জলসা নাকি সংবর্ধনা?
বৃহস্পতি দূপুর। আচমকা নেতাজী ইন্ডোর স্টেডিয়ামে কেউ ঢুকলে মনে হতেই পারে জলসার আসর বসেছে। তখনও ঊষা উত্থুপের কন্ঠে ম্যাস-আপ র্যাপিড গান চলছে ‘ডার্লিং ডার্লিং’, ‘র্রাম্বা হো হো’ ‘দম মারো দম’ কিংবা ‘কোই ইঁয়াহা আহা নাচে নাচে’র তালে তালে নাচছেন খেলাধুলোর জগতের ছেলে মেয়েরা। প্রত্যেকেই বেঙ্গল অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া টি-শার্ট পরিহিত। কেউ সদ্য সদ্য পা রেখেছে খেলার জগতে অথবা কেউ জেলা বা রাজ্য স্তরের কোনও খেলাই খেলেনি। রাজ্যের বিভিন্ন ক্রীড়া সংস্থা থেকে আসা ছেলেমেয়েরা নাচের অনুষ্ঠানে। একটু খোঁজ নিয়ে জানা গেল হাওড়া ইউনিয়নের সাইক্লিং গ্রুপ থেকে নাকি এসেছে। জোরাজুরি করতেই বেচারারা বলেই ফেলল অমুক বস্তি থেকে এসেছে দল বেঁধে। গান নাচের অনুষ্ঠানের সময় ছিল গ্যালারি ঠাসা ভিড়। গ্যালারি ও মঞ্চের সামনে উদ্দাম নাচ খেলোয়াড়দের। আদতে ছিল বেঙ্গল অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের ত্রিধারা অনুষ্ঠান। এক, নবম রাজ্য গেমসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। দুই, বেঙ্গল অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের বর্ষব্যাপি চলা শতবর্ষ উদযাপনের সমাপ্তি অনুষ্ঠান। তিন, জাতীয় গেমসে পদকজয়ীদের সংবর্ধনা জ্ঞাপন অনুষ্ঠান। খেলার অনুষ্ঠানে বিরক্তিকর নাচা-গানা। টলিউডের নৃত্যশিল্পী এনে সস্তা চমকের চেষ্টা। অথচ, অনুষ্ঠানের সূচনা বা সমাপ্তিতে জাতীয় সঙ্গীতের বালাই নেই। ছত্রে ছত্রে বিতর্ক ও অভিযোগের পাহাড় বিওএর ফ্লপ শো-য়।

চুড়ান্ত বিশৃঙ্খলা?
নাচ গানের অনুষ্ঠান শেষ হতেই নেতাজী ইন্ডোর প্রায় ফাঁকা। তখনও মঞ্চে বক্তব্য রাখছেন রাজ্যের অভ্যাগতবৃ্ন্দ। ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস যখন মূল্যবান কথা বলছেন তখন দর্শকাসন অনেক ফাঁকা। অরূপ বিশ্বাস বললেন, ‘জাতীয় গেমসে পদকের নিরিখে ১৮ থেকে আটে এসেছি ভালো কথা। কিন্তু বিওএর ২৪টি ক্রীড়া সংস্থা পদক পায়নি। এমনটা চলতে পারে না। সরকার প্রত্যেকটি খেলার জন্য আলাদা করে অফিসার নিয়োগ করেছে। তাঁরা ২৪ ঘণ্টা সজাগ। তারপরেও কেন পদক আসবে না? এক নম্বর জায়গা দখলে সবাইকে ভালো করতে হবে। বিওএ বৈঠক করে খতিয়ে দেখুক।’ জাতীয় গেমসে পদকজয়ীদের অনেকেই অনুপস্থিত। পদকজয়ীদের অনেকেই খবর পাননি বলেও অভিযোগ। প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে নেতাজী সুভাষ রাজ্য গেমসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। জাতীয় গেমসে পদকজয়ীদের সংবর্ধনা জ্ঞাপন অনুষ্ঠান। চলাকালীন বিওএ’র দেওয়া টি-শার্ট পরিহিতদের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। আগত বেশ কয়েকটি সংস্থার কর্তারা বগলদাবা করে গোটা দশেক টা-শার্ট ও ফুড প্যাকেট নিয়ে বাড়ির পয়ে হাঁটা দেন বলেও অভিযোগ। সংবর্ধনা অনুষ্ঠান দেখার সদিচ্ছাই ছিল না ভিড় করা খেলোয়াড়দের। এরপর খাবারের প্যাকেট নেওয়ার সময় চুড়ান্ত বিশৃঙ্খলা। তুমুল ধাক্কাধাক্কি মারপিট কিছুই বাকি রইল না। কয়েকজন অ্যাথলিট আহত, আবার জনা কয়েকের পড়ে গিয়ে পা ফুলে গেছে বলে সূত্র মারফৎ জানা গেল। সাংবাদিকদের জন্য ন্যূনতম আসনের বন্দোবস্ত ছিল না। পদকজয়ীদের রিসিভ করার কেউ ছিলেন না। খাবারের প্যাকেট থেকে যাতায়াতের খরচ পেলেন না পদকজয়ীরা বলেও বিস্তর অভিযোগ।

