টাকলা স্বজন। মাথা প্রায় ফাঁকা। বছর তিপ্পান্ন পেরিয়ে ষাটের দিকে ধাবমান। পানুতে খামতি নেই। কেউ ঠাহর করতে পারলেই আঙুলের খেলা। তর্জ্জনির ঠেলায় স্ক্রিনের অপশন বদল। খাওনদাওন দেখার ভান। স্ক্রিনে চলে আসা এক হাসির রিল। অট্টহাস্যে বোঝানের চেষ্টা এক্কেবারে নির্ভেজাল। অথচ ভেজালে ভর্তি। নীরবই হোক বা সরব, সাম্প্রতিককালে সমাজমাধ্যমের প্রসার বৈপ্লবিক। এক্কেবারে অত্যুক্তিহীন। প্রভাব বিশ্বব্যাপী। ডেটারিপোর্টাল সংস্থার সর্বশেষ গ্লোবাল ওভারভিউ রিপোর্ট ২০২২ বলছে। সারা পৃথিবীতে সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪৬০ কোটি, যেখানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যা আনুমানিক ৮০০ কোটি। পৃথিবীর প্রায় ৫৮% মানুষ নিয়মিত সমাজমাধ্যম ব্যবহার করেন। ২০২৫ এ ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিপুল হারে বেড়েছে। এক দশকেই তিনগুণ বৃদ্ধি। সমাজমাধ্যমের প্রধান মঞ্চ ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, এবং মেসেঞ্জার। জনপ্রিয় পিন্টারেস্ট, টুইটার এবং লিঙ্কড-ইন। ভারতে সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪৬.৭ কোটি, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ভারতে জনসংখ্যার একটা বড় অংশের মধ্যে দারিদ্র ও নিরক্ষরতার কথা ভাবলে ব্কই লাগে। ব্যবহারকারীর সংখ্যার সাম্প্রতিক বৃদ্ধির হার গত এক বছরেই পৃথিবীতে বৃদ্ধির হারের চারগুণের বেশি ভারতে।
সারা বিশ্বে গড়ে সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারীরা দিনে আড়াই ঘণ্টা মতো কাটাচ্ছেন। সারাদিনের অনেকটা সময় এখানে ব্যয় করছেন। করোনাকালের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা সমাজমাধ্যমের ব্যবহার বেশি করে বৃদ্ধি করেছে। প্রিয়জনের সাথে যোগাযোগ রাখতে এর কিছু ভাল দিক নিশ্চয়ই আছে। পরিসরের সমস্যাগুলো নিয়েও মানুষ আগের থেকে বেশি সচেতন। সমাজমাধ্যমেই সমালোচনা। পানশালায় মদ্যপানের কুফল নিয়ে বক্তব্য। সমাজমাধ্যম ভাল না মন্দ। শুধু একটা বিতর্ক। সমাজ, প্রযুক্তি, অর্থনীতি আর রাজনীতির জটিল মিশেল। সমাজমাধ্যমের উত্থান, প্রসার এবং প্রাত্যহিক জীবনের অন্দরমহলে ঢুকে পড়ার প্রক্রিয়া। অবাঞ্ছিত প্রভাবগুলোর নিয়ন্ত্রক হতেও পারে না। ব্যক্তি, গোষ্ঠী আর সমষ্টির মধ্যে আদানপ্রদানের প্রথাগত পথ। সমাজমাধ্যমে নতুন এক যোগাযোগব্যবস্থা এবং মিলনমঞ্চ স্থাপন। আপাত-গণতান্ত্রিক ও অবাধ প্রবেশাধিকারের দিকের ভাল ও মন্দ দুই দিকই।
