চুপ! কখনও চোওপ! স্তাবকের দল! ওরা কারা? ওই জিজ্ঞাসায় কোন জন? পিছনে হাঁটো। সকলে মিলে পিছে হাঁটা শুরু। দরকার শুধু ইশারা! একটু অঙ্গুলি হেলন। জেল থেকে বহিস্কৃত হয়ে হনুমান মার্কা খাঁটি সরিষার তেল মর্দ্দনে সিদ্ধহস্ত গনতন্ত্রের ধর্ষক? হঠাৎ কেন পিছনে হাঁটা? বিশ্বের অন্যতম শহরে পিছু হাঁটা। ফিটনেস! ভার্টিগোর চিকিৎসা? নাকি মানসিক চাপ কমানো? কে জানে! রাজা তুমি উলঙ্গ কেন? প্রশ্ন করার আজ কেউ নেই! দাসত্বের শৃঙ্খল ছাপিয়ে গনতন্ত্র আজ দুহাত বাঁধা। তাঁবেদারির গনতন্ত্রে পেটোয়া! কলকাতার কেএমডি-এর বিখ্যাত সাপ বেরিয়ে আসা পার্কে হাঁটা নয়। পিছনে হাঁটা নিয়ে জোর চর্চা বাংলা জুড়ে। আলোচনা বিস্তৃত দেশ জুড়ে এমনকি বিদেশেও। চর্চা শুরু সমাজ মাধ্যমেও। শুধুই হাঁটা, হাঁটা আর হাঁটা। কখনও আবার পিছনে হাঁটা। বাংলা সাংবাদিকতার মাস্টার্স ডিগ্রির কোর্সের পরীক্ষার সিলেবাসে ‘পেছন হাঁটা’ নিয়ে প্রশ্ন এলেও এইবার অবাক হওয়ার কিছুই নেই!
বাংলা সাংবাদিকতায় ‘পিছন হাঁটা’ চর্চা চলছেই। পেটোয়া-তোষামুদে-জেলখাটা-নিস্কৃয়-নিকৃষ্টতম গনতন্ত্র পিছনে হাঁটছে। হেসে হেসে হাত নেড়ে পিছনে হেঁটে খুশি করছেন ‘রাজা’কে। বেশ মজার দৃশ্য। সমাজ মাধ্যমে চারিদিকে হৈ চৈ আর হুল্লোড়। এ কেমন রঙ্গ রে বাবা? রে রে রব উঠেছে। এই হাঁটা নিয়ে গনতন্ত্রীর জীবনে কোনোও আফশোষ নেই? পিছে হাঁটা কাহানি জানান দেওয়া তথ্য মিত্র বন্ধু গুগল। পেছনে হাঁটা স্বাস্থ্যের জন্য অনেকটাই উপকারী। যেমনটা মাথার ভারসাম্য বৃদ্ধি, বুদ্ধির বা চেতনার উদয়, পায়ের পেশী মজবুত করা, হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো এবং মানসিক চাপ কমানো ও ভারসাম্য বৃদ্ধি করা। রাজার কোষাগার থেকে প্রজাদের রক্ত জল করা পরিশ্রমের অর্থে তৈলমর্দ্দনকারী গনতন্ত্রী বহন খরচে বেশ উপকারী এই ‘পিছনে হাঁটা’। মানসিক চাপ কমবে। হৃদরোগের ঝুঁকিও কমবে। পিছন হাঁটা মানসীকতায় নিকৃষ্ট চিন্তাভাবনাও উদয়-অস্ত দুই-ই হতে পারে?