ক্রীড়াক্ষেত্রে ‘স্বরূপে’ অনীহা?
বেঙ্গল অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের নবনির্বাচিত কমিটির উপর আস্থাভাজন রাজ্যের অধিকাংশ ক্রীড়া সংস্থার। রাজ্যের এক ক্রীড় সংস্থার কর্তার কথায়, ‘নতুন কমিটিতে চন্দন রায়চৌধুরীর মতো সৎ বেক্তিত্ববান প্রেসিডেন্ট আসায় বেশ খুশির হাওয়া বইছিল। জহর দাস কিংবা নতুন কমিটির অন্যান্য কর্তাদেরও দিকে তাকিয়ে নতুন দিগন্ত খুজছিল রাজ্যের ক্রীড়া সংস্থাগুলো।’ হঠাৎ টলি-দ্বন্দের দাবানল থেকে ঠিকরে আসা আগন্তূককে মেনে নিতে পারছেন না অধিকাংশ ক্রীড়া সংস্থাই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ক্রীড়া সংস্থার কর্তা তীব্র অভিযোগ করে বসলেন, ‘কয়েনের এপিঠ-ওপিঠ। তাহতে আগেরটা কিই বা মন্দ ছিল?’ রাজ্য গেমসের শুরুতেই তুমুল কানাঘুঁষো শুরু। বেঙ্গল অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের এক কর্তারও অভিযোগের তীব্র তীর ও বিষোদ্গার, ‘আগেরটা ছিল অশিক্ষিত, এবারের জন অর্ধশিক্ষিত। নতুন কিছুর সম্ভাবনার আগেই গোলমাল শুরু।’ এক প্রবীণ ক্রীড়া সংগঠক বললেন, স্বরূপদের হাতে বিওএর অন্তর্জলি যাত্রা ত্বরান্বিত হবে। এক প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদ ভিনরাজ্যের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করবেন বলেও জানা গেল। বিওএ এখন খেলাকে পিছনে ফেলে নাচা গানায় ডুবে। স্বরূপদের অপেশাদারিত্বের ছাপ স্পষ্ট? যোগাসনে পদকজয়ীদের ট্র্যাকস্যুট পর্যন্ত এদিন দিতে পারেনি বিওএ বলে অভিযোগ। আমরা-ওরা করতে গিয়ে বাংলার ক্রীড়াক্ষেত্রকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টায় ইগো ও হিংসার বহিপ্রকাশ বিওএর স্বরূপের। এক বর্ষীয়ান কর্তার অভিযোগ, ‘স্বরূপ-এন্ট্রি দিতে গিয়ে নিজেদেরই এতদিনের অর্জন করা সুনাম খোয়াবেন চন্দন রায়চৌধুরীর মতো কর্তারা। সবকটি সংস্থা রাজ্য ও জেলার ক্রীড়া উন্নতির বিষয়ে অনেক আশা নিয়ে এই কর্তাদের নির্বাচিত করেছে। অথচ চন্দনরা খাল কেটে কুমীর আনছেন শুরুতেই!’

শুভসূচনা ও পরিসমাপ্তি একমঞ্চেই?
এগারো দিন আগেই উদ্বোধন নবম নেতাজী সুভাষ রাজ্য গেমসের। প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে শুভসূচনা করেন রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। ৭-১০ এপ্রিল মালদহে অনুষ্ঠিত রাজ্য গেমসের কিছু ইভেন্ট হবে কলকাতা ও দুর্গাপুরে। বৃহস্পতিবার নেতাজী ইন্ডোর স্টেডিয়ামে জাতীয় গেমসে পদকজয়ীদের সংবর্ধনার পাশাপাশি বেঙ্গল অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সারা বছর ধরে চলা শতবর্ষ পালন অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষনা কর হয় ঊষা উত্থুপের সঙ্গীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দপ্তরের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস এবং দমকল মন্ত্রী সুজিত বসু। রাজ্য গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, সুজিত বসু থাকলেও কার্ডে নাম ছিল না ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মনোজ তিওয়ারির! এমনটা কেন হলো? জানেন না খোদ বিওএ সভাপতি চন্দন রায়চৌধুরী। বিওএর প্রাক্তন সভাপতি বাবুন ওরফে স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায় এলেও তাঁকে মঞ্চে ডেকে সৌজন্য দেখানোর প্রয়োজন মনে করলেন না ‘স্বরূপে প্রভাবিত’ বিওএ কর্তারা। বিওএর শতবর্ষের সূচনা হয়েছিল বাবুনের সভাপতি থাকাকলীনই। ক্রীড়াক্ষেত্রে হঠাৎ করে রাজ্য গেমসের মতো ইভেন্টের চেয়ারম্যান গদিলভ্য ‘স্বরূপ’ ধামাকায় বেঙ্গল অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েনের সভাপতি চন্দন রায়চৌধুরী, সচিব জহর দাস, বিশ্বরূপ দের মতো নবনির্বাচিত কর্তারাও ছিলেন অসহায় নীরব দর্শক।

ছবি : দেবব্রত বিশ্বাস