সমাজমাধ্যমের কোনও প্রামাণ্য সংজ্ঞা না থাকলেও কতগুলো মূল বৈশিষ্ট্য আছে। স্মার্টফোন, কম্পিউটার বা ট্যাবলেটের মতো যন্ত্র ব্যবহার করে এবং আন্তর্জাল ভিত্তির মাধ্যমে বিষয়বস্তুর প্রচার ও আলোচনা। ব্যবহারকারীদের সৃষ্টি করা বিষয়বস্তু। সমাজমাধ্যমের বহমান উপাদান। সমাজমাধ্যমের কাঠামো হল জালিকা বিন্যাস অর্থাৎ নেটওয়ার্ক ভিত্তিক। নিজের বা ছদ্ম পরিচিতির রেখাচিত্র তৈরি করে যোগ। অন্য ব্যবহারকারী ও এই সামাজিক বৃত্তে প্রবেশ। কার সাথে কতটা মেলামেশা বা পরিবেশিত বিষয়বস্তু কার কতটা নাগালের তা খানিক নিয়ন্ত্রণ থাকলেও, প্রযুক্তির কারণে পরিবেশিত যেকোনও বিষয়বস্তুই যে অন্য নানা বৃত্তে ছড়িয়ে পড়তে পারে বা ক্ষেত্রবিশেষে ভাইরাল হয়ে যেতে পারে। ব্যক্তি, গোষ্ঠী আর সমষ্টির মধ্যে যে-আদানপ্রদানের প্রথাগত রাস্তাগুলো, সমাজমাধ্যম এক অর্থে সেগুলোর ওপর দিয়ে নতুন এক যোগাযোগব্যবস্থা এবং মিলনমঞ্চ স্থাপন করেছে। আপাত-গণতান্ত্রিক ও অবাধ প্রবেশাধিকারের দিকের ভাল ও মন্দ দুই দিকই আছে।
ব্যক্তিগত ব্যবহারকারীর দৃষ্টিভঙ্গি। ভোক্তা হিসেবে চয়নের পরিসর অনেকটা বেড়ে যায়। নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ বেড়ে যায়। নিজ পছন্দের ওপর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে নির্ভর ইচ্ছে। কম্পিউটার অ্যালগোরিদম কাজ করে। ব্যাবেলের মিনারের মতো কোলাহল। নির্বাচন বা গুণমান নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া না থাকলে মুড়ি আর মিছরি আলাদা করা মুশকিল। সমাজমাধ্যমে রাজনৈতিক মতামত বা খবর প্রচারিত।‘হোয়াটস্যাপ জ্যাঠা’ বা ‘হোয়াটস্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়’ কথাগুলোর মধ্যে সত্যতা কতটা আর কতটা সম্পূর্ণ মতাদর্শগত পক্ষপাতে দুষ্ট প্রোপাগান্ডা, অনভিজ্ঞ প্রাপকের কাছে পরিষ্কার না হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি। সমস্ত খবর বা বিনোদন বা সাংস্কৃতিক চাহিদা তৃপ্ত হবার একটিই মাত্র উৎস হল কোনও একচেটিয়া সংস্থা। টিভি চালু হবার পর সরকারি সংস্থা ‘দূরদর্শন’ এ চয়নের স্বাধীনতা বা বক্তব্যের নিরপেক্ষতা বা ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের নিশ্চয়তা ছিল। দূরদর্শনে এক সময়ে অনেক ভাল অনুষ্ঠান দেখা যেত। সমাজমাধ্যমে উল্টোদিক। অবাধ প্রবেশাধিকার এবং যে যা খুশি বলছে, লিখছে এবং তার প্রচার হচ্ছে, খারাপ দিকও আছে।
উৎকর্ষ চিরকালই শিক্ষিত সংখ্যালঘু একটা গোষ্ঠীর চর্চার বিষয়। সংস্কৃতি বা জ্ঞানচর্চা, সমাজ-সংস্কৃতি, রাজনীতি-অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হোক বা বিতর্ক, যে-কোনও ক্ষেত্রেই এলিটদের আর আমজনতার চর্চার মধ্যে একটা বড় ফারাক চিরকালই ছিল। সমাজমাধ্যম কি এই ফারাক বাড়িয়ে দিচ্ছে? এই প্রসঙ্গে সুকুমার রায়ের পাগলা দাশু সিরিজের ‘আশ্চর্য কবিতা’ গল্পে স্কুল ইন্সপেক্টরের সামনে সব ছাত্রের চেঁচিয়ে কবিতা পড়া শোনার অত্যাচারের কথা মনে পড়ে যেতে পারে। ‘সমাজ’ থাকলেও কার্যত কি এ এক নতুন নেশা, যা আমাদের আরও অসামাজিক করে তুলছে? সকল লোকের মাঝে বসে, নিজের মুদ্রাদোষ। আসক্তি থেকে বিচ্ছিন্নতাবোধ, মানসিক অবসাদ হওয়া স্বাভাবিক, এবং অবাধ সামাজিক আদানপ্রদানের যে অবাঞ্ছিত ও অন্ধকার দিকগুলো যেমন, ঈর্ষা, মনোমালিন্য, মানসিক হেনস্থা, সেগুলো সারাক্ষণ বৈদ্যুতিন জানলা দিয়ে নিজস্ব জগতে টেনে আনলে নানা মানসিক সমস্যা গুরুতর আকার নিচ্ছে।
