মনোজ তিওয়ারী। হাওড়া শিবপুরের বিধায়ক। মুখ্যমন্ত্রীর অধীনে ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দফতরের প্রতিমন্ত্রী। দলীয় নির্দেশ অমান্য করেছেন বলে তৃণমূল সূত্রের খবর। বিধানসভার অধিবেশনে অনুপস্থিত মন্ত্রী মনোজ তিওয়ারি। তলব করা হতে পারে মনোজকে। আরও বেশ কয়েক বিধায়কদের তলব। প্রস্তুতি তৃণমূলের শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির। সদ্যসমাপ্ত বাজেট অধিবেশনের শেষ দু’দিন দলীয় হুইপ অমান্য করে কয়েকজন বিধায়ক অনুপস্থিত। দলের শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির কাছে সশরীরে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ আসতে চলেছে শীঘ্রই মনোজদের কাছে। প্রথম থেকেই হাওড়ার প্রবীণ তৃণমূল নেতা অরূপ রায় এবং হাওড়ার পুর-প্রশাসক সুজয় চক্রবর্তীর সঙ্গে বিবাদ মনোজের। হাওড়ার সাংসদ প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেও পরে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন মনোজ। ক্রিকেট থেকেও অবসর মনোজের। কইসঙ্গে নিজের দফতরে ও বিধানসভায় যাওয়াও কার্যত বন্ধ করে দেন শিবপুরের বিধায়ক, সূত্রের খবর। শেষ কবে তাঁকে বিধানসভায় দেখা গিয়েছিল, মনে করতে পারছেন না সতীর্থ বিধায়করা! মাসের পর মাস বিধানসভায় গরহাজির! নিজেও কর্তৃপক্ষকে কিছু জানাননি! রাজ্যের একজন প্রতিমন্ত্রী। ক্রীড়া ও যুবকল্যাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দফতরের দায়িত্ব তাঁকে দিয়েছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বনদ্যোপাধ্যায়। ঝাঁ-চকচকে দফতরেও খুব একটা যান না, তাহলে কি তিনি আর মন্ত্রিত্বে থাকতে চাইছেন না? নাকি কোনও কারণে রাজনীতিই ছেড়ে দিতে চাইছেন? বাজেট অধিবেশন, এমনকী গত শীতকালীন অধিবেশনেও নাকি বিধানসভামুখো হননি মনোজ! সূত্রের দাবি, মনোজের এই আচরণে নাকি বেজায় ক্ষুব্ধ শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির সদস্যদের একাংশ।
২০১৬ সালে হাওড়া উত্তর কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের টিকিটে ভোটে জিতে বিধায়ক হয়েছিলেন আর এক প্রাক্তন ক্রিকেটার লক্ষ্মীরতন শুক্লা। সেবার ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দফতরের প্রতিমন্ত্রী করেছিলেন মমতা। রাজনীতির লোক না হওয়া সত্ত্বেও লক্ষ্মীরতন বিধানসভায় হাজির থাকতেন। নিজের দফতরের কাজেও সক্রিয় থাকতেন।একুশের নির্বাচনে লক্ষ্মীরতন আর ভোটে দাঁড়াতে চাননি। ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক মনোজকে শিবপুর কেন্দ্র থেকে ভোটের লড়ার জন্য রাজি করায়। সমানতালে ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়ার শর্তে সেই প্রস্তাবে রাজি হন মনোজ। শিবপুরে জয়ী হওয়ার পর মমতা এবার লক্ষ্মীরতনের উত্তরসূরি হিসাবে ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দফতরের প্রতিমন্ত্রী করেন। প্রথম থেকেই হাওড়ার প্রবীণ তৃণমূল নেতা অরূপ রায় এবং হাওড়ার পুর-প্রশাসক সুজয় চক্রবর্তীর সঙ্গে বিবাদ। মনোজের হাওড়ার শিবপুরের অফিসের