ইডেনের ‘কোয়ার্টার’-যুদ্ধে জিতে ভারত সেমিফাইনালে। ডাগআউটে বসে বসে হয়তো মনের মধ্যে একটা প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছিলেন সঞ্জু। অগ্নিপরীক্ষায় নিজেকে প্রমাণ করে ‘বঞ্চনা’র জবাব দেব! ক্যারিবিয়ানদের দুর্ভাগ্য ও ভারতের সৌভাগ্য যে এই ম্যাচটায় তিনি সঞ্জু থেকে ‘সুপার’সঞ্জু হয়ে উঠলেন। ম্যাচে টসভাগ্য সহায় সূর্যকুমার যাদবের। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ব্যাট করতে পাঠান ভারত অধিনায়ক। ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই ওপেনার দেখেশুনে শুরু করেন। জশপ্রীত অর্শদীপ সিংয়ের প্রথম ওভারে ওঠে মাত্র ৩ রান। কয়েক ওভারের মধ্যেই খারাপ ফিল্ডিংয়ের নিদর্শন রাখেন বরুণ চক্রবর্তী। দুই ক্যারিবীয় ওপেনার হোপ এবং রস্টন চেজ একই দিকে চলে এসেছিলেন। ভারতীয় স্পিনার না দেখেই বল ছুড়ে দিলেন উইকেটকিপারের হাতে। তাঁকে থ্রো করতে হত বোলিং এন্ডে। ফলে রান আউটের সহজ সুযোগ নষ্ট হল। কেবল রান আউট নয়, পঞ্চম ওভারে বুমরাহর বলে চেজের লোপ্পা ক্যাচ মিস করলেন অভিষেক শর্মা। পাওয়ার প্লেতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৪৫ রান। টিম ইন্ডিয়াকে ব্রেক থ্রু এনে দিলেন বরুণ। হোপকে (৩২) বোল্ড করেন। এরপর হেটমায়ারকে সঙ্গে নিয়ে ৩৪ রানের জুটি গড়েন চেজ। এই সময়টায় বিশেষত হেটমায়ারকেই বিধ্বংসী দেখাচ্ছিল। তবে আরও বিপজ্জনক হওয়ার আগে বুমরাহের বলে সাজঘরের পথ দেখেন তিনি। আবারও ধাক্কা দিলেন ভারতীয় বোলিংয়ের ‘ফিগারহেড’। এবার ফিরলেন চেজ। সাত তাড়াতাড়ি ফিরলেন শেরফেন রাদারফোর্ডও (১৪)। তাঁকে আউট করলেন হার্দিক পাণ্ডিয়া। ওয়েস্ট ইন্ডিজের রান তখন ১৪.১ ওভারে ৪ উইকেটে ১১৯। পালটা আক্রমণ শুরু করেন রভম্যান পাওয়েল এবং জেসন হোল্ডার। এর মধ্যে অবশ্য আবারও ক্যাচ ফেললেন অভিষেক। বেঁচে গেলেন পাওয়েল। দৌড়ে এসে নাগালে থাকা বল ধরতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত আর কোনও উইকেট পড়ল না ওয়েস্ট ইন্ডিজের। পাওয়েল অপরাজিত থাকলেন ১৯ বলে ৩৪ রানে। হোল্ডার ২২ বলে করলেন ৩৭। টিম ইন্ডিয়ার সামনে ১৯৬ রানের বড় লক্ষ্য রাখল ক্যারিবিয়ান দল। ভারতের হয়ে বুমরাহ নেন ৩৬ রানে ২ উইকেট। পাণ্ডিয়া ও বরুণ চক্রবর্তী ১টি করে উইকেট নেন।
বিশ্বকাপে সূর্যোদয় টিম ইন্ডিয়া। সূর্যকুমার যাদবদের সেমিফাইনালে যাওয়া নিয়ে যে কালো মেঘ তৈরি হয়েছিল, তা উড়ে গিয়ে সূর্য উঠল ইডেন গার্ডেন্সের কোনা থেকে। সেই ইডেন, যেখানে দশবছর আগে বিশ্বকাপের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল ভারতের। ওয়েস্ট ইন্ডিজের হাতেই সেদিন লড়াই থেমেছিল বিরাট কোহলি-মহেন্দ্র সিং ধোনিদের। দশ বছর পর ইডেনে ‘শাপমুক্তি’ হল ভারতের। ‘দৈত্যের’ বিরুদ্ধে ডেভিড হয়ে লড়াই করতে নামার আগে হুঙ্কার দিয়েছিলেন ক্যারিবিয়ানদের কোচ ড্যারেন সামি। কিন্তু ‘সুপার’সঞ্জুর ব্যাটে বিদ্ধ হলেন তাঁরা। যিনি এতদিন ‘বঞ্চিত’ ছিলেন, তিনিই ডু অর ডাই ম্যাচে ৫ উইকেটে জিতিয়ে সেমিফাইনালে তুললেন ভারতকে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে সুপার এইটের একটা হারে পাহাড়প্রমাণ চাপে পড়ে গিয়েছিল টিম ইন্ডিয়া। সেই চাপ কিছুটা কাটে জিম্বাবোয়েকে হারিয়ে। ফলে ইডেনেই ছিল ভারতের অগ্নিপরীক্ষা। ‘কোয়ার্টার’-যুদ্ধে যে দল জিতবে, তারা যাবে সেমিফাইনালে। অন্য দল বিদায় নেবে। সেই যুদ্ধে টসভাগ্য সহায় হয় সূর্যকুমার যাদবের। