মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়। বঙ্গ সিপিএমের যুবনেত্রী। কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যা। বাংলার প্রতিনিধিরা মাদুরাইয়ে সিপিএমের পার্টি কংগ্রেসে। প্রথম দিনেই চমক। বঙ্গ সিপিএমের যুবনেত্রী মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায়। পার্টি কংগ্রেস পরিচালনায় সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য মিনাক্ষী। আহ্বায়ক বিদায়ী পলিটব্যুরোর সদস্য তথা ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার। সিপিএমে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নন। অথচ পরিচালনার দায়িত্বে। অর্থ সামগ্রিক ভাবে প্রতিনিধিদের বার্তা। নেতৃত্বে মিনাক্ষী। মিনাক্ষীর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হওয়া প্রায় পাকা। সভাপতিমণ্ডলীতে অন্তর্ভুক্ত। মিনাক্ষীকে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য করা হবে। মহম্মদ সেলিম-সহ বঙ্গ সিপিএমের একটা বড় অংশ মিনাক্ষীকে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য করতে চান। বুধে শুরু সিপিএমের পার্টি কংগ্রেস। মাদুরাই শহর মিনাক্ষী মন্দিরের জন্য বিখ্যাত। মঙ্গলে বঙ্গ সিপিএমের প্রতিনিধিরা সম্মেলনে পৌঁছনোর পর তামিলনাড়ুর এক নেতা বাংলার এক নেতাকে বলেছিলেন, ‘‘আমাদের মাদুরাইকে লোকে চেনে মিনাক্ষী মন্দিরের শহর হিসাবে। আপনাদের রাজ্যের পার্টিও এখন মিনাক্ষীময়।’’ মিনাক্ষী মন্দিরের কারণেই মাদুরাই শহর নিরামিষাশী। সিপিএমের সম্মেলনে মাছ-মাংস সবই চলবে। সিপিএম পলিটব্যুরোর সমন্বয়ক প্রকাশ কারাটের রাজনৈতিক খসড়া প্রতিবেদন এবং পর্যালোচনা রিপোর্ট পেশ। দলীয় দলে তরুণ এবং মহিলাদেরদের অন্তর্ভুক্তির হার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ কারাটের। সিপিএম সূত্রে আবার কারাট বলেওছেন, দলে এখনই তরুণদের অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি করতে না-পারলে দল ক্রমশ বৃদ্ধাশ্রমে পরিণত হবে। সিপিএমের সাংগঠনিক জোর থাকা রাজ্যে তরুণ এবং মহিলাদের হার উদ্বেগজনক। পার্টি সদস্যপদে তরুণদের বৃদ্ধি করতে দলের ছাত্র, যুব এবং ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনের ভূমিকা থাকা উচিত।

তামিল সংস্কৃতিতে সজ্জিত সম্মেলনস্থল। প্রেক্ষাগৃহের প্রবেশ দরজার নামকরণ বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নামে। সম্মেলনস্থলেই রয়েছে কার্ল মার্ক্সের পূর্ণাবয়ব মূর্তি। পায়ের উপর পা তোলা মার্ক্সের মূর্তি বসানো একটি কাঠের চেয়ারে। হাতে মোড়ানো কমিউনিস্ট ইস্তাহার। মার্ক্সের সঙ্গে দেদার নিজস্বী তুলছেন প্রতিনিধিরা। দলীয় পতাকা উত্তোলন করে পার্টি কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন প্রবীণ নেতা বিমান বসু। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন সিপিআই সাধারণ সম্পাদক ডি রাজা, সিপিআইএমএল লিবারেশনের দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, আরএসপির মনোজ ভট্টাচার্য এবং ফরওয়ার্ড ব্লকের দেবরাজন। প্রত্যেকেই বাম ঐক্যের কথা উদ্ধৃত করেছেন। সিপিএম পলিটব্যুরোর সমন্বয়ক কারাট বলেন, ‘‘বাম ঐক্য এখন সময়ের দাবি।’’ বৃহস্পতি থেকে প্রতিনিধিদের আলোচনায় বাংলা থেকে বলবেন পলাশ দাস, জাহানারা খান, সৈয়দ হোসেন, দেবাশিস চক্রবর্তী, মোনালিসা সিংহ, সমন পাঠক, দেবু রায়রা।

