কলকাতায় আসছেন নতুন রাজ্যপাল রবীন্দ্র নারায়ণ রবি। বৃহস্পতি তিনি শপথ নেবেন। সন্ধে ৬.২৫ মিনিটে চেন্নাই থেকে দিল্লি হয়ে কলকাতায় আসার কথা। এরপর বৃহস্পতি বেলা ১২টায় পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবে শপথগ্রহণ করবেন। চিফ জাস্টিস তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করাবেন। অনুষ্ঠানে নিয়ম অনুযায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বনদ্যোপাধ্যায় ও বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর থাকার কথা। অন্যান্যরাও থাকবেন। প্রাক্তন আইপিএস অফিসার। প্রাক্তন সহকারী জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। এই আরএন রবি বিধানসভা ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য়পালের দায়িত্ব সামলাবেন। তামিলনাড়ুতে বারবার রাজ্য সরকারের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকারের সঙ্গে কেমন হবে তাঁর সম্পর্ক? তুঙ্গে জল্পনা। পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজ্যপাল করা হয়েছে আর এন রবি-কে। তিনি তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল ছিলেন। সেখান থেকে সরিয়ে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গে পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। ১৯৭৬ সালের কেরল ক্যাডারের আইপিএস অফিসার ছিলেন রবীন্দ্র নারায়ণ রবি। দীর্ঘদিন সিবিআই-এ ছিলেন। তারপর কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা দফতরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন। অবসর নেওয়ার পর ২০১৪ সালে তাঁকে জয়েন্ট ইনটেলিজেন্স কমিটির চেয়ারম্য়ান করা হয়। ২০১৮ সালে ডেপুটি ন্য়াশনাল সিকিওরিটি অ্যাডভাইসার পদে তাঁকে নিয়োগ করে কেন্দ্রীয় সরকার। ২০১৯ সালে তাঁকে নাগাল্যান্ডের রাজ্যপাল পদে নিয়োগ করে মোদি সরকার। ২০২১ সালে তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল হন। ইন্ডিয়া জোটের সদস্য দল ডিএমকে ও কংগ্রেসের জোট তামিলনাড়ুতে। সরকার চালায়। পদে পদে তাদের জোট সরকারের সঙ্গে সংঘাত বেঁধেছে রবির। একাধিকবার রাজ্য় সরকারের লিখিত ভাষণ পড়তে অস্বীকার করেছেন রবি। পাল্টা ২০২৩ সাল থেকে স্বাধীনতা দিবসে রাজভবনের চা চক্র বয়কট শুরু করে স্টালিন সরকার। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে রাজ্যপাল রবিকে বরখাস্ত করার দাবিও জানিয়েছিল তামিলনাড়ু সরকার। এর পর বিধানসভায় পাশ হওয়া ১০টি বিল রাজ্যপাল আটকে রেখেছেন বলে অভিযোগ তুলে সুপ্রিম কোর্টে মামলাও করেছিল স্টালিন সরকার। শীর্ষ আদালতের নির্দেশে চলতি বছরের গোড়ায় রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নিয়ে বিলগুলিতে সই করেছিলেন রবি। ২০১০ থেকে ২০১৪ অবধি এমকে নারায়ণন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল ছিলেন। তিনি ছিলেন আইপিএস অফিসার। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। এর আগে নয়ের দশকের মাঝামাঝি রাজ্যপাল হয়ে এসেছিলেন টিভি রাজেশ্বর৷ তিনি ছিলেন সিবিআইয়ের অবসরপ্রাপ্ত অফিসার৷ রাজ্যপাল পদে শপথ নিতে তিনি যেদিন কলকাতা পৌঁছন সেদিন জ্যোতি বসুর প্রতিক্রিয়া ছিল, শুনছি, উনি আইবি-র গোয়েন্দা ছিলেন৷ গোয়েন্দাতে আমাদের আপত্তি নেই ৷ ভালই তো, অবসর জীবন রাজভবনে কাটাবেন৷’ এবার ফের একবার এক প্রাক্তন আইপিস অফিসারকে রাজ্যপাল হিসাবে পেল পশ্চিমবঙ্গ। হাইভোল্টেজ বিধানসভা ভোটের আগে আরএন রবি পশ্চিমবঙ্গে আসছেন। তৃণমূল সরকারের সঙ্গে নতুন রাজ্যপাল আরএন রবির সম্পর্ক কেমন হবে? সুসম্পর্ক না সংঘাত? বিধানসভা ভোটের আগে এই প্রশ্নগুলোই এখন জোরাল।
রাজ্যপাল পদ থেকে আচমকা ইস্তফায় সিভি আনন্দ বোসের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমীকরণ কি বদলে গেল? মঙ্গলবার রাজ্য রাজনীতিতে নতুন জল্পনা শুরু হল। আর এই জল্পনা উস্কে দিলেন খোদ মমতাই। ধর্মতলায় SIR-ধর্না প্রত্যাহার করেই বোসের সঙ্গে দেখা করতে পৌঁছে গেলেন। তাঁর সঙ্গে হওয়া ‘অবিচার’ নিয়েও মুখ খুললেন। মঙ্গল সন্ধেয় ধর্মতলায় SIR-ধর্না সাময়িক প্রত্যাহারের ঘোষণা করেন মমতা। এর পরই সটান আলিপুরের যে গেস্ট হাউসে উঠেছেন বোস, সেখানে উপস্থিত হন তিনি। বিদায়ী রাজ্যপাল বোসের সঙ্গে দেখা করেন সেখানে, হাতে তুলে দেন পুষ্পস্তবক। সেখান থেকে বেরিয়ে মমতা বলেন, “যেহেতু কাল চলে যাচ্ছেন উনি…ওঁর সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করেছি অনেক দিন। আমার সঙ্গে ওঁর সম্পর্ক ভাল ছিল।” বাংলার শিষ্টাচার মেনেই এই সাক্ষাৎ বলে জানিয়েছেন মমতা। বোসের প্রতি হওয়া ‘অবিচার’ নিয়েও মুখ খোলেন মমতা। বলেন, “ওঁর প্রতি যে অবিচার হয়েছে, অন্যায় হয়েছে…পাঁচ বছরের মেয়াদ সত্ত্বেও, দেড় বছর বাকি থাকতে, নির্বাচনের আগে যেভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, আমি মনে করি এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমার মনের কথাটা আমি ওঁকে বলে এসেছি। আমি ওঁকে অনুরোধ করেছি যে, ‘আপনি বাংলায় এতদিন ছিলেন, বাংলাকে ভাল বোঝেন, বাংলায় আবার আসুন’।” মমতা জানিয়েছেন, বাগডোগরা যাওয়া নির্ধারিত ছিল বোসের। সেই মতো সরকারি বিমানও দিয়েছিলেন। কিন্তু যেতে পারেননি বোস। কারণ ওই দিনই বোসকে সরিয়ে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, লোকভবনে না গিয়ে, রাজ্যপাল কেন আলিপুরের গেস্ট হাউসে উঠলেন, এদিন সেই প্রশ্নও করা হয় মমতাকে। জবাবে তিনি বলেন, “বাগডোগরা যাবেন বলে প্রোগ্রাম শিডিউল্ড ছিল ওঁর। আমি তো সরকারি বিমানও দিয়েছিলাম। উনি যেতে পারেননি কারণ সেদিনই সিদ্ধান্ত নিয়ে সরিয়ে দিল ওঁকে। উনি বুকড ও করেছিলেন। সেখান থেকে ওঁকে মেসেজ দেওয়া হয় বাগডোগরা না, দিল্লি। অবিচার হয়েছে। সুতরাং নিজের মর্যাদা নিয়ে হোটেলে থাকতে চেয়েছিলেন উনি। আমিই বললাম, ‘হোটেলে কেন থাকবেন! আমাদের সৌজন্য আছে। বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির জন্য এটা, কূটনীতিকদের জন্য। এখনও নতুন রাজ্যপাল শপথ নেননি। (বোস) এখনও রাজ্যপাল আছেন। তাই আমাদের অতিথি হিসেবে প্লিজ থাকুন এখানে’।” সোশ্যাল মিডিয়াতেও বোসের সঙ্গে সাক্ষাতের ছবি পোস্ট করেন মমতা। বোসকে তিনি ‘বিদগ্ধ’ ব্যক্তি বলে উল্লেখ করেন। গোটা বিষয়টি নিয়ে এই মুহূর্তে জোর জল্পনা রাজ্য রাজনীতিতে। কারণ বোস পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হয়ে আসার পর গোড়াতে রাজ্য সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্কই ছিল তাঁর। বাংলা শিখতে আগ্রহী বোসের হাতেখড়ির আয়োজন হয় সেই সময়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সংঘাত বাড়তে শুরু করে। এমনকি বোসের বিরুদ্ধে যখন শ্লীলতাহানির অভিযোগ তোলেন লোকভবনের এক কর্মী, সেই সময় মমতাও নিন্দায় সরব হয়েছিলেন। একা লোকভবনে যেতে নিষেধ করেন মহিলাদের। কিন্তু মেয়াদ শেষের আগে বোসের পদত্যাগে সেই সংঘাতের অবসান ঘটল কি না, প্রশ্ন উঠছে। পদত্যাগের কারণ এখনও খোলসা করেননি বোসও। তিনি জানান, সঠিক সময়েই কারণ জানা যাবে।