প্রযুক্তি অনেক সম্ভাবনার দিগন্ত খুলে সার্বিক সামাজিক প্রভাব বৃদ্ধি করে। প্রযুক্তিগত দিকের ওপর নির্ভর করে না। প্রয়োগ নির্ভর করবে ক্ষমতাসীন শক্তির কেন্দ্র। বাণিজ্যিকই হোক বা রাজনৈতিক। প্রযুক্তি ও তার ব্যবহার আপাতভাবে বিনামূল্যে আয়ত্ত হলেও, বড় বাণিজ্যিক সংস্থাগুলো সমাজমাধ্যমে মানুষের আচরণ এবং পরস্পরের সাথে আদানপ্রদান খুব মনযোগ দিয়ে নিরীক্ষণ করে যাচ্ছে, অ্যাকোয়ারিয়ামে মাছ দেখার মতো করে, এবং তা থেকে প্রাপ্ত তথ্য বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে। উদ্দেশ্য মুনাফা, সমাজকল্যাণ নয়। সম্প্রতি গুগলে কী খুঁজেছে, ফেসবুকের পাতায় কী লিখেছে, এবং ক্রেডিট কার্ড দিয়ে কী কিনছে, এইসব বিশ্লেষণ। সমাজমাধ্যমে ফেসবুক পাতাতে একই বিজ্ঞাপন বারবার আসতে থাকবে।
রাষ্ট্রও কীভাবে এর মাধ্যমে নাগরিকদের উপর নজরদারি করার চমৎকার ও সুলভ উপায় বের করেছে। গুজব বা ভুল খবর খুব ঠান্ডা মাথায় এবং সংগঠিতভাবে ব্যবহার করে রাজনীতির পরিসরে হিংসাত্মক ঘটনাগুলো গণতন্ত্রের পক্ষে আশঙ্কাজনক। কোনও দ্বিমত নেই। সমাজমাধ্যম হোক বা অন্য কোনও প্রযুক্তির ভাল-মন্দ প্রভাব নিয়ে আলোচনা বিজ্ঞানের পরিভাষায় সহগতি বা পারম্পর্য (correlation), তার থেকে কার্যকারণ (causality) অনুমান করার অনেক সমস্যা। সমাজমাধ্যমের প্রসারের সাথে-সাথে কিছু সমস্যা বেড়ে গেছে। দুই প্রবণতাই অন্য কোনও কারণের উপসর্গ হতে পারে। সমাজমাধ্যমের ব্যবহার বেড়েছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের ঢেউ দেশে ও সারা পৃথিবীতে ক্রমাগত আছড়ে পড়েছে। সারা বিশ্বের পরিপ্রেক্ষিতে দেখলে এর মধ্যে রাজনৈতিক পরিসরে দক্ষিণপন্থী জনবাদের উত্থান আর অর্থনীতির পরিসরে আর্থিক অসাম্যের আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি। ২০০৮ সালের অর্থসংকট যার অভিঘাত সারা বিশ্বের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং বিশ্বায়নের ফলে কাঠামোগত বেকারির সমস্যার বৃদ্ধি। ভারতের ক্ষেত্রে ক্রমহ্রাসমান আর্থিক বৃদ্ধির হার, সংগঠিত ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান বেকারির সমস্যা, এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে মৌলবাদের উত্থান এবং নাগরিক পরিসরে গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর ক্রমাগত নানা আঘাত। দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের প্রভাব সমাজের এবং মানুষের মনের ওপর পড়তে বাধ্য, এবং সমাজমাধ্যমের উপস্থিতি। সমাজমাধ্যমে সামাজিক নানা প্রবণতার প্রতিফলন বাস্তবটাকেই বিকৃত করে দিচ্ছে এবং বৃহত্তর সমাজে তার প্রতিফলন ঘটছে।
