রাজকুমার মণ্ডল : টিম ইডেন পরিচর্চা। নিজের টিমের জন্য হাজার হাজার টাকার টিকিট কিনে, দলের সকলকে দেন। আইপিএলএ অনেক দামী টিকিট, সম্ভব হয় না। তাও চেষ্টা করেন ওঁদের পাশে থাকার। মাঠ পরিচর্চায় যাঁরা তাঁর সঙ্গে সবসময়ের সঙ্গী। আর তিনি? সারাক্ষণ এই দলের সকলকে নিয়ে ২৪ ঘন্টা কড়া নজরে রাখেন গোটা মাঠ! মানুষটার নাম সুজন মুখার্জি। মধ্য ষাট টপকে এগিয়ে চলেছেন দীর্ঘকায় পেটানো শরীরের মানুষটি। মুখে কাঁচাপাকা সাজানো দাড়িগোঁফ। কলকাতার ৪২-৪৩° সেন্ট্রিগেড তাপমাত্রা, আবার কনকনে ঠান্ডা কিংবা অঝোর বৃষ্টি বাদল। কুছ পরোয়া নেই। ঠা ঠা রোদ্দুরেও মাথায় সাদা পানামা ক্যাপ। চোখে রোদ চশমা সেঁটে সকলের সঙ্গে ইডেনে এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত টহল দেন। পাছে মারাত্মক গরমে সবুজ ঘাস মরে যায়। ইডেনের সবুজ মখমলের শোভা উধাও হয়ে যাবে যে! তাই ঘুরে ঘুরে দেখতে হয়, জল সব জায়গায় পড়ছে কিনা। আর ২২ গজের উইকেট? এই গরমে গলে ঝুরঝুরে শুকনো হয়ে যাবে? কড়া নজর সেদিকেও। এমনিতেই বিগ-বি মার্কা চেহারা। ভারী গলার স্বর। ব্যারিটোন ভয়েস বলাই চলে। জমাট আত্মবিশ্বাস নিয়ে ইডেনের উইকেট তৈরী করেন অনায়াসে। টি-টোয়েন্টি ম্যাচ হোক বা টেস্ট-ওয়ান ডে। ইডেনকে ম্যাজিকের মতো প্রস্তুত করে দেন। কি আইপিএল বা আন্তর্জার্তিক ম্যাচ। ঘরোয়া ক্রিকেট বা রনজি। সবই সমান সুজনের চোখে।

বাংলার হয়ে দাপটের সঙ্গে ক্রিকেট খেলেছেন। সংস্থার সচিব হয়ে প্রশাসনিক দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন। একটানা কয়েক বছর ধরে ইডেনের কিউরেটরের কাজ সামলাচ্ছেন বেশ সাফল্যের সঙ্গে। ইডেনের সুনাম বাড়িয়ে তিন তিনবার আইপিএল সেরা মাঠের স্বীকৃতি পেয়েছে সুজন টিম ওয়ার্ক এন্ড কোং। ভদ্র মার্জিত তুখোড় আত্মবিশ্বাসী এক চরিত্র। সুজনও জানেন একদিন সকলকে থামতে হয়। তিনিও থামবেন। তবে এখন তো নয়ই? হৃদযন্ত্রের জটিল সমস্যা সামলে সুজন আবার মাঠেই ফিরে এসেছেন মনের জোরে। তিনমাস অন্তর নিয়মিত ডাক্তারের কাছে যান। নিয়মিত ওষুধ খান। ব্যাগে ৫-৬ টা করে গেঞ্জি রাখেন। ঘাম শরীরে বসতে দেন না। বদলে নেন বারবার। প্রত্যহ ভোর হলেই গাড়িতে চেপে ইডেন, তারপর সল্টলেক, আবার কল্যাণী। সব মাঠ ও উইকেটের তদারকি সারেন। এতে কী পান? ঠোঁটের কোনে স্নিগ্ধ হাসির জবাব ” বলে বোঝাতে পারবো না। সবুজ ঘাসের টান, একটা অদ্ভুত গন্ধ। ক্রিকেট ব্যাট-বলের আওয়াজ সব ক্লান্তি-মান-অভিমান-দুঃখ ভুলিয়ে দেয়। এইসব মালিদের মধ্যে থেকে আজ ওরাও আমার পরিবার। তাইতো ওদের বায়না শুনে, টিকিট কিনে ওদের সন্তানদের দিয়ে থাকি।”