কয়েকজন কর্মীদের বিরুদ্ধেও দলীয় ও সাধারন মানুষের অভিযোগ শোনা যায়। এর আগে পিয়ুশ নামক মনোজ-ঘনিষ্টের নামে ব্যাবসায়ীদের কাছ থেকে তোলাবজির অভিযোগ শোনা গিয়েছে। আইন পর্যন্তও গড়িয়েছিল বিষয়টি বলে জানা যায়। এমনকি, এলাকার মানুষ বিধায়কের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে, এই পিয়ুশ নামের মনোজ-ঘনিষ্ট ব্যাক্তি নিজের পরিচয় দেন ‘তিনিই’ নাকি মনোজ, বলে বিস্তর অভিযোগ। মনোজ কত্তৃক জনগনের সামনে এমনকি রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের চোখের সামনে হাওড়ার পুর-প্রশাসক সুজয় চক্রবর্তীকে ঘাড় ধাক্কা ও প্রহারের ঘটনা ছবি টিভির পর্দায় পরিস্কার। মনোজের হাওড়ার বিধায়ক হওয়ার সামসাময়িক প্রশাসনিক কাজকর্ম সামলানো আইনজীবী চন্দনকান্তি চক্রবর্ত্তীর সঙ্গেও সম্পর্কের অবনতি। হাওড়ার তৃণমূল নেতৃত্ব মেনে নিতে পারছেন না মনোজ তিওয়ারীকে, খোদ তৃণমূলের অন্দমহলের খবর। কান পাতলে শোনা যায় শিবপুরের সিংহভাগ মানুষ চাইছেন না মনোজকে। বিধায়কের হাওড়া বালিটিকুরীর অফিসে মনোজ ঘনিষ্ঠ পিযুশ নামের ব্যাক্তির বিরুদ্ধে সাধারন মানুষের অসংখ্য অভিযোগ। প্রমোটারী-জমি দালালি সংক্রান্ত বিষয়ে সমাজবিরোধী বিবাদে জড়িয়ে থাকা অভিযুক্তরাও মনোজ ঘনিষ্ঠ বেশ কয়েকজনে বলে বিস্তর অভিযোগ। মনোজের বক্তব্য জানার জন্য বারবার তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও, মনোজের পক্ষ থেকে কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি।
১৯-২০ এপ্রিল বিধানসভার অধিবেশনে তৃণমূল বিধায়কদের উপস্থিতি ‘বাধ্যতামূলক’ করতে তিন লাইনের লিখিত হুইপ জারি করেছিলেন বিধানসভায় শাসকদলের মুখ্যসচেতক নির্মল ঘোষ। ১৯ তারিখ দলনেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অধিবেশনে যোগদানের কারণে বেশির ভাগ বিধায়কই অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। জনা দশেক বিধায়ক গরহাজির ছিলেন। তৃণমূল পরিষদীয় দল সূত্রের খবর, অধিবেশনের শেষ দিন অনুপস্থিতির সংখ্যা বেড়ে ৩০-এর বেশী হয়ে দাঁড়ায়। বিধানসভার অধিবেশনে অনুপস্থিত মন্ত্রী মনোজ তিওয়ারি থেকে শুরু করে ৩০ জনের বেশি বিধায়কদের লক্ষ্য করেই সিদ্ধান্ত কড়া পদক্ষেপের। শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির সামনে সশরীরে হাজিরা। তৃণমূল কংগ্রেসের পরিষদীয় দলের মুখ্যসচেতক নির্মল ঘোষ এবং পরিষদীয় মন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেসের পরিষদীয় দলের শৃঙ্খলারক্ষা কমিটি অনুপস্থিত বিধায়কদের তালিকা তৈরি করে তাঁদের সশরীরে হাজিরা দিতে নির্দেশ দেবেন। একটি পাঠানো হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে। দ্বিতীয়টি গিয়েছে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। তৃতীয়টি রয়েছে শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির কাছে। মনোজকে তলব করা হবে বলে সূত্রের খবর।