এই মাধ্যমে বেশি সময় দেওয়া মানুষদের কিছু প্রবণতা আছে, যা এই মাধ্যম না থাকলেও অন্যভাবে প্রকাশ পেত? আসক্তির বা মানসিক অবসাদের প্রবণতা। সমাজমাধ্যমে অনেকটা সময় দিচ্ছেন মানে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা অন্য কিছুতে আসক্ত। সমাজমাধ্যম ও মানসিক অসুখের মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্কটা বিপরীতমুখীও হতে পারে। সমাজমাধ্যমের উপস্থিতি প্রবণতাগুলো বাড়িয়ে উপসর্গের কারণ সেটা নির্ধারণ। উত্তর খুঁজতে হবে তথ্যে ও পরিসংখ্যানে। কিশোরবয়স্কদের সমাজমাধ্যম ব্যবহার এবং তাদের মানসিক সমস্যা নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। সমীক্ষায় সমাজমাধ্যম বেশি বা কম ব্যবহার করার মধ্যে মানসিক সমস্যার ব্যাপ্তি বেশি বা কম। পারিবারিক অশান্তি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা অনুমান করা সোজা নয়। গবেষণায় প্রণালীবদ্ধ সমীক্ষা বা সরকারি রিপোর্ট ব্রিটেনের রয়্যাল সোসাইটি ফর পাবলিক হেল্থ, ২০১৯ বলছে, এই বিষয় নিয়ে সতর্ক থাকার এবং আরও গবেষণা করার প্রয়োজন, মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যে ক্ষতিকারক। আসক্তিমূলক অভ্যাস।
রাজনীতির পরিসরে বিভিন্ন দেশে সমাজমাধ্যমের প্রভাব নিয়ে তথ্যপ্রমাণ ‘অ্যানুয়াল রিভিউ অফ ইকোনোমিক্স’-এ ২০২০ সালে প্রকাশিত জুরাভস্কায়া, পেট্রোভা ও এনিকোলোপভের ‘পলিটিকাল এফেক্টস অফ সোশ্যাল মিডিয়া’ নামক প্রবন্ধটি বিশেষভাবে দ্রষ্টব্য রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক ক্ষমতার অলিন্দ থেকে খবরের প্রচার নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আগের থেকে অনেক কমেছে এবং ক্ষমতাসীন সরকারেরর পক্ষে অস্বস্তিকর খবর এখন চেপে রাখা অনেক কঠিন। গণতান্ত্রিক অধিকারের বিস্তার, গণতন্ত্রের ভিত নড়বড়ে, চরমপন্থী মতামত, ভুল খবর বা গুজব প্রচারেরও সহায়ক সমাজমাধ্যম। প্রথাগত মাধ্যমে বিষয়গুলোতে সাবধানতা বা যত্ন নিলেই ভাবমূর্তি এবং আয়ে টান পড়তে পারে। আন্তর্জালের ‘আমরা সবাই রাজা’ দুনিয়ায় গুজব বা ভুল খবর একটা রসদ। কোনটা সত্যি খবর আর কোনটা সম্পূর্ণ গুজব এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার তা বিচার করার কাজটা সোজা নয়। মানুষের মনস্তত্ত্ব নেতিবাচক কথা যা রাগ, ঘৃণা বা ভয় এই ধরনের আবেগকে উসকে দিয়ে বিস্তার জোট সহজে হয়। সদর্থক চিন্তা বা আবেগের ক্ষেত্রে তা হয় না। তথ্যপ্রমাণ যাচাই করার প্রবণতা মতাদর্শগত পক্ষপাতের কারণে খানিক কম কাজ করে। সমাজমাধ্যমে সমমনস্ক মানুষদের মধ্যেই মেলামেশা ও চর্চা হবার প্রবণতা পক্ষপাতদুষ্ট একটা প্রতিধ্বনিকক্ষে আবদ্ধ।
শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সামিল হওয়ার ক্ষেত্রে সমাজমাধ্যম সদর্থক ভূমিকা। যেমন, মধ্যপ্রাচ্যে এবং উত্তর আফ্রিকায় যে গণতন্ত্রের সমর্থনে আন্দোলনকে ‘আরব বসন্ত’ বলা হয়। গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে দক্ষিণপন্থী জনবাদের উত্থানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বামপন্থী গণআন্দোলনের ইতিহাসে সমাজমাধ্যমের ফলে উত্থান বা প্রসার কেন হচ্ছে না? রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কায়েমি স্বার্থগুলো সম্পদ এবং সংগঠিত হবার ক্ষমতা জোর বেশি। কিছু রাজনৈতিক দলের অনেক সম্পদপুষ্ট আইটি সেল। সমাজমাধ্যমে প্রচার করার সুযোগ ও ক্ষমতা অনেক বেশি। তুলনায় বামপন্থী দলগুলোর পেছনে আর্থিক শক্তি কম। দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষদের সংঘবদ্ধ করা শক্ত, কারণ তারা সংখ্যাগুরু হলেও অনেক ছড়িয়ে আছেন, এবং তাঁদের নিজস্ব দৈনন্দিন জীবনযাপনের সংগ্রাম তাঁদের মনোযোগ অনেকটাই নিয়ে নেয় আর এছাড়া তাঁদের শিক্ষা ও আন্তর্জালে উপস্থিতিও অনেক কম।
পৃথিবীতে ঐতিহাসিক নানা কারণে বামপন্থী বা প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলো দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলোর তুলনায় পিছিয়ে। বামপন্থী গণআন্দোলনের ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তগুলো দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলোর প্রত্যাঘাতে জর্জরিত। সমাজমাধ্যম সমাজেরই দর্পণ। সমাজে যা ভাল বা মন্দ, এতে তাই প্রতিফলিত হয়। সমস্যা হল, এই প্রতিফলন নিরপেক্ষ নয়। প্রযুক্তিগত কারণে কিছু প্রবণতা বেড়ে গিয়ে গুরুতর সমস্যার আকার নিতে পারে,নতুন প্রযুক্তির প্রভাব সবার ওপরে সমান হয় না, বিভিন্ন লোকের ওপরে বিভিন্নরকম হয়। গড়পড়তা লোকের ওপর কুপ্রভাব খুব বেশি। মানসিক স্বাস্থ্য গড়পড়তা লোকের তুলনায় কম মজবুত। প্রভাব নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনও অবকাশ নেই। বেনোজলের মতো সবার সব বিষয়ে মতামত দেওয়া বা কোনও গুণমানের বাছবিচার ছাড়াই সবার নানা শিল্প-সাহিত্য বা সাংস্কৃতিক প্রয়াস পাঠক-শ্রোতা-দর্শকের সামনে বন্যার মতো ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রেও। গুণী কিন্তু প্রতিষ্ঠিত নন, এবং বাণিজ্যিক, সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার অলিন্দ থেকে দূরে, সমাজমাধ্যম আত্মপ্রকাশের একটা মঞ্চ তৈরি করে দেয়। বাংলা ভাষার চর্চা কম। উৎকর্ষের অবনতির ফলে সমাজমাধ্যমের প্রসারে সার্বিকভাবে সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক সব পরিসরেই বিষয়বস্তু, শৈলী, নান্দনিকতা সব দিক থেকেই উৎকর্ষের অবনতি হবার আশঙ্কা।
