পশ্চিমবঙ্গে ভোটের জন্য মোট ৪৮০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে বলে আগেই জানিয়েছিল কমিশন। ইতিমধ্যেই কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় কেন্দ্রীয় বাহিনী রুট মার্চ এবং এলাকা চেনার কাজ শুরু। বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের সব বুথ এলাকায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর টহলদারি হবে। ১৪ মার্চ রাত ৮টার মধ্যে রাজ্যের সবক’টি ভোটকেন্দ্রে কেন্দ্রীয় বাহিনীর প্রথম দফায় টহলদারির কাজ শেষ করতে হবে বলে মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ভোটের জন্য মোট ৪৮০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে বলে আগেই জানিয়েছিল কমিশন। জওয়ান এবং কর্মী মিলিয়ে এক কোম্পানিতে ১০০ থেকে ১২০ জন করে সদস্য। অর্থাৎ, গোটা পশ্চিমবঙ্গের জন্য আনুমানিক ৫০ হাজার আধাসেনা মোতায়েন করা হচ্ছে। কোথায় কত বাহিনী মোতায়েন থাকবে, তা-ও চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছে। মার্চের প্রথম দিকে ২৪০ কোম্পানি অর্থাৎ ২৮,৮০০ জন বাহিনী রাজ্যে চলে এসেছে। কলকাতায় আপাতত ৩০ কোম্পানি অর্থাৎ ৩,৬০০ জন বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন আধিকারিকের দফতর। আপাতত তারা এলাকা চেনার কাজ শুরু করেছে। এ বারের প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতে ভোটগ্রহণ করা হবে বলে কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বুথের সংখ্যা সংখ্যা ৮০ হাজারের বেশি। যদি বাড়তি ১৪ হাজার করা হয় তা হলে মোট বুথের সংখ্যা হবে ৯৪ হাজার। ফলে ৪৮০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনীর সাহায্যে প্রতি ভোটকেন্দ্রে তা মোতায়েন করে ভোট করাতে হলে এক দফায় বিধানসভা ভোট হবে না রাজ্যে। কোনও জেলায় প্রাথমিক ভাবে কত বাহিনী মোতায়েন করা হবে, তার প্রাথমিক তথ্যও মিলেছে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর থেকে। উত্তর ২৪ পরগনায় তিন পুলিশ জেলা এবং দুই কমিশনারেট মিলিয়ে বাহিনীর সংখ্যা হবে মোট ৫৮ কোম্পানি। মুর্শিদাবাদেও বাহিনীর সংখ্যা হবে ৫৮ কোম্পানি। পাশাপাশি দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ৩৩ কোম্পানি এবং কলকাতায় ৩০ কোম্পানি মোতায়েন থাকবে। দুই ধাপে মিলিয়ে পূর্ব মেদিনীপুরে ২৮ কোম্পানি, হুগলিতে ২৭ কোম্পানি, পূর্ব বর্ধমানে ২৫ কোম্পানি, নদিয়ায় ২২ কোম্পানি, হাওড়া এবং বীরভূমে ২১ কোম্পানি করে, পুরুলিয়া এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে ২০ কোম্পানি করে বাহিনী মোতায়েন করছে কমিশন। পাশাপাশি উত্তর দিনাজপুরে ১৯ কোম্পানি, মালদহে ১৮ কোম্পানি, পশ্চিম বর্ধমানে ১৭ কোম্পানি, দার্জিলিঙে ১৬ কোম্পানি, কোচবিহারে ১৫ কোম্পানি, বাঁকুড়ায় ১৩ কোম্পানি, ঝাড়গ্রামে ১১ কোম্পানি, দক্ষিণ দিনাজপুর এবং জলপাইগুড়িতে ১০ কোম্পানি করে বাহিনী মোতায়েন হচ্ছে। আলিপুরদুয়ারেও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সংখ্যা হচ্ছে সাত কোম্পানি এবং কালিম্পঙে চার কোম্পানি।
