মহিলাদের প্রাপ্য সম্মান জানানো হে পুরুষ সমাজ, নারীদিবসে আপনাদের ধন্যবাদ। নারীদের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকার বদলে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিক। জামায় পিরিয়ড স্টেন দেখলে আপাদমস্তক ‘জাজ’ করার বদলে জানিয়ে সতর্ক করুক মেয়েটিকে। রাতের রাস্তায় তাকে নিরাপদ অনুভব করাক। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা নির্বিশেষে রাতে বাড়ি ফেরা ভাবলেই যে ভয় আঁকড়ে ধরে মেয়েদের, তা কি মেয়েদের ভালো লাগে? আলাদা করে ‘নারী দিবস’ পালনের চেয়ে, আলাদা করে লেডিস সিট সংরক্ষণের চেয়ে, যদি রোজকার জীবনের অংশই করে নেওয়া যায় নারীদের প্রতি সম্মানকে, তাহলে হয়তো সকলের পক্ষে পৃথিবী আরও অনেকখানি বেশি বাসযোগ্য হয়ে উঠবে। হয়তো আসলে ভয় নয়, পুরুষকে এমন ধন্যবাদই বারেবারে জানাতে চেয়েছে মেয়েরা। চেয়েছে। আর জি কর-এর নারকীয় ধর্ষণ-হত্যার ঘটনার ক্ষত আজও টাটকা পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ নারীর হ্রদয়েই। যে বিচারের আশায় রাত জেগেছিল অসংখ্য মেয়ে, দেড় বছর পেরিয়ে সে বিচার আজও অধরা। সে মিছিলে তো বহু পুরুষও ছিলেন, যারা সত্যিই বিশ্বাস করেন বিচারের প্রয়োজনীয়তায়। যারা সত্যিই বাড়ির মেয়েটিকে নিয়ে চিন্তিত, চিন্তিত পথের অচেনা সহযাত্রীকে নিয়েও। এ তালিকা অবশ্য বলতে বসলে শেষ করা যাবে না। নির্ভয়ার ঘটনাটি দিয়েও গুনতে শুরু করা যায় যদি, তবুও কোথায় এসে থামতে পারা যাবে? আগামী হাজার প্রজন্মের নারীদেরকেও যে এমন ভয়েই বাঁচতে হবে, তা তো গত কয়েকদিনের বাংলাদেশের শিশু ধর্ষণের ঘটনাগুলিই জানান দেয়। এমনকি গত মাসে বিশ্বের সমস্ত সংবাদমাধ্যমকে কাঁপিয়ে দিল যে এপস্টিন ফাইলস, তার মূলেও তো একই কথা— নারী যেন পুরুষের ভোগ্য বস্তু। যাকে পুরুষ ভালোবাসাও দেখায় যদি, তবে তা নেহাতই স্বার্থে! সোশাল মিডিয়ায় প্রায়শই ঘুরে বেড়ায় একটা কোটেশন, যেখানে বলা হয়েছে, অন্য কোনও প্রাণীর মাংস খাওয়া নিয়ে মানুষে মানুষে বিভেদ থাকতে পারে। একমাত্র নারীমাংসের প্রসঙ্গেই একমত হয় জগতের সমস্ত পুরুষ। সম্প্রতি খবরে উঠে এসেছিল আফগানিস্তানের ঘটনা। সেখানে তালিবান শাসন চলতে জানিয়ে দেওয়া হয় নাগরিকদের, পুরুষ তার স্ত্রী ও সন্তানদের ততক্ষণ পর্যন্ত প্রহার করতে পারবেন, যতক্ষণ না শরীরের কোনও হাড় ভেঙে যাচ্ছে। অথবা বাইরে থেকে দেখে ক্ষত বুঝতে পারা যাচ্ছে। হাড় ভেঙেও যায় যদি, তবে বড়জোর ১৫ দিনের হাজতবাস হবে সে পুরুষের! মেয়েরা কিন্তু অকৃতজ্ঞ নয়! তাদের বরং বিশ্বাস, নারী দিবসের উদযাপন মেয়েদের যতখানি, ততখানিই ছেলেদেরও। সত্যিই যে পুরুষেরা মেয়েদের দুর্বল ভাবার বদলে সমকক্ষ ভাবেন, তাদের সাহায্য করাকে আলাদা করে গুরুদায়িত্ব না ভেবে স্বাভাবিক সহাবস্থানের অঙ্গ হিসেবে দেখেন, তাদের ধন্যবাদ না জানালে অসম্পূর্ণ থেকে যায় নারী দিবস। যে-সঙ্গী আগে বাড়ি ফিরলে রান্না করে রাখেন তাঁর সঙ্গিনীর জন্য, যে-বাবা রাত হলে মেয়ে না-ফেরা অবধি জেগে থাকেন, যে-ভাই খুনসুটির মাঝেও খেয়াল রাখে দিদির মনখারাপের দিনগুলো— ধন্যবাদের দাবিদার তাঁরা সক্কলেই। বিশ্বাস করুন, পুরুষ-মুক্ত পৃথিবী মেয়েরা চায়নি কোনওকালেই। পৃথিবীর তামাম নারীদের এটুকুই চাহিদা কেবল, যেন পরিচিত-অপরিচিত নির্বিশেষে প্রত্যেক পুরুষই ধন্যবাদের যোগ্য হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসে যদি সেইসব নারীদের তালিকা করতে বসা হয়, যাঁরা অনুপ্রাণিত করেছেন ভারত তথা বিশ্বের নারীদের, তবে হয়তো তাঁর তল খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে। নানাক্ষেত্রে নানাভাবে বারেবারেই প্রমাণ করেছেন নারীরা, যে তাঁরা পিছিয়ে থাকবেন না কিছুতেই! পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তুলে নেবেন যাবতীয় সামাজিক দায়িত্ব। ঘরের কাজে দক্ষ হবেন যেমন, তেমনই কর্মক্ষেত্রে হবেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। আজ রইল তেমনই কয়েকজন নারীর কথা। স্মৃতি মন্ধানা – ভারতের জাতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের অন্যতম প্রধান খেলোয়াড় স্মৃতি মন্ধানা। ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দল ওয়ার্ল্ড কাপ জিততেই অন্যান্য মহিলা ব্যাটারদের পাশাপাশি তিনিও হয়ে ওঠেন সোশাল মিডিয়ার আলোচ্য বিষয়। আইসিসি মহিলা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টেও ভারতের হয়ে খেলেছেন তিনি। তবে সবচাইতে বেশি চর্চায় উঠে আসেন তখন, যখন মাত্র এক-দুইদিন বাকি থাকতে ভেস্তে যায় পলাশ মুচ্ছলের সঙ্গে তাঁর বিয়ে! নেটিজেনদের সিংহভাগ তাঁর প্রতি সহমর্মিতা জানালেও, স্মৃতি তো কারও দয়া দাক্ষিণ্য চাননি। তিনি যোগ্যতা যে আদতেই আলোচনার দাবি রাখে, তা আরও একবার ফর্মে ফিরে এসে তিনি জানান দেন দুনিয়াকে। মেয়েদের ক্রিকেট খেলার ক্ষেত্রে এমন অনুপ্রেরণা সত্যিই বিরল। কাঞ্চন চৌধুরী ভট্টাচার্য – ‘মরদানি’ সিনেমায় যে তুখোড় অ্যাকশন দেখালেন রানি মুখার্জি, তা কিন্তু কেবল নারীশক্তির আস্ফালন দেখানোর টানটান স্ক্রিপ্ট নয়। যাঁর বাস্তব জীবনের কাহিনী থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই কাহিনির নির্মাণ, তাঁর নাম কাঞ্চন চৌধুরী ভট্টাচার্য। তিনি আইপিএস অফিসার। অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ভারতের যেসব মহিলা পুলিশ অফিসার, তাঁদের মধ্যে প্রথম সারিতে থাকা অফিসারদের অন্যতম তিনি। তাঁর মতো ব্যক্তিত্ব আদপেই বিরল। শকুন্তলা দেবী – মানুষ নয়, যেন ‘হিউম্যান কম্পিউটার’! অত্যন্ত মেধাবি ভারতীয় গণিতবিদ শকুন্তলা দেবী। জটিল গণনার সমাধান করতে অন্য কোনও সরঞ্জাম তো নয়েই, তাঁর প্রয়োজন পড়ত না ক্যালকুলেটরেরও। অঙ্ক যাতে সবার বিষয়ে হয়ে উঠতে পারে, সে জন্য বেশ কিছু মজাদার বইও লেখেন তিনি। গণনার অসামান্য দক্ষতার জন্য তাঁর জায়গা হয়েছে গিনিজ বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকরদস-এ। তাঁকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে বলিউড সিনেমাও। অরুন্ধতী ভট্টাচার্য – জটিল হিসেবনিকেশ মেয়েদের কম্মো নয়— এমন ধারনা রাখেন অনেকেই। সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে এ ধারনা ভ্রান্ত প্রমাণ করেছিলেন ভারতীয় ব্যাংকার অরুন্ধতী ভট্টাচার্য। তিনি স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার (এসবিআই) প্রাক্তন চেয়ারপারসন। তিনি ভারতের বৃহত্তম ব্যাংকের নেতৃত্বদানকারী প্রথম মহিলা ছিলেন। তার মেয়াদকালে তিনি ডিজিটাল ব্যাংকিং, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং গ্রাহক পরিষেবা উন্নত করায় মনোনিবেশ করেছিলেন। তিনি এমন কর্মসূচিও প্রচার করেছিলেন যা মহিলা উদ্যোক্তাদের ঋণ পেতে এবং ব্যবসা শুরু করতে সহায়তা করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০ মে ২০১১ বাংলার মুখ্যমন্ত্রী পদে ক্ষমতায় এলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী, সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতাও। তিনি যে কেবল রাজ্যের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নজির গড়েছেন তাই নয়, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর মতো প্রকল্প গড়ে বলীয়ান করেছেন রাজ্যের মেয়েদেরকেও। রয়েছে কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, স্বাস্থ্যসাথী, দুয়ারে সরকার, আমাদের পাড়া আমাদের সমাধান, যুবসাথী প্রভৃতি জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ, যা জনমননে তাঁর স্থান পাকা করেছে। ২০১২ সালে টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে বিশ্বের ১০০জন প্রভাবশালী ব্যক্তির অন্যতম হিসেবে অভিহিত করে। সেই একই বছর ব্লুমবার্গ মার্কেটস্ তাঁকে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাবশালী ৫০জন ব্যক্তির মধ্যে পরিগণিত করে। ২০১৮ সালে স্কচ তাঁকে বর্ষসেরা মুখ্যমন্ত্রী সম্মাননা প্রদান করে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচন, ২০১৬ ও ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন প্রতিবারই বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় বহাল থেকেছেন।