বাংলার গনতন্ত্রে কাউকে খুশি করার জন্য পিছন হাঁটার অনেক কসরত করতে হয়েছে, এমন দৃষ্টান্ত বিরল! ইতিহাস ঘাঁটলেও মিলছে না এরকম কোনও উদাহরণ। সামনের অভিমুখে হেঁটে যেতে যেতে হঠাৎ করেই পিছন দিকে হাঁটতে শুরু করেছেন কেউ, এমন বিরল দৃশ্য বাংলায় দেখা যায়নি কোনওদিন। বিদেশ সফরে গিয়ে রাজার আপ্ত সহায়ককে নিয়ে পিছনে হেঁটে ঘুরে বেড়িয়েছেন ‘রাজা’ অথবা বিদেশের সুন্দর মনোরম পার্কে উদ্ভট দৃশ্যও চোখে পড়েনি কারুর। স্মৃতিও এই ছবিকে ঠিক করে সাপ্লাই দিতে পারছে না কোনও প্রজার সুস্থ মস্তিষ্কে। বরং দেখা গেছে সংস্কৃতমনা, নাটক প্রিয়, কবিতা লেখা প্রাক্তন সেই রাজা গট মট করেই লিফটে উঠে পড়তেন কাউকে বিশেষ করে কোনো গনতান্ত্রিক তকমাধারী ব্যক্তিদের একেবারে পাত্তা না দিয়েই। ভগবানকে ছাড়া ভয় না পাওয়া গনতন্ত্রের হাল ও অবস্থা শোচনীয় হয়ে ছিল প্রাক্তন নেই রাজার সোজাসাপ্টা জবাবে।
‘রাজা’ তুমি উলঙ্গ কেন? কথাগুলো বলবে এমন বুকের পাটা কারও বা আছে? দুপুর প্রায় অতিক্রান্ত, সূর্যের আলো শহরে পত্র-পল্লবের ফাঁক দিয়ে কংক্রিট-মাটিতে এসে পড়ছে। কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর উলঙ্গ রাজা কবিতার পঙক্তিগুলো আজও বেশ
সবাই দেখছে যে, রাজা উলঙ্গ, তবুও
সবাই হাততালি দিচ্ছে।
সবাই চেঁচিয়ে বলছে; শাবাশ, শাবাশ!
কারও মনে সংস্কার, কারও ভয়;
কেউ-বা নিজের বুদ্ধি অন্য মানুষের কাছে বন্ধক দিয়েছে;
কেউ-বা পরান্নভোজী, কেউ কৃপাপ্রার্থী, উমেদার, প্রবঞ্চক;
কেউ ভাবছে, রাজবস্ত্র সত্যিই অতীব সূক্ষ্ম, চোখে
পড়ছে না যদিও, তবু আছে, অন্তত থাকাটা কিছু অসম্ভব নয়।
গল্পটা সবাই জানে।
কিন্তু সেই গল্পের ভিতরে শুধুই প্রশস্তিবাক্য-উচ্চারক কিছু
আপাদমস্তক ভিতু, ফন্দিবাজ অথবা নির্বোধ স্তাবক ছিল না।
একটি শিশুও ছিল। সত্যবাদী, সরল, সাহসী একটি শিশু।
নেমেছে গল্পের রাজা বাস্তবের প্রকাশ্য রাস্তায়।
আবার হাততালি উঠছে মুহুর্মুহু; জমে উঠছে স্তাবকবৃন্দের ভিড়।
কিন্তু সেই শিশুটিকে আমি ভিড়ের ভিতরে আজ কোথাও দেখছি না।
শিশুটি কোথায় গেল? কেউ কি কোথাও তাকে কোনো
পাহাড়ের গোপন গুহায় লুকিয়ে রেখেছে?
নাকি সে পাথর-ঘাস-মাটি নিয়ে খেলতে খেলতে ঘুমিয়ে পড়েছে
কোনো দূর নির্জন নদীর ধারে, কিংবা কোনো প্রান্তরের গাছের ছায়ায়?
যাও, তাকে যেমন করেই হোক খুঁজে আনো।
সে এসে একবার এই উলঙ্গ রাজার সামনে নির্ভয়ে দাঁড়াক।
সে এসে একবার এই হাততালির ঊর্ধ্বে গলা তুলে জিজ্ঞাসা করুক:
রাজা, তোর কাপড় কোথায়?
গনতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভের ধারক বাহক। লিখতে বসে কাঁপবেনা হাত! আচ্ছা। রাজা সু-উচ্চশিক্ষিত। যদিও ডক্টরেট ডিগ্রি আজ ‘গরমেন্ট’ রাজার স্কন্ধে ক্ষীনও নয়, হীন। স্পেস সায়ন্সে ডিগ্রিধারী ‘রাজা’র রাকেশ ‘রোশন’ (মহাকাশচারী রাকেশ শর্মা) যখন চাঁদে গিয়েছিলেন কিংবা সুনীতা ‘চাওলা’র(সুনীতা উইলিয়মস) মহাকাশ অভিযান, মনে করিয়ে দেয় বি এড এর ডিগ্রিটাও বেশ আইনমাফিক অনেকটা এলএলবি-র মতোই মাস্টার্স অর্থাৎ এমএ সম্পন্ন করা? ওরা কোন জন? গদগদ চিত্তে মিথ্যা হাসি দিয়ে রাজাকে সন্তুষ্ট করে স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যস্ত। বলতে পারবে না কখনও, রাজা, তোর কাপড় কোথায়? রাজার এক ডাকে আপ্লুত ‘গনতন্ত্র’ বহনকারীরা আজ সেবনকারী সব অন্য গ্রহের জীব হিসেবে সমাজে, সংসারে, মাঠে, ঘাটে, হাটে, বাজারে, সুন্দর বাথরুমে হাসিমুখে বিরাজ করবেন গায়ে দামী সুগন্ধি মেখে। আর ‘রাজা’র অঙ্গুলী হেলনে গনতন্ত্রের সঙ্গীরা হাসিমুখে পিছনে হাঁটা হেঁটে পথ চলা শুরু করেছেন। যে পথ চলার শেষ নেই।
যদিও কবি জীবনানন্দ দাশ ‘হাঁটা পথ’ কবিতায় কিন্তু পিছনে হাঁটার কথা উল্লেখ করেননি একদমই। পিছনে হাঁটা নিয়ে এত কিছু আলোচনা, সমালোচনার ঢেউ সমাজমাধ্যমে। পিছনের দিকে হাঁটার ছবি তোলায় জোর চর্চা চারিদিকে। বিখ্যাত কবি জীবনানন্দ দাশ লিখে গেছেন, একা একাই তিনি হেঁটে চলেছেন অনাড়ম্বর ভাবেই। সেই বেবিলনের পথে। রাতের অন্ধকারে। হাজার হাজার ব্যস্ত বছরের পর। যে হাঁটার বিরাম নেই। যে হাঁটার কোনোও ছবি তোলা নেই। যে হাঁটার সমালোচনা নেই। যে হাঁটার আলোচনা নেই। তাড়াহীন নির্জন পথে একা একাই হাঁটা। নেই কোনও বিড়ম্বনা।
কি এক ইশারা যেন মনে রেখে এক-একা শহরের পথ থেকে পথে
অনেক হেঁটেছি আমি; অনেক দেখেছি আমি ট্রাম-বাস সব ঠিক চলে;
তারপর পথ ছেড়ে শান্ত হ’য়ে চ’লে যায় তাহাদের ঘুমের জগতে:
সারা রাত গ্যাসলাইট আপনার কাজ বুঝে ভালো ক’রে জ্বলে।
কেউ ভুল করেনাকো— ইঁট বাড়ি সাইনবোর্ড জানালা কপাট ছাদ সব
চুপ হ’য়ে ঘুমাবার প্রয়োজন বোধ করে আকাশের তলে।
এক-একা পথ হেঁটে এদের গভীর শান্তি হৃদয়ে করেছি অনুভব;
তখন অনেক রাত— তখন অনেক তারা মনুমেণ্ট মিনারের মাথা
নির্জনে ঘিরেছে এসে; মনে হয় কোনোদিন এর চেয়ে সহজ সম্ভব
আর-কিছু দেখেছি কি: একরাশ তারা-আর-মনুমেণ্ট-ভরা কলকাতা?
চোখ নিচে নেমে যায়— চুরুট নীরবে জ্বলে— বাতাসে অনেক ধুলো খড়;
চোখ বুজে একপাশে স’রে যাই— গাছ থেকে অনেক বাদামী জীর্ণ পাতা
উড়ে গেছে; বেবিলনে এক-একা এমনই হেঁটেছি আমি রাতের ভিতর
কেন যেন; আজো আমি জানিনাকো হাজার-হাজার ব্যস্ত বছরের পর।