Tuesday, March 10, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

ভারতবর্ষ সূর্যেরই এক নাম! সূর্য-সঞ্জু-সিরাজদের ক্রিকেটেই বিশ্বজয়

চতুর্দশপদী। ১৪ টা বিশ্বকাপজয়ী ভারতে। ইতিহাসের পাতায় লেখা একের পর এক রূপকথা। দু’বছর আগে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক রোহিত শর্মা মাঠে ঢুকে ক্রিকেটারদের একে একে বুকে টেনে নিচ্ছেন, অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব মাঠের মাঝখানে গিয়ে পিচের ধুলো দু’হাতে তুলে নিয়ে মুখে মেখে নিচ্ছেন আবিরের মতো, পাণ্ডিয়ার বান্ধবী হার্দিক গালে এঁকে দিচ্ছেন প্রকাশ্য প্রেমচুম্বন, ঈশান কিশানের খুনখারাপি রঙের পোশাক পরিহিতা মডেল বান্ধবী তাঁর সঙ্গে আপোসে খুনসুটি করছেন, সঞ্জু স্যামসনের স্ত্রী তাঁর ওড়না দিয়ে সযত্নে ঢেকে রাখছেন জীবনসঙ্গীর সিরিজ সেরার পুরস্কারের ট্রফি। মাঠের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটারেরা এবং প্রায় সকলেরই স্ত্রী-সন্তান-পরিজন-বন্ধু এবং বান্ধবী। তৈরি হচ্ছে অসাধারণ টুকরো টুকরো সব ছবি। সারা দেশ পাগলাটে এবং ভূতগ্রস্তের মতো আচরণ করছে। কলকাতার উপকণ্ঠে সল্টলেকের মতো সাজানো উপনগরীতেও বাজির শব্দে কান পাতা দায়! দেশের বিভিন্ন ছোট-বড় শহরের রাস্তায় রাস্তায় গাড়িবানেরা বেরিয়ে পড়েছেন প্যাঁ-পোঁ করে হর্ন বাজাতে বাজাতে। আবেগের সমুদ্র কূল ছাপিয়ে এসে পড়েছে সুনামির মতো। ১৪টি ক্রিকেট বিশ্বকাপ জিতেছে ভারত। ১৯৮৩ সালে কপিলদেবের লর্ডসে বিশ্বকাপ জয় প্রথমটা। চতুর্দশতমটি ঘটল রবি রাতে আমদাবাদে। যুব বিশ্বকাপের আঙিনা থেকেই বিরাট কোহলি-রবীন্দ্র জাডেজাদের প্রাথমিক উত্থান। পরের দিকে যাঁরা বৈগ্রহিক ক্রিকেটার হয়েছেন এবং এমন সব কীর্তিসৌধ গড়েছেন, যা ক্রিকেটীয় লোকগাথায় ঢুকে গিয়েছে। কিন্তু ‘সাপ্লাই লাইন’ থেকেছে সেই যুব বিশ্বকাপ। পরে যার জায়গা নিয়ে নিয়েছে আইপিএল। আমরা কি সে ভাবে মহিলা বিশ্বকাপের খবরও রাখতাম? বা মহিলা যুব বিশ্বকাপ? নাহ্, মহিলা ক্রিকেটের খবর-টবরই রাখতাম না। হালে রাখছি। রাখছে সারা দেশ। কারণ, খেলার দুনিয়ায় সাফল্যের নিরিখে এখন ওই ক্রিকেটটাই আছে আমাদের। সে পুরুষ হোক বা মহিলা। বড়দের ক্রিকেট হোক বা ছোটদের।