২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের ফল ঘোষণার পর রাজ্যের নানা প্রান্তে অশান্তির ঘটনা ঘটেছিল। তা নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল রাজ্য-রাজনীতি। আসন্ন বিধানসভা ভোটের আগে নির্বাচন কমিশনের বৈঠকে উঠল সেই প্রসঙ্গও। সেই সময় হিংসাকবলিত এলাকার থানাগুলিতে কারা ওসি ছিলেন, সেই তালিকা রাজ্য পুলিশের ডিজি পীযূষ পাণ্ডের কাছে চাইল কমিশন। শুধু তা-ই নয়, সংশ্লিষ্ট ওসিদের ঊর্ধ্বতন কর্তা কারা ছিলেন, তা-ও জানতে চেয়েছেন দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। কলকাতায় এসেছে জ্ঞানেশ-নেতৃত্বাধীন কমিশনের ফুল বেঞ্চ। সফরের তৃতীয় দিনে মঙ্গলবার রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীর সঙ্গে বৈঠক করে তারা। সেই বৈঠকে ছিলেন রাজ্য পুলিশের ডিজি, মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল, রাজ্য পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর নোডাল অফিসারেরা। সেই বৈঠকেই গত বারের ভোট-পরবর্তী হিংসার বিষয়টি ওঠে। নন্দিনী-পীযূষদের সঙ্গে বৈঠকে ভোটপরবর্তী হিংসার প্রসঙ্গ তোলেন জ্ঞানেশ। গত বার কী ঘটেছিল, তা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, সেই সময় হিংসাকবলিত এলাকার ওসি এবং তাঁদের ঊর্ধ্বতন কর্তাদের তালিকা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, জানতে চাওয়া হয়েছে ওই পুলিশ অফিসার এবং আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কোনও বিভাগীয় তদন্ত করা হয়েছে কি না! পুরো বিষয়টি রিপোর্ট আকারে জমা দেওয়ার কথা বলেছেন জ্ঞানেশ। পুলিশ-প্রশাসনের বৈঠকে মঙ্গলবারও কড়া মনোভাব দেখা যায় কমিশনের। সোমবারের বৈঠকেও কমিশনকে একই ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল। জ্ঞানেশের ভর্ৎসনার মুখে পড়তে হয় ডিজি (আইনশৃঙ্খলা) বিনীত গোয়েলকে। রাজ্যে মাদক নিয়ন্ত্রক উপদেষ্টা কমিটি নেই কেন, প্রশ্ন তোলেন জ্ঞানেশ। প্রশাসনের আধিকারিকদের নিয়ে কমিশনের ফুল বেঞ্চের বৈঠকে ‘ধমক’ খান রাজ্য এবং কেন্দ্রের বিভিন্ন আধিকারিক। দু’দিনের বৈঠকে কমিশন বার বার স্পষ্ট করে দিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ ভোট চায় তারা। সোমবার সব জেলার জেলাশাসক, পুলিশ কমিশনার, পুলিশ সুপারের সঙ্গে বৈঠকেও ভোটপরবর্তী হিংসার বিষয়টি তুলেছিল কমিশন। সূত্রের খবর, ওই বৈঠকে জ্ঞানেশ বলেন, ‘‘২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। গোটা দেশ দেখেছিল ভোট-পরবর্তী হিংসার ছবি।’’ কমিশনের নির্দেশ, ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না-হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে প্রশাসনকেই। ২০২১ সালের ভোটপরবর্তী হিংসায় পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূলকে কাঠগড়ায় তুলেছিল বিরোধীরা। অভিযোগ উঠেছিল, পুলিশ সব জেনেও নিষ্ক্রিয়। নানা প্রান্তে যা ঘটনা ঘটেছিল, তাতে হস্তক্ষেপ করে আদালতও। গঠন হয়েছিল বিশেষ বেঞ্চ। বিশেষ বেঞ্চ নির্দেশ দিয়েছিল, খুন, ধর্ষণের মতো গুরুতর মামলার তদন্ত করবে সিবিআই। মারধর এবং হুমকির মতো ঘটনার তদন্ত করবে কোর্টের নির্দেশে গঠিত রাজ্য পুলিশের বিশেষ দল। ঘরছাড়াদের কোর্টের নজরদারিতে বাড়িতে ফেরানোর নির্দেশও হয়েছিল। হিংসার শিকার হওয়া মানুষদের ক্ষতিপূরণেরও নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