দলীয় হুইপ অমান্য। বিষয়টি নিয়ে বৈঠকে বসেন তৃণমূল পরিষদীয় দলের মুখ্যসচেতক নির্মল এবং পরিষদীয় মন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। বৈঠকে তৃণমূল পরিষদীয় দলের শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির অনুপস্থিত বিধায়কদের তালিকা তৈরি। কমিটির সামনে সশরীরে হাজিরার নির্দেশ। অনুপস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে গরহাজির বিধায়কদের। অনুপস্থিত বিধায়করা আবার কয়েকজন স্পিকারের কাছে আগে থেকে ছুটির আবেদন করেছিলেন। ৩০ জনের বেশি তৃণমূল বিধায়কের মধ্যে একমাত্র মন্ত্রী মনোজকে ডেকে পাঠানো হলেও তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন কেবল মুখ্যমন্ত্রী। কারণ, মনোজ মুখ্যমন্ত্রীর অধীনে ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দফতরের প্রতিমন্ত্রী। অনুপস্থিত মন্ত্রী-বিধায়কদের তলব শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির? কমিটির পাঁচ সদস্য ইদ উৎসবে ব্যস্ত। শোভনদেব ও নির্মল ছাড়াও শৃঙ্খলারক্ষা কমিটিতে তিন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস এবং চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। ২০২৬ বিধানসভা ভোট। প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে রেড রোডে ইদের নমাজে অংশ নেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সোম সকালের চিত্র। সোম সন্ধ্যায় অন্য চিত্র দক্ষিণ কলকাতার চেতলায়। রাজ্যের মন্ত্রী তথা কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম ববি দার বাড়িতে ইদের অনুষ্ঠানে হাজির অভিষেক। তৃণমূলের অন্দরের আলোচনা দলের উপরতলার সমীকরণ বদলের ‘বার্তা’।

ববি-অভিষেকের পারস্পরিক সম্পর্ক মধুর। অভিষেকের ক্যামাক স্ট্রিটের দফতর থেকে ববির আপ্তসহায়কের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের হওয়া ব্যক্তি অভিষেকের নাম করে ‘তোলাবাজি’ করছেন বলে অভিযোগ ছিল। অভিষেক-অনুগামীরা প্রকাশ্যে সরব হন। ববি অভিষেক সংঘাত প্রকাশ্যেও এসেছিল পরে। আসরে নামতে হয় স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ফের পরে অভিষেকের সঙ্গে ববির সম্পর্ক তৃণমূলের অন্দরে সর্বজনবিদিত। ববি মমতার অত্যন্ত আস্থাভাজন। রাজ্যের দাপুটে মন্ত্রী, তৃণমূলের সবচেয়ে পরিচিত সংখ্যালঘু মুখ মহা ধুমধামে দুর্গাপুজোও করেন। ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি তৃণমূলের প্রয়োজনীয় অস্ত্র। ববি-অভিষেকের সৌহার্দের ছবি দলের প্রয়োজনেই। চেতলার বাড়ির দাওয়ায় বিশাল দাওয়াতে তৃণমূলের ‘সেনাপতি’ অভিষেকের আগমন আবার নতুন করে! ছিলেন তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী, মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন, ব্যারাকপুরের সাংসদ পার্থ ভৌমিকরা। ১৫ মার্চ ভার্চুয়াল মাধ্যমে দলের প্রায় ৪,৫০০ নেতাকে নিয়ে বৈঠক করেন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক। বৈঠকের আনুষ্ঠানিক সূচনা এবং সমাপ্তি ঘোষণা করেছিলেন রাজ্য সভাপতি বক্সী। দলের অন্দরে ঐক্য অগ্রাধিকারের তালিকায় ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় মাইলফলক বিধানসভা ভোট। শাসকদলের উপরতলার দূরত্ব কাটছে?