গভীর রাতে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের উল্লাস। চতুষ্পার্শের এই পরিস্থিতি, যেখানে এত নিম্নমেধার উদ্‌যাপন, এত মধ্যমেধার উদ্বর্তন, এত উচ্চমেধার অন্তর্জলি যাত্রা, এর মধ্যেও ক্রিকেট এবং ক্রিকেটদুনিয়ায় ভারতের উৎকর্ষ একটা আলো জ্বালিয়ে রেখেছে। আশার আলো। বিচারের আলো। ভাল লাগার আলো। ভালবাসার আলো। ১৯৮৩ সালে ভারত প্রথম বিশ্বকাপ জেতে। সুনীল গাওস্করের ব্যাটিং আর কপিল দেবের অলরাউন্ড পারফরমেন্সের ক্রিকেটেই ভারত বিশ্বজয় করেছে। লর্ডসে বিশ্বজয়ের পরে ভারতীয় ক্রিকেটের বিবর্তন শুরু।মোহময়, অনেক মণিমাণিক্য খচিত। ভারতের আকাশ খুলে যাওয়ার পর থেকে সে দুর্দৈব মিটেছিল। ক্রমে ক্রমে ক্রিকেট এই উপমহাদেশের ধর্মই হয়ে গেল। সন্দিগ্ধু এবং নাক-উঁচু লোকেরা বলতেন বটে, ক্রিকেট আবার একটা খেলা নাকি! মেধা, শক্তি, স্ট্যামিনা এবং ধৈর্যের চরমতম পরীক্ষা টেস্ট ক্রিকেটের গরিমাকে লঘু করার জন্য তাঁরা বলতেন, যে খেলায় সারাদিনে চার বার খাওয়ার বিরতি হয়, সেটা কোনও খেলাই নয়। অনেকে বলতেন, খেলে তো মাত্র আটটা দেশ। তাদের আবার বিশ্বকাপ। তাতে আবার চ্যাম্পিয়ন। নাক-সিঁটকানোরা মূলত ফুটবলের পূজারি। সন্দেহ নেই, ‘ফুটবল সত্যিই ‘আ বিউটিফুল গেম’। কিন্তু সে ফুটবলে ভারতের সাফল্য কই? ফলে ভারত তথা উপমহাদেশে ক্রিকেটের লিফ্‌ট যখন চড়চড় করে ক্রমে উপরের দিকে উঠেছে, তখন ভারতীয় ফুটবল নামতে নামতে এত তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে যে, একটা জাতীয় লিগ শুরু করতে গিয়ে গাদাগাদা বৈঠক করতে হয়! সাফল্য নেই, তাই অর্থ নেই। অর্থ নেই, তাই স্বপ্ন নেই। স্বপ্ন নেই, তাই ভবিষ্যৎ নেই।

বীরভোগ্যা বসুন্ধরা। বীর কে, না যে লড়াই করে জেতে। বীর সে, যে ঝুঁকি নিতে পারে। বীর সে, যে হারেও মহীয়ান থাকে। বীর সে, যে হারতে হারতে জেতে। রবিবার রাতে যে ভারতীয় দল বিশ্বকাপ জিতল, সেই দলের মধ্যে এই দর্শনটা ঢুকিয়ে দিতে পেরেছেন কোচ গৌতম গম্ভীর এবং অধিনায়ক সূর্যকুমার। খেলা শেষের পর সাংবাদিক বৈঠকে গম্ভীর বলছিলেন, ‘‘এই টিমের ড্রেসিংরুমে যে ছেলেরা আছে, তাদের কাছে ব্যক্তিগত মাইলফলকের কোনও দাম নেই। তাদের কাছে শুধু ট্রফির দাম আছে। আমি প্রথমেই ওদের স্পষ্ট বলে দিয়েছিলাম, আমি যতদিন আছি, ততদিন কোনও ব্যক্তিগত মাইলফলক উদ্‌যাপন কোরো না। দলগত ট্রফিজয় উদ্‌যাপন কোরো। ৯৪ থেকে ছক্কা মেরে সেঞ্চুরিতে যাও। কিন্তু ঠুকঠুক করে ছ’টা সিঙ্গল নিয়ে শতরান কোরো না।’’ ঠিকই। সঞ্জু স্যামসনকে প্রশ্ন করা হল, দুটো ম্যাচে ৯৭ আর ৮৯ রান করলেন। কিন্তু বড় শট খেলতে গিয়ে দুটো সেঞ্চুরিও তো মিস্‌ করলেন! পুরো প্রতিযোগিতা না খেলেও বিশ্বকাপের ‘প্লেয়ার অফ দ্য টুর্নামেন্ট’ হওয়ার মতো আপাত-অঘটন ঘটানো ওপেনার সহাস্যে জবাব দিলেন, ‘‘আরে! একটা ৯৭ আর একটা ৮৯ তো করেছি। সেটাই বা কম কিসে?’’ দর্শন খুব সহজ ব্যক্তিগত মাইলফলক অর্থাৎ শতরান বড় কথা নয়। দলের রানটা বাড়িয়ে নিয়ে যেতে হবে। বড় শট খেলতে হবে। উইকেট গেলে যাক! তাঁর অধীনস্থ টিম ইন্ডিয়াকে আর কী বলেছিলেন ‘গুরু’ গম্ভীর? বলেছিলেন, ‘‘হাই রিস্ক, হাই রিওয়ার্ড খেলা খেলো। বড় ঝুঁকি নাও। তবেই না বড় পুরস্কার মিলবে। প্রতি ম্যাচে আমরা কুড়ি ওভারে ১৬০-১৬৫ নয়, আড়াইশো তোলার জন্য ব্যাট করব। সেটা করতে গিয়ে ১০০ রানে অল আউট হয়ে গেলেও ক্ষতি নেই।’’

‘রিপিট হিস্ট্রি, ডিফিট হিস্ট্রি’। অর্থাৎ, ইতিহাসকে পুনরাবৃত্ত করো। ইতিহাসকে হারাও। গত দু’বছর ধরে সেই দর্শনে প্রত্যয়িত ভারতীয় ক্রিকেটদল বিশ্বকাপ শুরুর আগের বিজ্ঞাপনী ট্যাগলাইনটা সত্যি করেই ছাড়ল। দু’বছর আগে বার্বেডোজ়ে যে বিশ্বজয়ের ইতিহাস তৈরি হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি করো। দ্বিতীয়, আয়োজক দেশ টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিততে পারে না বা পর পর দু’বার কোনও দেশ জিততে পারে না, ইতিহাসকে পরাজিত করো। আমাদের এই দেশে এখনও বহু নাগরিক আধপেটা খেয়ে দিনাতিপাত করেন। এই দেশে এখনও দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন হল না। এই দেশে এখনও ভ্রূণহত্যা হয়। এই দেশ এখনও ধর্মান্ধতায় আচ্ছন্ন। এই দেশে এখনও বিভেদের বীজ বোনা হয় অহরহ। এই দেশের রাজনীতিকেরা এখনও ঘৃণাভাষণ করেন। নির্বাচনের আগে মেরুকরণের আশ্রয় নেন। এই দেশে এখনও গণপ্রহারে মানুষের মৃত্যু হয়। এই দেশ বহুদিন কোনও নোবেলজয়ী লেখক দেয়নি। এই দেশ সম্প্রতি কোনও আন্তর্জাতিক স্তরের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সফল হয়নি। এই দেশ পারলেই যুদ্ধ করে, অস্ত্রের আস্ফালন করে এবং নরম মাটি দেখলেই আঁচড়ায়। এই দেশে রাজনীতির দৈনন্দিন এবং একঘেয়ে কচকচি চালু থাকে, টিভির বিতর্কে চিৎকৃত উপস্থিতি জানান দেওয়া হয়। এই দেশে পরস্পরকে বেনজির ভাষায় আক্রমণ করা হয় অমুক বিতর্ক বা তমুক বিতর্কে। এই দেশ এখন ভাসমান ‘রিল’ তৈরির এক সর্বগ্রাসী বন্যা এবং মেট্রো বা বাসে-ট্রেনে সহযাত্রীর অসুবিধার তোয়াক্কা না করে গাঁক গাঁক করে মোবাইলে সেই ‘রিল’ দেখার চূড়ান্ত অভব্যতায়। চারদিকের এই তুমুল অসৈরণ, এই ক্লীবতা, এই আগ্রাসী সমাজ এবং এই সামগ্রিক হতাশার দ্বীপ থেকে ক্রিকেট এবং একমাত্র ক্রিকেটই আমাদের এক ধাক্কায় ঠেলে বিশুদ্ধ আবেগ এবং গর্বের সমুদ্রে ফেলে দিতে পারে। সেই গর্বই মধ্যরাতে হিসাব কষে দেখে, ভারত এ যাবৎ ক্রিকেটে ১৪টি বিশ্বকাপ জিতেছে।

