‘মায়া নগরী’তে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালের যুদ্ধে নেমেছিল টিম ইন্ডিয়া। সেখানেও সঞ্জু-ঝড়। কলকাতায় যেখানে শেষ করেছিলেন, ঠিক সেখান থেকেই মুম্বইয়ে শুরু করলেন ভারতীয় দলের উইকেটরক্ষক-ব্যাটার। ১২ রান করা সঞ্জু স্যামসনের সহজ ক্যাচ ফেলে ভারতকে ইতিহাস গড়ার মঞ্চ সাজিয়ে দিলেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক! তারও আগে আর একটি ভুল করেন তিনি। টস জিতে সকলকে অবাক করে প্রথমে বল করার সিদ্ধান্ত নেন ব্রুক! জ্যাকব বেথেলের শতরানও ইংল্যান্ডকে জেতাতে পারল না। তাঁর ১০৫ রানের ইনিংসের সুবাদে ক্রিকেটপ্রেমীদের অবশ্য উপভোগ্য ক্রিকেট উপহার দিল ইংল্যান্ড। ভারতের ৭ উইকেটে ২৫৩ রানের জবাবে ইংল্যান্ড করল ৭ উইকেটে ২৪৬ রান। শেষ চারেও টসে হারলেন সূর্যকুমার যাদব। টস জিতে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি ব্রুকের। ইংল্যান্ড দলে একটি বদল। রেহান আহমেদের বদলে ঢুকলেন জেমি ওভার্টন। ভারতীয় দল অপরিবর্তিত। প্রথম ওভারে জোর্ফা আর্চারকে শক্ত হাতেই সামলালেন সঞ্জু স্যামসন। তাঁর বাউন্ডারি ও ওভার বাউন্ডারির সৌজন্যে ৬ বলে ভারতের স্কোর ১২। তবে ফের ব্যর্থ হলেন অভিষেক। জ্যাকসের ডেলিভারিতে পুল শট মারতে গিয়ে সল্টের হাতে ক্যাচ তুলে মাঠ ছাড়লেন। সংগ্রহ মোটে ৯ রান। ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট এরপরেই। নিজের দ্বিতীয় ওভারেই সঞ্জুকে প্যাভিলিয়নে ফেরানোর দুর্দান্ত সুযোগ পেলেন আর্চার। কিন্তু মিড অনে ক্যাচ মিসে জীবন পেলেন ভারতীয় ওপেনার। পরের বলেই অবশ্য় ছক্কা হাঁকিয়ে দম বন্ধ পরিস্থিতি দূর করেন সঞ্জু। সেই যে শুরু। তার পর আর থামানো যায়নি সঞ্জুকে। ২৬ বলে হাফসেঞ্চুরি পূরণ করেন। তাও আবার ডসনের বলে বিশাল ছক্কা হাঁকিয়ে। পাল্লা দিয়ে আগ্রাসী ব্যাটিং করছিলেন ঈশান কিষানও। এর ফলে ৮.৪ ওভারেই ১০০ রানের গণ্ডি পেরিয়ে গেল টিম ইন্ডিয়া। দুরন্ত শটে বল বাউন্ডারির বাইরে পাঠিয়ে দলকে দ্রুত শতরান এনে দিলেন সঞ্জু। তবে এর পরের ওভারেই সাজঘরে ফিরলেন ঈশান। রশিদের বলে তুলে মারতে গিয়ে জ্যাকসের হাতে ক্যাচ দিয়ে ১৮ বলে ৩৯ রান করে ফিরলেন। ইডেনে মাত্র ৩ রানের জন্য সেঞ্চুরি পাননি। ৫০ বলে ৯৭ রানে অপরাজিত ছিলেন সঞ্জু। ওয়াংখেড়েতে সেঞ্চুরির দিকেই এগোচ্ছিলেন। তবে তাঁর ইনিংস থামল সেঞ্চুরই থেকে ১১ রান দূরে। মূল্যবান উইকেটটি তুলে নিলেন জ্যাকস। ৪২ বলে ৮৯ রানে সল্টের হাতে ক্যাচ তুলে প্যাভিলিয়নে ফিরলেন। হাঁকালেন মোট ৮টি চার ও ৭টি ছক্কা। সঞ্জু যখন ফিরলেন ভারতের রান ১৩.১ ওভারে ৩ উইকেটে ১৬০ রান। অর্থাৎ, ভারতকে শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। তৈরি হওয়া মঞ্চে শিবম দুবে (৪৩) দাপুটে ব্যাটিং করলেও ফের ব্যর্থ অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব। ছক্কা মারার পরের বলেই আদিল রশিদকে সুইপ মারতে গিয়ে স্ট্যাম্প আউট সূর্য। ৬ বলে ১১ রানে ফেরেন ভারত অধিনায়ক। হার্দিক রান আউট হয়ে ফেরেন ১২ বলে ২৭ রানে। শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের সামনে ২৫৪ রানের লক্ষ্য রাখে টিম ইন্ডিয়া।