আইপিএল হোক বা বেঙ্গল প্রো-টি টোয়েন্টি। কোনওটাই আলাদা করে দেখেন না। একের পর এক ম্যাচ সামলে নেন অবলীলাক্রমে। বারংবার পুরস্কৃত হয়েছেন বোর্ডের তরফে। সেরা মাঠ ইডেন। কথাটা শুনলেই চলে আসে সুজন মুখার্জ্জীর নাম। পিচ নিয়ে বিতর্ক? সেটাও সামলে দিয়েছেন স্ট্রেইট ব্যাটে। বলিষ্ঠ পরিশ্রমের উদাহরণ হিসাবেই নিজেকে গড়ে তুলেছেন, ইডেনের প্রিয় সুজন। ইডেনের উইকেট থেকে প্রতিটি ঘাস হাতের তালুর মতো চেনেন। ইডেনে খেলতে সকলেই পছন্দ করেন। উইকেটে বাউন্স থাকে। বল ভালো ব্যাটে আসে। বছরের পর বছর এই মাঠ সেরা। ক্রিকেটের মূল বিষয় ব্যাটিং, জোরে বোলিং ও স্পিন বোলিং। তিন ধরনের বিভাগ ইডেনের উইকেটে সমানভাবে সাহায্য আদায় করে। ক্রিকেটমহলে ইডেনের সুনাম রয়েছে ভালো উইকেটের জন্য। স্পিনারদের জন্য শুধুমাত্র উইকেট বানানো হয় তাহলে তা ইডেনের পক্ষে ভালো বিজ্ঞাপন হবে না। সব বিভাগে ভারসাম্য বজায় রেখেই ভালো উইকেটই ইডেনে তৈরী হয়ে আসছে। ২০২৩ সালেও ইডেনের পিচ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। কেকেআরের অধিনায়ক নীতীশ রানা। স্পিন-সহায়ক পিচ চেয়েছিলেন। সুজন মুখার্জ্জী সেই দাবি মানতে চাননি। ইডেনের পিচ পেস সহায়কই রেখেছিলেন। ব্যাটারেরাও সাহায্য পেয়েছিলেন। একাধিক বার ২০০-র উপরে রান উঠেছিল। এ বারের পিচেও রান হবে বলে দাবি সুজনের। ২০২৩ সালে ইডেনের পিচ নিয়ে কেকেআর অখুশি হলেও, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের তরফে আইপিএলে সেরা মাঠের পুরস্কার পেয়েছিল ইডেন।

প্রাক্তন ক্রিকেটার প্রশাসক সৌরভ ও অভিষেকের নাম উল্লেখ করতে ভোলেন না। সিএবি সভাপতি স্নেহাশিসের কথা বলেন। “আমার বসার জন্য ইডেনে একটা আলাদা ঘর দিয়েছে। এসি ঘর। টিভি আছে। ওখানেই খেলা দেখতে বিশ্রাম নিতে পারি।” মায়াবী ইডেনে তাই সুজনই বাংলার একমাত্র প্রতিনিধি সত্যিই তিনি “সু-জন দাদা”।

পিচ বিতর্কে ধুন্ধুমার কাণ্ড আইপিএলে। নাইট রাইডার্স নাকি ইডেনে পিচের সাহায্য পাচ্ছে না। নাইট অধিনায়ক রাহানে এরকম কোনও কথা বলেননি। সিএসকে’র কোচ স্টিফেন ফ্লেমিংও বলেছেন, চিপকে হোম অ্যাডভান্টেজ পাচ্ছেন না। বোর্ডের নির্দেশিকায় ‘হোম অ্যাডভান্টেজে’র কথা আছে? আইপিএলের ক্ষেত্রে বোর্ডের নির্দেশিকা, আয়োজক কেন্দ্রের প্রধান কিউরেটরের হাতেই পিচ ও মাঠের প্রস্তুতির দায়িত্ব।বিসিসিআইয়ের নির্দেশ অনুসারে করতে হবে। পিচ কেমন হবে, সেটা সম্পূর্ণ ওই কেন্দ্রের কিউরেটরের হাতে। প্লে অফের ম্যাচের ক্ষেত্রে নিয়ম পিচ ও মাঠ প্রস্তুত করার দায়িত্ব বিসিসিআইয়ের প্রধান কিউরেটরের। আয়োজক কেন্দ্রের কিউরেটরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কাজ করবেন। প্র্যাকটিস ও ম্যাচের পিচ তৈরির সমস্ত সিদ্ধান্ত একমাত্র বিসিসিআইয়ের প্রধান কিউরেটরের। ফ্র্যাঞ্চাইজি বা প্লেয়াররা পিচ কেমন হবে তা নিয়ে কোনও কথা বলতে পারবেন না। যদি কোনও পরামর্শ দিতেই হয়, তা দেবেন একমাত্র বিসিসিআইয়ের প্রধান কিউরেটর। যদি কোনও সমস্যা হয়, তাতেও একমাত্র তিনিই হস্তক্ষেপ করতে পারবেন। পিচ কেমন হবে, স্পষ্ট নির্দেশিকা, পিচে যেন ভালো গতি থাকে এবং বাউন্সে যেন ধারাবাহিকতা থাকে। পিচে যেন অল্প হলেও সুইং থাকে। অতিরিক্ত স্পিন না থাকে, একই পরিস্থিতি যেন ম্যাচের দুটো ইনিংসেই থাকে। কেকেআরের ইডেনে পরবর্তী ম্যাচ ৩ এপ্রিল। পেস-নির্ভর সানরাইজার্স হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে। প্যাট কামিন্স, মহম্মদ শামি, হর্ষল প্যাটেল, সিমরজিৎ সিং বিপক্ষ দলে। স্পিনার অ্যাডাম জাম্পা, অভিষেক শর্মা। কেকেআরের স্পিন আক্রমণ বৈচিত্র্যপূর্ণ সুনীল নারিন, বরুণ চক্রবর্তী ও মঈন আলি। প্রতিপক্ষে ভালো পেসাররা আছেন। উইকেটে জল কম দিয়ে বা রোল কম করালেই স্পিনারদের খেলতে সুবিধা হবে। বিতর্ক নয়। কেকেআরের ম্যানেজমেন্ট ও কিউরেটরের ভাববিনিময়ের পরিবেশই প্রত্যাশিত।