ধারাভাষ্যকার ক্রিকেটপ্রজ্ঞা প্রাক্তন ইংরেজ অধিনায়ক শুকনো রসবোধে তৃপ্ত অহরহ মশকরায় মত্ত নাসের হুসেন বলছিলেন, ‘‘ভারত এখন বিশ্বক্রিকেটের হৃৎস্পন্দন। ভারত এখন সেরা ক্রিকেট খেলছে। ভারতীয় ভক্তেরা সারা পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। ক্রিকেটের সেরা ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট আইপিএল ভারতেই হয়।’’ সেই হৃৎস্পন্দন শুনতে পেয়েই শহরের প্রাণকেন্দ্রে রাজনৈতিক ধর্নামঞ্চ বিশ্বকাপ ফাইনাল শুরুর আধঘণ্টা আগে ‘ছুটি’ ঘোষণা করে। টিভির সামনে বসে-পড়া শহরের শুনশান রাজপথে ‘টিকিয়া উড়ান’ গাড়ি চালিয়ে ধর্মতলা থেকে সল্টলেক পৌঁছোনো যায় ২৩ মিনিটে। পাড়ায় পাড়ায় চাঁদা তুলে জায়ান্ট স্ক্রিন টাঙানো হয়। নিউজিল্যান্ডের গোটাতিনেক উইকেট পড়তে না পড়তেই ব্যান্ড আর তাসা পার্টি ‘বুক’ হয়ে যায়। হৃৎস্পন্দন দ্বিগুণ হয়ে বাজে, যখন ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী সঞ্জু ব্যাট-হেলমেট সরিয়ে পিচের উপর নতজানু হয়ে বসেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে দস্তানা-পরা দু’হাতে বুকের উপর আঁকেন ক্রুশচিহ্ন। ফাইনালের পরে তাঁকে এসে জড়িয়ে ধরেন মুসলিম ধর্মাবলম্বী মহম্মদ সিরাজ। যিনি উইকেট নিয়ে দোয়া মাঙেন। আচম্বিতে বিশ্বকাপ দলে যোগ দেওয়ার ফোন পেয়ে ভাবেন, আল্লাতালা তাঁর জন্য এক অন্যরকম চিত্রনাট্য তৈরি করে রেখেছেন। চ্যাম্পিয়ন ভারতীয় অধিনায়কের সাংবাদিক বৈঠকে প্রথম প্রশ্ন করেন এক মহিলা সাংবাদিক। জবাব দেওয়ার আগে হিন্দু ধর্মাবলম্বী সূর্যকুমার তাঁকে বলেন, ‘‘আপনাকে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শুভেচ্ছা।’’ এটাই ভারতবর্ষ। এই দেশেরই এক বলিষ্ঠ সন্তান সুর্যকুমার। এই ভারতবর্ষই সূর্যের এক নাম। আমরা রয়েছি সেই সূ্র্যের দেশে। যে দেশের ক্রিকেটচঞ্চল আবেগের সমুদ্রে গঙ্গা-যমুনা-ভাগীরথী মিশে যায়। সূর্যকুমারে মিশে যান সঞ্জু-সিরাজ-‌বুমরা-‌অভিষেকেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles