তিনি দু’টি টেলিভিশন চ্যানেলে ফোনে গ্যাস-উদ্বেগ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে নিশানা করেন কেন্দ্রীয় সরকারকেই। মমতা বলেন, ‘‘আমি তো ভর্তুকি দিতে চাই। তাতে লাভ হবে না। কারণ, গ্যাসের জোগানই নেই! গ্রামবাংলা থেকে শহর সকলের এতে সমস্যা হচ্ছে। আমি এটা নিয়ে কথা বলেছি। বৃহস্পতিবারই বৈঠক ডেকেছি। একটা কিছু বিকল্প ভাবা দরকার। দেখছি কী করা যায়।’’
রান্নার গ্যাস এবং বাণিজ্যিক গ্যাসের (এলপিজি) উদ্বেগের মধ্যে বৃহস্পতিবার জরুরি বৈঠকে বসছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কী ভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়ে ডিলার এবং আধিকারিকদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। বিকল্প উপায়ের সন্ধান করবেন। বৃহস্পতিবারই জানাতে পারেন রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত। এই পরিস্থিতি তৈরির জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে দায়ী করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। নিউজ় ১৮ বাংলা এবং এবিপি আনন্দকে ফোনে তিনি জানিয়েছেন, গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে আগামী সোমবার শহরে মিছিলে হাঁটতে পারেন। মমতা জানান, রাজ্য সরকারের আর্থিক সমস্যা রয়েছে। তা সত্ত্বেও এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে সাহায্যের জন্য তিনি এগিয়ে আসতে পারেন। তবে তাতে তেমন লাভ হবে না। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘‘আমি তো ভর্তুকি দিতে চাই। তাতে লাভ হবে না। কারণ, গ্যাসের জোগানই নেই! গ্রামবাংলা থেকে শহর— সকলের এতে সমস্যা হচ্ছে। আমি এটা নিয়ে কথা বলেছি। বৃহস্পতিবারই বৈঠক ডেকেছি। একটা কিছু বিকল্প ভাবা দরকার। দেখছি কী করা যায়।’’ গ্যাস রাজ্য সরকারের হাতে নেই, মনে করিয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। জানিয়েছেন, কেন্দ্রের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের ভুল সিদ্ধান্তের জন্য এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি দু’টি গ্যাস বুকিংয়ের মধ্যে অন্তত ২৫ দিনের ব্যবধান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই ঘোষণাতেই মানুষ আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘কেন ওরা বলে দিল, ২৫ দিন না হলে মানুষ গ্যাস পাবে না? পেট্রলিয়াম মন্ত্রকের কাছে আমাদের দাবি, এসআইআর-এর নাম কাটার দিকে না তাকিয়ে, মানুষের অধিকার না কেড়ে গ্যাসের সমস্যা মেটান। জরুরি পরিষেবার দিকে নজর দিন। গ্যাসের জোগান যেন বন্ধ না হয়। অটো, আইসিডিএস, মিড ডে মিল, বাড়ির রান্নার গ্যাস, ছোটখাটো রেস্তরাঁর সমস্যা মেটাতে হবে। ওদের আগে মানুষের কথা ভাবা দরকার। এটা কেন্দ্রের হাতে। আমরা চাই, দ্রুত কেন্দ্রীয় সরকার পদক্ষেপ করুক।’’ এলপিজি নিয়ে উদ্বেগের মাঝে অনেক রুটে অটোর ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। রেস্তরাঁয় খাবারের দাম বেড়েছে। তা নিয়ে মমতা বলেন, ‘‘যাঁরা দাম বাড়িয়েছেন, তাঁদের যুক্তি সঙ্গত। কিন্তু মানুষের কথা ভাবা দরকার। মানুষের স্বার্থে বিকল্প কিছু ভাবতে হবে। আমি বৈঠক করব। আমাদের টাকা নেই, তা-ও আমি সাহায্য করতে পারি। কিন্তু টাকা দিলেও গ্যাস পাওয়া যাবে না। ২৫ দিনের ওই ঘোষণা করাই সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছে। এটা কেন বলল? এতেই আমার আপত্তি। আমি বিকল্প ভেবে তার পর তো ঘোষণা করব!’’ কেন্দ্রের পরিকল্পনার অভাবকেই এর জন্য দায়ী করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আবহে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গ্যাসের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চলতি মাস থেকেই বাণিজ্যিক গ্যাস এবং রান্নার গ্যাসের দাম এক লাফে বেশ খানিকটা বেড়ে গিয়েছে। এলপিজি সিলিন্ডার বুক করতে গিয়েই হোঁচট খাচ্ছেন অনেকে। অভিযোগ, ফোনে বুকিং হচ্ছে না। অনেকে আবার বুক করার ৮ থেকে ১০ দিন পরেও সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। লাভ হচ্ছে না গ্যাসের দফতরে গিয়েও। এই পরিস্থিতিতে গৃহস্থের হেঁশেলে টান পড়েছে। মাথায় হাত মধ্যবিত্তের। টাকা দিয়েও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। যাঁরা ইনডাকশন ব্যবহার করেন, তাঁরা কিছুটা স্বস্তিতে। তবে সঙ্কটের পরিস্থিতিতে ইনডাকশনে সব কাজ হাসিল করা সম্ভব নয়। মুখ্যমন্ত্রীও সে বিষয়ে একমত। বিকেলেই গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থাগুলির সঙ্গে পৃথক বৈঠকে বসেছেন মমতা। আলিপুরের ‘সৌজন্যে’ সেই বৈঠকে ছিলেন রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারাও। কী ভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়, তা নিয়ে কথা হয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘প্যানিক’ তৈরি হয়েছে বলে জানান মমতা। তা চিন্তার বিষয়। কত গ্যাস মজুত আছে, কতগুলি সরবরাহ করা হল, তার হিসাব রাখার জন্য সরবরাহকারী সংস্থাগুলির সঙ্গে রাজ্য সরকার যোগাযোগ রাখবে। তৈরি হবে আলাদা এসওপি। রাজ্যের গ্যাস যাতে আপাতত বাইরে না যায়, তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন মমতা। বাণিজ্যিক গ্যাসের ক্ষেত্রে মোট মজুতের অন্তত দুই শতাংশ নিশ্চিত করতে বলেছেন তিনি, যাতে রেস্তরাঁ এবং হোটেলে সমস্যা না হয়। কালোবাজারি বন্ধ করতে জেলা প্রশাসন এবং পুলিশের সঙ্গেও কথা বলবেন মুখ্যমন্ত্রী। এ ছাড়া, পেট্রপণ্য সরবরাহকারী সংস্থাগুলিকে গ্রামবাংলার মানুষের জন্য পর্যাপ্ত কেরোসিন সরবরাহের পরামর্শ দিয়েছেন।





