২০২৬ সালের বসন্তে ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা এবং ইজরায়েল একত্রে আক্রমণ করল ইরান। নিহত ইরানের সর্বশক্তিমান আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। ইরান হেনেছে প্রতিশোধের মিসাইল। সমস্ত মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে আরও এক রক্তরাঙা বসন্ত। বসন্ত বড় নির্মম ঋতু। এক হাতে তার ফুলের ডালা। অন্য হাতে ধ্বংসের অব্যর্থ অস্ত্র। সেই কবেকার অন্ধকার কাল থেকেই বসন্ত ঋতুর নির্মমতা আমরা দেখে আসছি! এমনকী রাম-রাবণের পৌরাণিক যুদ্ধের প্রাক্কালে বাল্মীকির মহাকাব্যে প্রকৃতির যে মধুর রূপের বর্ণনা দিয়েছেন, তা কি বলে দিচ্ছে না, এখন বসন্ত জাগ্রত দ্বারে? প্রাণের উৎসব এবং আনন্দের ডাকের মাঝেই হিংস্র, নির্মম, নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে মানুষ! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। ১৯৪৩ সালের বসন্তকাল। ১৩৫০ বঙ্গাব্দ। চারদিকের প্রকৃতি উপচে পড়ছে বসন্ত ঋতুর সৌন্দর্যে, মাধুর্যে, অপর্যাপ্ত সম্ভারে। এবং তারই মধ্যে দেখা দিল ইংরেজ শাসকের তৈরি ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ। এবং হাজার হাজার মানুষ এই বাংলায় মরতে লাগল খেতে না পেয়ে। বিভূতিভূষণের ‘অশনি সংকেত’ উপন্যাসে একদিকে প্রকৃতির মধ্যে সর্বত্র নতুন প্রাণের রং ও প্রকাশ। মানুষের যুদ্ধ দুর্ভিক্ষের মধ্যে বেঁচে থাকার। সত্যজিৎ রায়ও ‘অশনি সংকেত’ সিনেমার প্রথমেই ফুটিয়ে তুলেছেন বাংলার গ্রামে বসন্ত ঋতুর প্রাণময় পর্যাপ্তি আর উপোসি মানুষের প্রাণের লড়াই প্রকৃতির সেই প্রাচুর্যের মধ্যেও। তবে মানুষের সেই লড়াইতে ছিল না রক্তপাত। ছিল ক্ষুদার দহন ও মরণ। বসন্তকালে চারিদিকে যখন প্রাণের উৎসব এবং আনন্দের ডাক, তখনই কেন পৃথিবীতে বারবার নেমে এসেছে যুদ্ধ, ধ্বংস, রক্তপাত? বসন্ত ঋতু কেন মানুষকে করে তোলে হিংস্র, নির্মম, নিষ্ঠুর? ১৯১৮-র বসন্তে ইতালিতে যুদ্ধ, রক্তপাত, মৃত্যু, এবং তারই মধ্যে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া প্রেম– এই ছবি কি বাস্তব করে তোলেননি আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ উপন্যাসে? তিনি বর্ণনা দিয়েছেন ইটালির বসন্তের, অবিকল্প গদ্যে এবং দৃষ্টির বিন্যাসে। হেমিংওয়ে লিখছেন কীভাবে বসন্তের আগমন হয় ইতালিতে: ‘দ্য মাউন্টেনস আর সারাউন্ডেড বাই মিস্ট। দ্য স্নো ফিডিং দ্য স্ট্রিমস। অ্যান্ড স্নো ইন দ্য মাউন্টেনস ইজ পাউডার্ড’। এই গুঁড়ো গুঁড়ো বরফের মধ্যে এই কুয়াশার মধ্যে আসন্ন যুদ্ধের রক্তের দাগ দেখতে পেয়েছিলেন হেমিংওয়ে। তাই তঁার যুদ্ধেও বসন্তের নির্মমতা উপস্থিত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের এক ভয়ংকর রূপ এবং হাজার হাজার মানুষের রক্তে রাঙা হয়ে ওঠা ১৯১৪-র বসন্তকালের কি করুণ বর্ণনা নেই এরিক মারিয়া রেমার্কের উপন্যাস ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’-এ? এই প্রসঙ্গে কি মনে পড়ে না লিও তলস্তয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ উপন্যাসের শুরুতে বসন্ত ঋতুর আবাহনে সেই স্প্রিং পার্টি, যার মধ্যে প্রায় গর্জে ঢুকে পড়ে ১৮০৫ সালের বিধ্বংসী নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীর পদশব্দ?