গবেষণায় সমাজমাধ্যমের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কুপ্রভাব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কলেজের ছাত্রছাত্রীদের ফেসবুক ব্যবহার করার প্রভাব নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাপত্রে ব্রাঘিয়েরি, লেভি, ও মাকারিন বলছে, ফেসবুক ব্যবহার করার সাথে মানসিক অবসাদের উপসর্গ বাড়ার সম্ভাবনা যেমন দেখা দিচ্ছে, তেমনই যাদের মানসিক অবসাদের প্রবণতা বেশি, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সাহায্য খোঁজার সম্ভাবনা সদর্থক পদক্ষেপ। কিশোর-কিশোরীরা নিজস্ব পরিধির মধ্যে মূলধারার বাইরে বৃহত্তর পৃথিবীতে সমমনস্ক মানুষকে জানার সদর্থক প্রভাবে প্রভাবিত। সমাজমাধ্যমের ব্যবহার দ্বিত্বের মধ্যে আবদ্ধ না থাকে সামাজিক বৃত্তের প্রসার ঘটায়। ব্যবসায়িক সংস্থাগুলো সমাজমাধ্যম পরিচালনার মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকদের ওপর নজরদারি প্রচারমঞ্চ হিসেবে কাজ করার ক্ষমতার সাথে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো জনপ্রিয় সমাজমাধ্যমগুলোর মালিকানায় তাদের একচেটিয়া ক্ষমতা মিশলে তাদের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রশক্তির সাথে যোগসাজশ করার ক্ষমতা নিয়ে আশঙ্কিত থাকার যথেষ্ট কারণ দর্শায়। গণতান্ত্রিক সমাজে কুফল নিয়ন্ত্রণ ব্যক্তিগত মতামত বা পছন্দ, তর্ক, নিজস্ব মতামত, ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্নে দ্বিমত। দর্শনের পরিভাষায় অভিভাবকবাদ বা paternalism ওথবা উদারনীতিবাদ বা liberalism দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে কাম্য নয় আর গণতান্ত্রিক সমাজে সম্ভবও নয়। নতুন প্রযুক্তি রক্ষণশীলদের ‘গেল গেল’ বা ‘যুবসমাজ উচ্ছন্নে যাচ্ছে’ রব নাটক-নভেলই হোক বা সিনেমা-থিয়েটার-টিভি বা আধুনিককালে সমাজমাধ্যম বা আন্তর্জাল ব্যতিক্রম নয়। জুকারবার্গের অনেক আগে গুটেনবার্গের সৌজন্যে যখন প্রথম বই ছাপার প্রযুক্তি প্রচলিত। প্রতিক্রিয়ার আলোচনাটা কৈশোরের সেই ‘বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ’ রচনা লেখার মতো হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। ভাল না মন্দ এই দ্বিত্বের বাইরে বেরোতে হবে। আন্তর্জালের বিস্তার কোনও ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ নয়। ব্যবসায়িক সংস্থাগুলো সমাজমাধ্যম পরিচালনায় অ্যালগোরিদম ব্যবহার করে স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা নিয়েও হরেক প্রশ্ন। ইচ্ছে করলেও ঘড়ির কাঁটা পিছনে ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। ইচ্ছে করলেই সমাজমাধ্যম উধাও হয়ে যাবে না। আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য আসক্তিমূলক দ্রব্য বা অভ্যাসের বিপদ সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।