পার্টি কংগ্রেসের প্রথম দিনেই বাংলাকেই প্রধান গুরুত্ব দিলেন সিপিএমের শীর্ষ নেতৃত্বের পাশাপাশি শরিক নেতারা। বাংলায় সিপিএম জাঁকিয়ে বসছে। দেশজুড়ে প্রধান শত্রু হিসাবে সংঘ পরিবার ও বিজেপিকে চিহ্নিতকরণ। চরম সংগ্রামের রাস্তায় নামার অঙ্গীকার করে পার্টি কংগ্রেসের প্রথমদিনই কারাটের পাশে দাঁড়িয়ে সওয়াল চার শরিক সিপিআই, আরএসপি, ফরওয়ার্ড ব্লক ও সিপিআইএল লিবারেশনের। এই বছরেই সংঘ পরিবারের পাশাপাশি সিপিআইয়েরও ১০০ বছর। শতবর্ষের প্রথমে এই দুই সংগঠনের বর্তমান অবস্থান ভেবে দেখা প্রয়োজন বলে পরামর্শ শরিকদের। বিজেপি ও সংঘ পরিবারকে আক্রমণের পাশাপাশি বাংলার ক্ষেত্রে তৃণমূলকে নিয়ে জোর সরব শরিক নেতারা। জনসমর্থন কেন ফিরছে না? অনুসন্ধানের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ। প্রকাশ কারাট ও শরিকরা নেতাদের দাবি তৃণমূলের বিরুদ্ধে বঙ্গ সিপিএম নেতৃত্বকে আরও সরব হতে হবে। রাজনৈতিক সমীকরণের বার্তা বহন করছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

মাদুরাই থেকে পার্টি কংগ্রসের সম্মেলন স্থল তাম্মুকমের সব রাস্তাই লাল পতায়কায় মোড়া। একের পর এক লাল মিছিলের ঢেউ। তাম্মুকম ময়দান লালে লাল। দেশের অন্যতম প্রাচীন হিন্দুধর্মের শহর এই তাম্মুকম। কয়েক হাজার বছর কেটে গেলেও এই শহরে মাথা তুলতে পারেনি সংঘ পরিবার বা বিজেপি। মীনাক্ষী মন্দির ট্রাস্টের সদস্য বি এস গণেশন জানান, দ্রাবিড়িয়ান ব্রাক্ষণদের অস্মিতার কাছে বারবার পরাজয় স্বীকার করেছে উত্তর ভারতের হিন্দু ধ্বজাধারীরা। আজও এখানে লাল ঝান্ডার দাপট অব্যাহত। বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের ধর্ম ও বিভাজনের রাজনীতির মোকাবিলায় পাল্টা ধর্মের রাজনীতির প্রয়োজন নেই। বারবার প্রমাণ করেছে মাদুরাই। নিজেদের নীতি ও আদর্শের ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে মানুষকে বোঝাতে হবে। লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য় জানান, বামপন্থী আন্দোলনের ১০০ বছরের ইতিহাস খতিয়ে দেখতে হবে। কেন বামেরা দেশজুড়েই কোণঠাসা আর সংঘ পরিবার মহীরুহে পরিণত হল। নিজেদের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে কাছাকাছি আসছে বামপন্থীরা। এই ঐক্যকে বজায় রেখেই ধর্মীয় রাজনীতির বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।সম্মেলনের শুরুতেই সংঘ পরিবার ও বিজেপি ও তৃণমূলই প্রধান শত্রু, বলেন প্রকাশ কারাট। সরকারের অর্থনীতির সংঘের বেঁধে দেওয়া বিধান। ধর্মের নামে বিভাজনের রাজনীতি দেশকে পিছিয়ে দিচ্ছে। দেশের গরিব মানুষের বিপদ বাড়ছে বলে মনে করেন কারাট। বাম ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলিকে একজোট হয়ে রাস্তায় নেমে এর বিরোধিতা করতে হবে বলে জানান। সিপিআই সাধারণ সম্পাদক ডি রাজা ও ফরওয়ার্ড ব্লকের শীর্ষ নেতা দেবরাজনের বক্তব্যেও সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে একত্র করে রাস্তায় নামার পক্ষে সওয়াল। রাজনৈতিক শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করলেন তৃণমূলকেও। বঙ্গ কমরেডকুলের নেতারা বিজেপি ও তৃণমূলকে এক আসনে বসিয়েই ধর্মের রাজনীতির অভিযোগ করেন। বিমান বসু পতাকা উত্তোলনে সম্মেলনের সূচনা।