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে প্রথমে ব্যাট করতে পাঠান ভারত অধিনায়ক। ইডেনের পিচে প্রচুর রান ওঠে। জশপ্রীত বুমরাহ যদিও একদিক থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে চাপে রেখেছিলেন। কিন্তু তাঁকে হতাশ করল ভারতের ফিল্ডিং। বরুণ চক্রবর্তী রান আউটের সুযোগ হাতছাড়া করলেন। রস্টন চেজের সহজ ক্যাচ ফেললেন অভিষেক শর্মা। পরে আরও একটি ক্যাচ মিসে অবদান তাঁর। অন্যদিকে রান বিলোলেন অর্শদীপ সিং, হার্দিক পাণ্ডিয়ারা। শুরুতে শাই হোপ, রস্টন চেজরা যেভাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে বড় রানের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, সেটাই শেষে পূরণ করলেন রভম্যান পাওয়েল, জেসন হোল্ডাররা। বুমরাহর ২ উইকেট সত্ত্বেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংস থামে ১৯৫ রানে। ইডেনের পিচে এই রানটা তাড়া করা হয়তো অসাধ্য নয়। কিন্তু বিশ্বকাপের চাপও তো একটা ব্যাপার। চাপ! কীসের চাপ? সঞ্জু স্যামসন বোধহয় সেই শব্দটা শুনে ইডেনে নামেননি। ডাগআউটে বসে বসে হয়তো মনের মধ্যে একটা প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছিলেন। অগ্নিপরীক্ষায় নিজেকে প্রমাণ করে ‘বঞ্চনা’র জবাব দেব! ক্যারিবিয়ানদের দুর্ভাগ্য ও ভারতের সৌভাগ্য যে এই ম্যাচটায় তিনি সঞ্জু থেকে ‘সুপার’সঞ্জু হয়ে উঠলেন। অন্যদিকে কে আছে, না আছে সেসব নিয়ে আর ভাবেননি। অভিষেক শর্মা ‘মিডাস টাচ’টা হারিয়েছেন। আত্মবিশ্বাস বাড়াতে ‘ধরে’ খেলা শুরু করেও লাভ হল না। ভারতের ২৯ রানের মাথায় আকিল হোসেনের বলে ক্যাচ তুলে ফিরলেন। ঈশান কিষান ও সূর্যকুমার যাদবও রান পেলেন না। তবে সঞ্জুর জন্য প্রয়োজনীয় রান রেট খুব বেশি বাড়তে পারেনি। তিলক নতুন পজিশনে খেললেও ১৫ বলে ২৭ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলে যান। হার্দিক চাপের মুখে ভুল করলেন। একবার জীবনদান পেয়েও ম্যাচ শেষ করে আসতে পারলেন না। আর তাই হয়তো সঞ্জুর জন্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। খুব জোরে মারার চেষ্টা করেন না। কিন্তু ক্লাস-টাইমিংয়ে যে টি-টোয়েন্টি শাসন করা যায়, তা ফের বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন সঞ্জু। কারও স্মৃতিতে ফিরতেই পারে ‘চেজমাস্টার’ বিরাট কোহলির কথা। তাছাড়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতীয়দের মধ্যে কোহলিকে টপকে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডও ভাঙলেন সঞ্জু। করে গেলেন ৯৭ রান। সেঞ্চুরি হয়নি, কিন্তু কিছু ইনিংস সেঞ্চুরির থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাচের পর গোটা ইডেন ‘স্ট্যান্ডিং ওভেশন’ জানাল। এরপরের লড়াই ওয়াংখেড়েতে। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে মাঠে নামবে টিম ইন্ডিয়া। ভুলভ্রান্তি আছে। ফিল্ডিং নিয়ে ভাবতে হবে গৌতম গম্ভীরকে। সঞ্জুর লড়াকু মানসিকতাই হয়তো ফের শিরোপা এনে দেবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।