২৫৪ রান তাড়া করে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালে যাওয়ার জন্য প্রথম বল থেকেই মেরে খেলতে হত ইংল্যান্ডকে। ওভার প্রতি ১৩ রানের কাছাকাছি তুলতে হত। ‘বাজ়বল’ ক্রিকেটে অভ্যস্ত ব্রেন্ডন ম্যাকালামের দলের জন্য হয়তো অসম্ভব ছিল না। কিন্তু প্রতিপক্ষ দলে জসপ্রীত বুমরাহ, অর্শদীপ সিংহদের মতো বোলারেরা থাকলে সম্ভবও অসম্ভব হয়ে যায়। ফিল সল্ট-জস বাটলার জুটিকে ইনিংসের শুরুতে আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছিল। কিন্তু ব্রুকের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিয়ে হার্দিকের প্রথম বলেই আউট হলেন সল্ট (৫)। এ দিনও ফিফ্থ স্টাম্পের বলে আউট হলেন। বুমরাহের প্রথম বলে আউট হয়ে দলকে এক রকম ছিটকেই দিলেন ব্রুক (৬ বলে ৭)। ৩০ গজের বৃত্ত থেকে বাউন্ডারির দিকে প্রায় ২০ মিটার দৌড়ে ক্যাচ ধরেন অক্ষর পটেল। প্রথম ওভার বল করতে এসে বাটলারকে (১৭ বলে ২৫) বোল্ড করে ইংল্যান্ডকে আরও চাপে ফেলে দেন বরুণ চক্রবর্তী। যদিও প্রথম তিন বলেই ছয় মেরে বরুণের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বেথেল। আগ্রাসী মেজাজে শুরু করা টন ব্যান্টনকে (৫ বলে ১৭) আউট করেন অক্ষর। ইংল্যান্ডের আশা জিইয়ে রাখেন বেথেল-জ্যাকস জুটি। জ্যাকসকে আউট করে তাঁদের ৩৯ বলে ৭৭ রানের জুটি ভাঙেন অর্শদীপ। বাউন্ডারি লাইনে অক্ষরের অবিশ্বাস্য ফিল্ডিংয়ে ক্যাচ সম্পূর্ণ করেন শিবম। জ্যাকস ৪টি চার এবং ২টি ছয়ের সাহায্যে ২০ বলে ৩৫ রান করেন। ১৭২ রানে ৫ উইকেট হারানোর পর ইংল্যান্ডের জয়ের আশা প্রায় শেষ হয়ে যায়। তার পরও ভারতীয় দলকে চাপে রাখার চেষ্টা করেন বেথেল। তবে কারেন রান তোলার গতি বজায় রাখতে পারেননি। চাপের মুখেও বেথেল সমানে সমানে লড়াইয়ের চেষ্টা করে গেলেন। ১৯তম ওভারে কারেনকে (১৪ বলে ১৮) আউট করে ভারতকে সুবিধা করে দেন হার্দিক। ভাল ক্যাচ নেন তিলক। শেষ ওভারের প্রথম বলে বেথেল রান আউট হওয়ায় শেষ হয়ে যায় ইংল্যান্ডের আশা। ৮টি চার এবং ৭টি ছয়ের সাহায্যে ৪৮ বলে ১০৫ রান করেন তিনি। বেথেল যতক্ষণ ২২ গজে ছিলেন, ততক্ষণ কিছুটা হলেও চাপে ছিল ভারতীয় দল। শেষ পর্যন্ত ২২ গজে ছিলেন আর্চার (১৯) এবং ওভারটন (২)। ভারতের সফলতম বোলার হার্দিক ৩৮ রানে ২ উইকেট নিলেন। ৩৩ রানে ১ উইকেট বুমরাহের। ৩৫ রানে ১ উইকেট অক্ষরের। অর্শদীপ ১ উইকেট নিলেন ৫১ রান খরচ করে। বরুণ ১ উইকেট পেলেও খরচ করলেন ৬৪ রান। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বিশ্বের এক নম্বর ব্যাটারের মতো ভারতের উদ্বেগ বাড়াচ্ছেন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বিশ্বের এক নম্বর বোলারও!