রাজ্যে হিংসামুক্ত ভোটের কথা বললেন দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। মঙ্গলবার কলকাতায় সাংবাদিক বৈঠকে তিনি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের ভোট হবে অবাধ, শান্তিপূর্ণ। কোনও রকম হিংসা বরদাস্ত করা হবে না।” এই সূত্রেই তিনি জানিয়েছেন, ভোটের কাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের ভয় দেখানো বা হুমকি দেওয়া যাবে না। এই সংক্রান্ত অভিযোগ পেলে কঠোর পদক্ষেপ করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, বৈধ কারও নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে না। জ্ঞানেশ জানিয়েছেন, এ বার পশ্চিমবঙ্গে ৮০ হাজারেরও বেশি ভোটগ্রহণ কেন্দ্র বা বুথ থাকবে। কোনও বুথে ১২০০-র বেশি ভোটার থাকবেন না। স্বচ্ছতার খাতিরে প্রতিটি বুথে ওয়েব কাস্টিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে। জ্ঞানেশ এ-ও জানিয়েছেন, প্রতিটি বুথে ভোটার সহায়তা কেন্দ্র, পানীয় জলের বন্দোবস্ত এবং বাইরে মোবাইল ফোন রাখার জায়গা থাকবে। এসআইআর, তথ্যগত অসঙ্গতি বা লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি, ভোটের সম্ভাব্য দফা নিয়েও বক্তব্য জানিয়েছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। মঙ্গলবারের সাংবাদিক বৈঠকে জ্ঞানেশ ছাড়াও ছিলেন অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার বিবেক জোশী এবং সুখবীর সিংহ সান্ধু। ছিলেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়ালও। বিবেচনাধীন ৬০ লক্ষ ভোটার ভোট দিতে পারবেন কি না, তা অবশ্য স্পষ্ট করেননি জ্ঞানেশ। তিনি জানিয়েছেন, বিবেচনাধীন ভোটারদের নথি খতিয়ে দেখার কাজ করছেন আদালত নিযুক্ত বিচারক এবং বিচারবিভাগীয় আধিকারিকেরা। ইতিমধ্যেই কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছেন, ১০ লক্ষেরও বেশি ভোটারের তথ্য যাচাইয়ের কাজের নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকি ৫০ লক্ষ ভোটারের ক্ষেত্রে কী হবে, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়। জ্ঞানেশ বলেছেন, “যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অতিরিক্ত (ভোটার) তালিকা প্রকাশ করা হোক।” জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ভাবে আক্রমণ শানাচ্ছে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল। এই নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বলেন, “ভারত গণতান্ত্রিক দেশ। সকলের বাক্স্বাধীনতা আছে। রাজনৈতিক দল কিছু বলতেই পারে। তা নিয়ে আমাদের কিছু বলার নেই। আমরা রাজনৈতিক মন্তব্যের উত্তর দিই না।” নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে মঙ্গলবার একগুচ্ছ পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন জ্ঞানেশ। তিনি বলেন, “ভিভিপ্যাটের সঙ্গে ইভিএমের তথ্যে গরমিল দেখা গেলে, পুরোটাই পরীক্ষা করে দেখা হবে। আর তা কাউন্টিং এজেন্টের সামনেই করা হবে।” নির্বাচনের দিন দু’ঘণ্টা অন্তর কমিশনের অ্যাপ এবং সাইটে ভোটের হার প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন জ্ঞানেশ। কোনও প্রার্থী চাইলে নির্বাচনের পর সাত দিনের মধ্যে ইভিএম পরীক্ষা করানো যাবে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জানিয়েছেন, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট করাতে কমিশন বদ্ধপরিকর। কোনও রকম কারচুপি বরদাস্ত করা হবে না। ভোটের কাজে যুক্ত প্রত্যেক আধিকারিককে একমাত্র কমিশনের নির্দেশমতো কাজ করতে হবে। কোনও রাজনৈতিক দল কিংবা নেতার নির্দেশে কাজ করলে ওই আধিকারিকের বিরুদ্ধে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারও বিরুদ্ধে যদি ভোটারদের ভয় দেখানো বা প্রভাবিত করার অভিযোগ ওঠে, তা হলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করবে কমিশন।





